বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

উচ্চরক্তচাপে ভুগছে উপকূলীয় ২০% মানুষ

base_1471633061-14081254_1290742790938349_794018401_nশস্যের বহুমুখীকরণের অভাবে কৃষি কর্মকাণ্ড সীমিত, গড়ে ওঠেনি শিল্প-কারখানাও। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও তুলনামূলক কম। তার ওপর আছে মাটি ও পানিতে অতিরিক্ত মাত্রায় লবণাক্ততা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে মানসিক চাপ। এসবের সম্মিলিত প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় ছয় জেলার মানুষের মধ্যে বাড়ছে হাইপারটেনশন বা উচ্চরক্তচাপ।

উপকূলীয় মানুষের মধ্যে উচ্চরক্তচাপের কারণ ও ঝুঁকির মাত্রা নিরূপণ নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘প্রিভেলেন্স অব হাইপারটেনশন ইন পিপল লিভিং ইন কোস্টাল এরিয়াস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি করেছেন ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ, বারডেম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতজন গবেষক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক— দুই ধরনের হাইপারটেনশনের ঝুঁকিই দেশের অন্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি। অধিক বয়সী, স্থূল ও সামাজিকভাবে উচ্চশ্রেণীর মানুষের মধ্যে এ ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

দেশের গ্রামাঞ্চলে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ হাইপারটেনশন সমস্যায় ভুগছে। আর শহরাঞ্চলের এটি ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। অথচ উপকূলীয় অঞ্চলে এ হার প্রায় ২০ শতাংশ বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

কায়িক পরিশ্রমের অভাব উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের মধ্যে হাইপারটেনশনের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবু আজহার বলেন, সারা বিশ্বেই উপকূলীয় এলাকার মানুষজনের মধ্যে উচ্চরক্তচাপ বেশি। লবণ শরীরে প্রবেশ করলে তা রক্তচাপ বৃদ্ধি করবেই। এর পর যে বিষয়টি তা হলো দুশ্চিন্তা। কর্মসংস্থান না থাকলে অলস শরীরে দুশ্চিন্তা আসে। এ বিষয়ে একমাত্র সমাধান হচ্ছে সচেতনতা ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা। মা-বাবার উচ্চরক্তচাপ থাকলে, সন্তানের উচিত হবে অন্যদের চেয়ে একটু বেশি সচেতন থাকা, ধূমপান না করা, চর্বি জাতীয় খাদ্য না খাওয়া ইত্যাদি। নিজেদের সচেতন হতে হবে, পাশাপাশি গণস্বাস্থ্য বিবেচনায় সরকারের তরফ থেকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে উপকূলীয় এলাকায়।

ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনার সম্মুখীন হতে হয় উপকূলীয় এসব মানুষের। ২০০৭ সালের নভেম্বরে সিডর ও ২০০৯ সালের মে মাসে আঘাত হানা আইলা— এ দুটি সাইক্লোনে ওই অঞ্চলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটে। প্রতিনিয়ত এমন দুর্যোগের আশঙ্কায় থাকতে হয় উপকূলের মানুষকে। ফলে অতিরিক্ত এ চাপ তাদের হাইপারটেনশনের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে বলে গবেষণা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে।

সমুদ্র তীরবর্তী এসব জেলার মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে উচ্চমাত্রায় লবণ (সোডিয়াম ক্লোরাইড) গ্রহণের ঝুঁকি বিরাজমান। এর অন্যতম কারণ হলো, তাদের খাবার পানিতে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি লবণের উপস্থিতি। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত বিভিন্ন শস্য, শাকসবজি ও ফলের মাধ্যমেও তাদের অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে।

জানা গেছে, খাবার পানিতে প্রতি লিটারে ১০০ মিলিগ্রামের কম লবণ থাকলে তা হূদরোগের ঝুঁকি কমায়। বৃষ্টির পানিতে প্রতি লিটারে লবণ থাকে ৭৮ মিলিগ্রাম। তবে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন পুকুরে প্রতি লিটারে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ মিলিগ্রাম লবণ পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি লবণাক্ততা মিলেছে গভীর নলকূপের পানিতে। এগুলোয় প্রতি লিটারে ২ হাজার ২০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণ পাওয়া গেছে। ফলে উচ্চলবণাক্ত পানি পানে বাধ্য হচ্ছে ওই এলাকার জনগোষ্ঠী।
শুষ্ক মৌসুমে পুকুরের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ছে। আবার বন্যা বা জলোচ্ছ্বাস-পরবর্তী সময়ে পুকুর ও নলকূপের পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ভবিষ্যতে ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস বেড়ে গেলে লবণাক্ততার ঝুঁকি আরো বাড়বে।

