মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, স্টকহোলম থেকে।
বার বার তারিখ ঘোষণা করা সত্বেও দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ তাদের কাউন্সিল অধিবেশন সম্পন্ন করতে পারেনি। দলটি থেকে প্রথমে গত ডিসেম্বর ও পরবর্তীতে ২৮ মার্চ কাউন্সিল অধিবেশন করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তা করতে আওয়ামী লীগ সক্ষম হয়নি। কেন হয়নি এবেপারে দল কিছুই ব্যাখ্যা দেয়নি। মিডিয়ায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সন্মেলন হওয়া আর না হওয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন আসছে সামনে। এভাবে বার বার সম্মেলন পিছিয়ে দেওয়ার পেছনে আসলে কি কারণ থাকতে পারে? আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র কি বলে? সম্মেলন না করে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেওয়া কি গঠনতন্ত্রের পরিপন্থী নয়? আওয়ামী লীগ কি প্রতিটি জেলা উপজেলা ও বিদেশে তাদের দলের সন্মেলন সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে? যদি না করে থাকে তাহলে তো সম্মেলনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন আসবে। এখন প্রশ্ন হলো আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন আদৌ হবে কি? যদি হওয়ার কোনো সম্ভবনা থাকে তাহলে কবে হবে এই অধিবেশন? গঠনতন্ত্র অনুসারে নিশ্চই বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অনেক আগে। তাহলে কি এই কমিটি অবৈধ?
দলের গঠনতন্ত্রে কেন্দ্রীয় সন্মেলনের পূর্বে জেলা উপজেলা ও বহির্বিশ্বের শাখাগুলোর সম্মেলন সম্পন্ন করার কথা নিশ্চই উল্লেখ রয়েছে। এসকল সম্মেলন সম্পন্ন না করে কাউন্সিল অধিবেশন ডাকাও যুক্তিসঙ্গত নয়। সব জেলা ও উপ জেলায় সম্মেলন সম্পন্ন হয়েছে কি হয়নি এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্র দলের কেন্দ্রীয় নেতা নেত্রীরাই ভালো করে বলতে পারবেন। এদিকে ইউরোপে আওয়ামী লীগের একটি শাখা আছে। যেখানে সভাপতি অনিল দাস গুপ্ত ও সাধারণ সম্পাদক এম এ গনি। এই দুইজন নেতা অনেক বছর থেকে তাদের এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে অনিল দাস গুপ্ত ও এম এ গনির মধ্যে চলছে মতানৈক্য ও ঠান্ডা লড়াই। ইতিমধ্যে অনিল দাস গুপ্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দলের নেতা কর্মীদের এম এ গনিকে বয়কট করার কথা বলেছেন। অন্যদিকে এম এ গনি অনিল দাস গুপ্তকে ভারতীয় নাগরিক বলে দাবি করেছেন। দীর্ঘদিন থেকে এই দুই নেতা ইউরোপী কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে থাকার কারণেই নাকি এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। পর্যবেক্ষক মহলের মতে এই দুই নেতার বিভক্ততার কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এখন আওয়ামী লীগের একের অধিক শাখা রয়েছে। কোনো কোনো দেশে তিনটি শাখা পর্যন্ত আছে।
বিদেশের আওয়ামী লীগের সংগঠনগুলোর কথা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন করে থাকেন। