স্বল্প সময়ে গরু মোটাতাজা করতে খামারিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ১১ কর্মকর্তার সিন্ডিকেট এসব রাসায়নিক বিক্রি করতে গড়ে তুলেছে ওষুধ কোম্পানি। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এগুলো বিক্রি করে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মিশনে নেমেছেন এই ১১ কর্মকর্তা। অথচ গরু মোটাতাজা করায় বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার রোধে খামারিদের উপদেশ দেওয়ার দায়িত্ব এই কর্মকর্তাদের।
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে প্রতি বছরই কৃত্রিমভাবে গরু মোটাতাজাকরণের ভয়ঙ্কর খেলায় মেতে ওঠে একশ্রেণির খামারি। ঈদের কিছুদিন আগে রোগাক্রান্ত ও শীর্ণকায় গরু অল্প টাকায় কিনে হরমোন, ইনজেকশন ও রাসায়নিক ওষুধ প্রয়োগ করে গরু মোটাতাজা করা হয়। বেশি মুনাফার লোভে অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ডোজ ব্যবহার করে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় করে গরুগুলো কোরবানির হাটে তোলে। এসব গরু ঈদের এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে জবাই না করলে মারা যায়। গরুর শরীরের পরতে পরতে ঢুকিয়ে দেওয়া স্টেরয়েড, হরমোন কিংবা এর চেয়েও ভয়ঙ্কর রাসায়নিকের কারণে গরুর মৃত্যু হয়। এসব গরুর মাংস খেলে লিভার, কিডনি, হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্তসহ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরু নির্দিষ্ট ফর্মুলায় খাদ্য দিয়ে মোটাতাজা করলে মাংস ক্ষতির কারণ হয় না। তবে স্টেরয়েড দিয়ে মোটা করা গরুর মাংস জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
নিষিদ্ধ হলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দোকানে গরু মোটাতাজাকরণের এ ধরনের ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুদি দোকানেও বিক্রি হচ্ছে বিষাক্ত ওষুধ। অসাধু ব্যবসায়ী বা খামারিরা এসব দোকান থেকে সহজেই নিষিদ্ধ পণ্য কিনে গরুর শরীরে প্রয়োগ করছে। মাত্র এক টাকায়ও ট্যাবলেট পাওয়া যায়। প্রেসক্রিপশন ছাড়া এসব ওষুধ বিক্রির নিয়ম না থাকলেও বিক্রি হচ্ছে দেদার।
বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নোভিটা গ্রুপের এডাম-৩৩ এবং ওরাডেক্সন খামারিরা বেশি কেনে। ডেল্টা ফার্মার ডেকাট্রন বিক্রি হয় বেশি। এ ছাড়া রয়েছে নোভিটা কোম্পানির রোক্সডেক্স ইনজেকশন। একেকটি ইনজেকশন বিক্রি হয় ২৫ টাকায়। এ ছাড়াও রয়েছে ভারতীয় বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ। গত এক সপ্তাহে বিজিবি দেশের বিভিন্ন সীমান্তপথে এসব ওষুধের অন্তত ৩০টি অবৈধ চালান আটক করেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, ময়মনসিংহ ও ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতে ক্ষতিকর নানা ওষুধ ও রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে গরু মোটাতাজা করা হয়। জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক এমন গরু বাজারজাত রোধে এ বছর সরকারের পক্ষ থেকেও আগের চেয়ে বেশি সতর্ক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ১৪ আগস্ট মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা সূত্র জানায়, স্টেরয়েড ব্যবহার করে গরু মোটাতাজাকরণ নিয়ে জনমনে শঙ্কার প্রেক্ষাপটে কোরবানির পশুর গুরুত্বপূর্ণ হাটগুলোতে মেডিকেল টিম কাজ করবে।