উপকূলীয় এ এলাকায় কিছু পুকুর থাকলেও ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার সময় সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে সেগুলো পুরোপুরি ডুবে যায়। এতে বাঁধের ভেতর থাকা পুকুরেও লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে, যা আর বের করা সম্ভব হয়নি। ফলে ওই এলাকার সব পুকুরের পানিই এখন লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানিতেও প্রচুর লবণ রয়েছে। ফলে গভীর ও অগভীর নলকূপ দিয়ে যে পানি আসে, তাও লবণাক্ত। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে লবণাক্ত পানি পান করায় বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় মানুষের উচ্চরক্তচাপের প্রবণতা বেড়ে গেছে, যা তাদের হূদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে লবণাক্ত পানির পরিবর্তে স্বাভাবিক (বৃষ্টির) পানি পান করলে এ ঝুঁকি ১৬ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব বলে গবেষণায় বলা হয়।

এ গবেষণার জন্য পরিচালিত জরিপে অংশ নেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় সাড়ে আট হাজার মানুষকে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৫৮ জন অংশগ্রহণ করে। জরিপে অংশ নেয় ২ হাজার ৬৩১ জন পুরুষ ও ৪ হাজার ৪২৭ জন নারী। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে দরিদ্র শ্রেণীর ৩ হাজার ৩৫ জন, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ২ হাজার ৮২৬ ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর ১ হাজার ৪৭ জন।

গবেষণায় ছয়টি উপকূলীয় জেলার ৩২টি সম্প্রদায়ের মানুষ অংশ নেয়। জেলাগুলো হলো— বরিশাল, বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ঝালকাঠি। গবেষণাক্ষেত্রে ছিল ১৬টি মাধ্যমিক ও পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাঁচটি মাদ্রাসা, চারটি ইউনিয়ন কাউন্সিল ও দুটি কলেজ। ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সাত হাজারের বেশি মানুষের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রত্যেকের শারীরিক অবস্থার বিবরণ, নিজের ও পরিবারের সদস্যদের রোগের ইতিহাস, উচ্চতা, ওজন, রক্তচাপসহ স্বাস্থ্যসম্পর্কিত অন্যান্য রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়। রক্ত পরীক্ষা করে গ্লুকোজ, লিপিড, লো ডেনসিটি লিপোপ্রটেইন, হাইডেনসিটি লিপোপ্রটেইন পরিমাপ করা হয়। বারডেমের কেন্দ্রীয় ল্যাবরেটরিতে সব নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, সারা বিশ্বে প্রতি বছর হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্তত ৯৪ লাখের মৃত্যুর জন্য দায়ী হাইপারটেনশন। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী হাইপারটেনশনে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ২৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।

ডব্লিউএইচওর হিসাব অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোয় হূদরোগজনিত মৃত্যুর ৮০ শতাংশের কারণ হাইপারটেনশন। সাধারণত উন্নত দেশগুলোয় হাইপারটেনশনের উপস্থিতি বেশি দেখা গেলেও, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয়ও এর প্রকোপ বাড়ছে। আর্থসামাজিক নানা কারণে বর্তমানে বাংলাদেশেও হাইপারটেনশনের ব্যাপকতা বাড়ছে।

রক্তকে ধাক্কা দিয়ে ধমনিতে পাঠাতে হূিপণ্ডের গায়ে যে চাপ সৃষ্টি হয়, তা রক্তচাপ নামে পরিচিত। এ চাপের একটি স্বাভাবিক মাত্রা আছে, যা ছাড়িয়ে গেলে চিকিত্সাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় হাইপারটেনশন বা উচ্চরক্তচাপ।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রো-ভিসি ও স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন জাতীয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, মানসিক চাপ ও লবণাক্ততা উচ্চরক্তচাপের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এ দুটি বিষয়ের উপস্থিতি লক্ষণীয়। তবে এর জন্য আরো ব্যাপক আকারের সমীক্ষা ও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। সরকারি উদ্যোগে এ গবেষণা পরিচালিত হতে পারে।

আরও পড়ুন