কঠোর গোপনীয়তায় গতকাল বুধবার জামায়াতে ইসলামীর আমির নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। তবে সারাদেশের প্রায় ৪২ হাজার রুকনের কত শতাংশ ভোট দিয়েছেন তা জানা যায়নি। দলটির দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আরও কয়েক দিন লেগে যেতে পারে ভোটগণনায়। এর পর নতুন নির্বাচিত আমিরের নাম ঘোষণা করা হবে।
জামায়াতের কোনো নেতা নাম প্রকাশ করে বক্তব্য না দিলেও দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গঠনতন্ত্রের ১৫(৩) ধারা অনুযায়ী দলের মজলিসে শূরা ১০ আগস্ট আমির নির্বাচনের প্যানেল গঠন করে। ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ, নায়েবে আমির সাবেক এমপি মুজিবুর রহমান ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের নাম প্যানেলে রয়েছে। এই তিনজনের যে কোনো একজনকে ভোট দেবেন রুকনরা।
২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর থেকে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে জামায়াত। বিচার ঠেকাতে হরতালে সহিংসতার মামলায় কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ের প্রায় সব নেতা হয় কারাগারে, নয়তো আত্মগোপনে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নেই প্রকাশ্য কর্মসূচি। প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে সাত বছর সম্মেলন করতে পারেনি জামায়াত।
প্যানেল নির্বাচনে মকবুল আহমাদ মজলিসে শূরার সর্বোচ্চ ভোট পান, দ্বিতীয় হন শফিকুর রহমান, তৃতীয় স্থানে ছিলেন মুজিবুর রহমান। এ কারণে ধারণা করা হচ্ছে, মকবুল আহমাদই আমির হচ্ছেন। নির্বাচিত হলে গত ছয় বছর ভারপ্রাপ্ত আমির এ নেতা হবেন স্বাধীনতার পর জামায়াতের তৃতীয় আমির। বিতর্ক এড়াতে যুদ্ধাপরাধে সাজাপ্রাপ্ত অথবা অভিযোগ রয়েছে, এমন কাউকে প্যানেলে রাখা হয়নি। এ কারণে দলে জনপ্রিয়তা থাকলেও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকেও রাখা হয়নি।
সূত্রটি জানায়, ভোট গ্রহণের দিন আগেভাগে ঘোষণা করে আনুষ্ঠানিক বুথ বানিয়ে ভোট গ্রহণ করা হলে পুলিশ ধরপাকড় শুরু করত। রুকনরা ভোটই দিতে পারতেন না। এ কারণে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। কেন্দ্রের তরফ থেকে ধারণা দেওয়া হয়েছিল, ঈদের পর ভোট হবে। কিন্তু কৌশল হিসেবে আগেভাগেই গোপনে ভোট গ্রহণ করা হয়।
গত ১১ মে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায় কার্যকর হয়। একই অপরাধে সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে গত বছরের নভেম্বরে।
নিজামীর গ্রেফতারের দিন থেকেই ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব পালন করছেন মকবুল আহমাদ। মুজাহিদের গ্রেফতারের পর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল হন। তিনি ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেফতার হলে সর্বকনিষ্ঠ সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল হন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এটিএম আজহারেরও ফাঁসির রায় হয়েছে। নায়েবে আমির আবদুস সোবহানেরও ফাঁসির রায় রয়েছে একই আদালতে। মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে জ্যেষ্ঠ দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লার। সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর ফাঁসির রায় বহাল রেখেছেন। এর আগে ৯০ বছরের সাজা ভোগ করার সময় মৃত্যু হয় সাবেক আমির গোলাম আযমের।
ফেনী জেলা থেকে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে আসা মকবুল আহমাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার অভিযোগের কথা শোনা গেলেও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা নেই। তবে আমির প্যানেলে থাকা তিনজনের বিরুদ্ধে নাশকতা ও সহিংসতার অভিযোগে অনেক মামলা আছে। রাজশাহীর সাবেক এমপি মুজিবুর রহমান ও সিলেটের নেতা শফিকুর রহমান এসব মামলায় দীর্ঘদিন হাজতবাস করেছেন। বর্তমানে তারা জামিনে মুক্ত। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন মকবুল আহমাদ। মকবুল আহমাদের বয়স ৭৩। বাকি দু’জন ষাটোর্ধ্ব।
স্বাধীনতার পর নিষিদ্ধ হয় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা জামায়াত। এ সময় মাওলানা আবদুর রহিম দলের ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে রক্তাক্ত পথে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলে জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে জামায়াতকে প্রকাশ্যে রাজনীতির সুযোগ দেন। ১৯৭৮ সালে দলের আমির গোলাম আযম দেশে ফেরেন। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব না থাকায় প্রকাশ্যে আমিরের দায়িত্ব নিতে পারেননি গোলাম আযম। তবে তিনিই ছিলেন মূল নেতা। এ সময় ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব পালন করেন আব্বাস আলী খান। ১৯৯৪ সালে নাগরিকত্ব পাওয়ার পর গোলাম আযম আনুষ্ঠানিকভাবে আমির হন। ২০০০ সালে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নিলে আমির নির্বাচিত হন মতিউর রহমান নিজামী। ২০০৩, ২০০৬ ও ২০০৯ সালের রুকন সম্মেলনে তিনি আমির নির্বাচিত হন।