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুসারে বিদেশে দলের কোনো শাখা থাকার কথা নয়। কারণ ডক্টর ফখরুদ্দিন আহমেদের অস্থায়ী সরকার বিদেশে এধরণের সাংগঠনিক কর্মতৎপরতার বিরুদ্ধে আইন গ্রহণ করেছিলেন। বিদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন থাকাতে নিজেদের মধ্যে দলাদলি ও সংঘাত সৃষ্টি হয় যা দেশের মান সম্মানকে ছোট করে। তবে পরবর্তিতে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ যদি তাদের গঠনতন্ত্রে এবেপারে কোনো পরবর্তন নিয়ে আসলে বিষয়টি আমার জানা নেই। এদিকে বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রী পরিষদের সদস্য ও দলের কেন্দ্রীয় নেতারা যখন বিদেশে সফরে আসেন তখন দল থেকে তাদের সন্মানে জাকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে দেখা যায়। পর্যবেক্ষক মহলের মতে এধরনের একটা ভালো সার্ভিস পাওয়ার জন্যই মূলত আওয়ামী লীগের নেতারা বিদেশে দলের অস্তিত্ব ধরে রাখতে আগ্রহী। যতটুকু জানা যায় দেশে বলুন আর বিদেশেই বলুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত সবস্থানে সন্মেলন সম্পন্ন করতে পারেনি। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় এখনো কয়েক বছরের পুরানো কমিটি দিয়ে সাংগঠনিক কাজ চালানো হচ্ছে। তেমনি অবস্থা বিদেশে। তবে ইউরোপে নুতন কমিটি করতে গিয়ে প্রায় প্রতিটি দেশেই ইউরোপ আওয়ামী লীগের সভাপতি অনিল দাস গুপ্ত ও সাধারণ সম্পাদক এম এ গনি বের্থ হয়েছেন বললে হয়তো ভুল করা হবে না। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আওয়ামী লীগের নেতারা এখন এই দুই বেক্তিকে সরিয়ে দিয়ে নুতন নেতৃত্ব সৃষ্টিতে আগ্রহী বলে জানা যায়l
ক্ষমতাসীন দল বলে এখন আওয়ামী লীগের ভেতরে চলছে নেতৃত্ব, ক্ষমতার লড়াই, একে অপরের সাথে সংঘাত, সন্দেহ আর রাজনীতির নামে বানিজ্য। এসকল নেতাদের তৃণমূলের সাথে কোনো যোগাযোগ নেই। ঢাকার সচিবালয়ে বসে কি করে আরো অর্থ কামানো যায় তা নিয়ে তারা দিনের পর দিন বেস্ত রয়েছেন বলে তৃণমূলের কর্মীদের অভিযোগ। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার বার দলীয় নেতাদের এলাকায় গিয়ে সাংগঠনিক কর্মতৎপরতা চালানোর তাগাদা দেওয়া সত্বেও এসকল নেতারা নিজস্ব এলাকা ছেড়ে বেশিরভাগ সময় এখনো ঢাকায় পরে থাকেনl ঢাকা থেকে কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে মধ্যে মধ্যে বিভিন্ন সভায় বিরোধী দলগুলোর প্রতি হুঙ্কার ছাড়তে দেখা যায়। অথচ এসকল নেতাদের ঢাকায় না বসে জেলায় জেলায় সাংগঠনিক কর্মতত্পরতা চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে শারীরিক অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো কারণে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ এখন পর্যন্ত সম্ভবত সকল জেলা সফর সম্পন্ন করতে পারেননিl সূত্র মতে গত কয়েক বছরে তিনি খুব কম সময়ই সাংগঠনিক কাজে বিভিন্ন জেলা সফর করেছেন। জানা যায় ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থাকা সত্তেও কয়েকটি জেলায় আওয়ামী লীগের অবস্থা এখন নড়বড়ে। এছাড়া বহির্বিশ্বের মতোই বিভিন্ন স্থানে রয়েছে নেতৃত্বের দন্ধ। সম্প্রতি যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের চট্টগ্রামের এক সভায় এধরণের আভাস দিয়েছেনl তিনি বলেছেন দেওয়াল না দেখে ব্রিজ দেখতে চাইl বিভিন্ন স্থানে এধরণের বিভক্ততার কারণে নুতন কমিটি করা একটা বড় সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। আওয়ামী লীগের এই সাংগঠনিক দুর্বলতার জন্য তৃনমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে দায়ী করা হলেও কেন্দ্রীয় নেতারা তা মানতে রাজি নয়।এই কারণেই কি তাহলে আওয়ামী লীগ বার বার সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা দিয়ে আবার পিছু হটছে?