সভা শেষে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মাকসুদুল হাসান খান জানিয়েছেন, আসন্ন ঈদুল আজহার জন্য দেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর জোগান রয়েছে মোট এক কোটি পাঁচ লাখ। এর মধ্যে গরু-মহিষ প্রায় ৩৩ লাখ, ছাগল-ভেড়া ৭২ লাখ। প্রাণী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের বিষাক্ত ওষুধে গরুর দেহে অধিক মাত্রায় পানি ধারণক্ষমতা হয়। এতে গরুর শরীর ফুলে-ফেঁপে ওঠে, দুলদুলে ও স্বাস্থ্যবান দেখায়। তবে গরু দ্রুত মোটা হয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। গরুর কিডনির কার্যকারিতা কমে যায়। গরুর হৃৎপি ও যকৃৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানিকগঞ্জের কইট্টা এলাকার খামারি আবু সিদ্দিক বলেন, সপ্তাহে একটি বড়ি খাওয়ানোর কথা থাকলেও তারা দ্রুত মোটা করতে সপ্তাহে দুটি করে বড়ি খাওয়াচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ১১ কর্মকর্তার এ সিন্ডিকেট বিষাক্ত রাসায়নিক বিক্রি করে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার টার্গেট নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এ কর্মকর্তারা তাদের অধীন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সারাদেশে বিষাক্ত রাসায়নিক বিক্রির নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন। ১১ কর্মকর্তার সিন্ডিকেট কোরবানির ঈদের বাজার ধরতে হীরা অ্যানিমেল হেলথ কেয়ার, স্কাই অ্যাগ্রো ফার্মা, কাজিব ড্রাগস, সাইফ এগ্রোভেট বাংলাদেশ, কিউর লাইফ, গ্গ্নোয়ার স্টক, আলফা অ্যাগ্রোভেট নামে সাতটি কোম্পানিও খুলেছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, খিলক্ষেত, রামপুরা, বাড্ডা, টঙ্গী, গাবতলী, সাভার, গাজীপুরের জয়দেবপুরে এসব কোম্পানির ওষুধ তৈরি করা হচ্ছে। এর বাইরে ময়মনসিংহ, যশোর, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, মেহেরপুর, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, খুলনা, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর ও মাদারীপুর এলাকায় এসব কোম্পানির সাব-অফিস থেকেও ওষুধ তৈরি করে বিক্রি করা হচ্ছে। অবৈধ এসব কারখানায় গরু মোটাতাজাকরণের ভেজাল ওষুধ ও ইনজেকশন তৈরি হচ্ছে। কয়েক বছর আগে লাইফ অ্যাগ্রোভেট বাংলাদেশ লিমিটেড নামে ঢাকার ডেমরা এলাকায় ওষুধ কারখানা গড়ে তোলা হয়। কাগজপত্রে কোম্পানির পরিচালক দেখানো হয় প্রাণিসম্পদের ১১ কর্মকর্তার স্ত্রীদের।
অথচ কোম্পানির অংশীদার ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. আজিজুল হক, পশু গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডা. ইজমাল কাওসার হাসান, রাজশাহীর ভেটেরিনারি সার্জন ডা. কাউসার আলী, ডা. নাজিমুল ইসলাম, ডা. লুৎফর রহমান, ডা. মকবুল হোসেন, ডা. আবদুল খালেক, ডা. ইকবাল, ডা. রিজভী, সাভারের শহীদুল্লাহ কাউছার ও ডা. হাসিন আহমেদ। এবারও এ কর্মকর্তারা বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবসায় জড়িত আছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। এর আগে একাধিকবার বিষাক্ত রাসায়নিকের অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এই কর্মকর্তাদের আটক করে র্যাব।
তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অজয় কুমার রায় বলেন, কোরবানির গরু দ্রুত মোটাতাজা করতে কিছু অসৎ খামারি বিষাক্ত এসব হরমোন ব্যবহার করছে। খামারিদের বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার না করতে সচেতন করা হচ্ছে। এবারও কোরবানির হাটে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পশু ঢোকানো হবে। যারা বিষাক্ত ওষুধ খাইয়ে গরু হাটে নিয়ে আসবে তাদের আইনের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিষাক্ত রাসায়নিক বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি তদন্ত করে দেখবেন। কাউকে এসবের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানায়, গরু মোটাতাজাকরণ একটি নিয়মিত ও প্রচলিত প্রদ্ধতি। এটি একটি স্বল্পমেয়াদি লাভজনক পদ্ধতি। প্রাকৃতিক এ পদ্ধতিটি যুগ যুগ ধরে প্রচলিত। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে গরু মোটাতাজাকরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রাকৃতিক নিয়মে গরু মোটাতাজা করে হাজার হাজার বেকার যুবক স্বাবলম্বী হচ্ছে।