দেশ ও দেশের বাহিরে দলের এই অবস্থার আসল কারণ কি? পর্যবেক্ষক মহলের মতে এর প্রধান কারণ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দুর্বলতা ও সাংগঠনিক কার্যকলাপে অনিচ্ছা প্রকাশ। তবে দলের শুভাকাঙ্খীরা বলেন আওয়ামী লীগের এই সাংগঠনিক অবস্থার জন্য দায়ী তারাই যাদের উপর বিশ্বাস ও আস্থা রেখে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের সাংগঠনিক কর্মতত্পরতা সক্রিয় রাখার দায়িত্ব দিয়েছেন। তবে এতো কিছুর পরও এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ দেশের সর্ববৃহত রাজনৈতিক দল হিসেবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে বলা যেতে পারে। এজন্য ঢাকায় অবস্থানরত কেন্দ্রীয় নেতাদের বাহাবা পাওয়ার কিছুই নেই। দলের এই অবস্থানের প্রধান কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি। বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বনির্ভর করার লক্ষে রাত দিন যে সংগ্রাম, যে পরিশ্রম তিনি করে চলছেন তারই ফলস্র্রুতিতে আওয়ামী লীগকে এখনো শক্তভাবে ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। এছাড়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাও দলের জন্য ইতিবাচক হিসেবে কাজ করছে। সূত্র মতে প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভানেত্রী কেন্দ্রীয় নেতাদের সাংগঠনিক কাজে অবহেলার কথা ভালোভাবেই অবগত আছেন। সম্ভবত এই কারণেই আসছে কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আনবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলে একটা বড় পরিবর্তন নিয়ে আসা এখন শুধু সময়ের বেপার মাত্র l এভাবে একটি দল চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বিরোধী দলের অবস্থানে আসলে খুব দুর্বল হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা দেখা দিতে পারে বলে অনেকে ধারণা করছেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থেকে দলীয় প্রধানের দায়িত্বে নুতন কোনো মুখ উপহার দিলেও দিতে পারেনl একদিকে দলের সভানেত্রী অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই দুই বৃহৎ দায়িত্ব একা আর কতদিন তদারকী করতে পারবেন সেটাও একটা বড় প্রশ্ন। এপ্রসঙ্গে ভারতীয় কংগ্রেস প্রধান সোনিয়া গান্ধীর উধাহরণ টেনে আনা যেতে পারে। ভারতে কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালীন সোনিয়া গান্ধী নিজে প্রধানমন্ত্রী না হয়ে দলের সভানেত্রী থেকে অন্যকে বানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং বাংলাদেশের বেলায় শেখ হাসিনা চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতি অন্য কারো উপর ছেড়ে দিলে অবাক হওয়ার কিছুই নেইl বঙ্গবন্ধুও একসময় কামরুজ্জামানকে সভাপতি করেছিলেনl এখন শেখ হাসিনাকে একজন কামরুজ্জামান খুঁজে বের করতে হবেl
তবে গণতন্ত্র ও দায়িত্বতার নামে এধরনের উধারণের যুক্তি অনেকেই মানতে রাজি নয়। গণতন্ত্রের কর্ণধার বলে সুপরিচিত পশ্চিমা গণতন্ত্রে যদি দলের সভাপতি ও একই সাথে প্রধানমন্ত্রী থাকা যায় তাহলে বাংলাদেশের বেলায় আপত্বি আসবে কেন? ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানী, সুইডেন, ফিনলেন্ড, ডেনমার্ক, নরওয়ে সহ ইউরোপের প্রায় সকল দেশেই প্রধানমন্ত্রী একই সাথে নিজ দলের সভাপতি পদের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সুতরাং গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার কারণ দেখিয়ে এধরনের যুক্তি সামনে নিয়ে আসা আদৌ যুক্তিসঙ্গত নয় বলে তারা মনে করেনl তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এবেপারে একমত নয়। তাদের মতে ইউরোপীয় গণতন্ত্রের মতো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে এখনো কাঠামো সৃষ্টি হয়নিl এখানে বড় বড় দলে এখনো একক নেতৃত্ব কাজ করছেl গণতান্ত্রিক সিস্টেমের কথা গঠনতন্ত্রে উল্লেখ থাকলেও দলীয় প্রধানের নির্দেশেই মূলত দলের কমিটি গঠন করা হয়l ফলে এক্ষেত্রে ইউরোপীয় উদহারণ টেনে আনা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত ভেবে দেখতে হবেl একইসাথে দল ও সরকারে একক নেতৃত্ব থাকার কারণেই মূলত সমস্যাটা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে তারা মনে করেন l বঙ্গবন্ধু সম্ভবত এধরণের ভার থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যই কামরুজ্জামানকে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেনl
আজ হউক বা কাল হউক আওয়ামী লীগ তাদের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশন একদিন অবস্যই সম্পন্ন করবেl এখন প্রশ্ন হলো আগামী দিনে কারা আসতে পারেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে? সাবেক ছাত্রলীগ ও যুবলীগের তরুণ নেতাদের একসময় ধারাবাহিকভাবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসার একটা নিয়ম থাকলেও গত দুই তিন দশকে সে সুযোগ থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উল্টো আওয়ামী লীগের ভেতর এসে স্থান করে নিয়েছেন অন্য রাজনৈতিক দল থেকে আসা নেতা নেত্রীl পচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ঢাকায় বেশ কয়েকজন নেতা সেদিন গোপনে ছাত্রলীগের হাল ধরে রেখেছিলেন, সাংগঠনিক কার্যকলাপ পরিচালনা করেছিলেন , কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে হাতে অস্ত্র তুলে যুদ্ধ করেছিলেন তাদের অনেকেই পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ঠাই পাননিl অনেকেই এখনো আওয়ামী লীগে থাকলেও দলের গুরত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে একমাত্র মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, রবিউল আলম মুক্তাদির চৌধুরী এম পি, খ ম জাহাঙ্গীর এম পি, কামাল মজুমদার এম পি, সাবেক মন্ত্রী দীপংকর তালুকদার এখন পর্যন্ত সামনের কাতারে অবস্থান করলেও ইসমত কাদির গামা, মুকুল বোস, মমতাজ হোসেন, এস এম ইউসুফ, সুলতান মনসুর, আব্দুস সামাদ পিনটু, মোবারক হোসেন সেলিম,আব্দুর রউফ শিকদার,মোহাম্মদ ইউনুস, লন্ডন প্রবাসী পারভীন, কেনাডা প্রবাসী এডভোকেট নাজমা, মানিকগঞ্জের মহিউদ্দিন সহ বাকিদের দলে কোনো পদ মিলেনি। মুকুল বোস ও সুলতান মনসুরকে সংস্কারপন্থী আখ্যায়িত করে এখন পর্যন্ত দুরে রাখা হয়েছে। ইসমত কাদির গামা মুক্তিযুদ্ধা কমান্ডিং কাউন্সিলের নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আব্দুস সামাদ পিনটু মুক্তিযুদ্ধা সংহতি পরিষদের মহাসচিব পদে দায়িত্ব পালন করা সত্বেও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে তাদের রাখা হয়নি। মমতাজ হোসেনকে একবার ব্রূনাইতে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব দেওয়া হলেও দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিনি কোনো স্থান পাননি।
ঢাকায় গোপনে সাংগঠনিক কাজ করতে গিয়ে এই মুকুল বোস জিয়ার সামরিক জান্তার হাতে গ্রেফতার হয়ে রেসকোর্সের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। সুলতান মনসুরের মত নেতার বর্তমান সিলেট আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রয়োজন থাকা সত্বেও তাকে সংস্কারপন্থী আক্ষা দিয়ে দুরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। স্বাধীনতার পরপরই ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগরের প্রথম কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন মমতাজ হোসেন। পরবর্তিতে তিনি ছাত্র লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতেও ছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জৈষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের খুব কাছের সাথী হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। ৯৬ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তাকে ব্রূনাইতে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব দেওয়া হলেও ২০০৮ পরবর্তী সময় থেকে মমতাজ হোসেনকে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি কিংবা অন্য কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। ১৫ আগস্টের পরবর্তীতে ঢাকায় গোপনে ছাত্রলীগের সংগঠনকে সংগঠিত করেছিলেন এই মমতাজ হোসেনl পরীক্ষিত এসকল নেতাদের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা কতটুকু অবগত তা আমার জানা নেই। কারণ এদের অনেকেই এখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি তো দুরের কথা জেলা কমিটিগুলোতেও নেই। অন্যদিকে পচাত্তরের পূর্বে ও পরবর্তিতে যারা বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারের সবচেয়ে বেশি সমালোচিত বলে পরিচিত তাদের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের গুরত্বপূর্ণ পদে পর্যন্ত রাখা হয়েছে। দলের ভেতরে আশ্রয় পাওয়া আওয়ামী লীগের আদর্শের বিরোধিতাকারীদের ষড়যন্ত্রের কারণেই মূলত এসকল নেতারা দলে ফিরে আসতে পারছেন না বলে অনেকে মনে করে থাকেন।
এখানে লক্ষনীয় যে ছাত্রলীগের সাবেক এসকল নেতাদের আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে কোনো দায়িত্ব দেওয়া না হলেও তারা কাদের সিদ্দিকী, ডক্টর কামাল হোসেন সহ আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে যাওয়া অন্যান্য নেতাদের মত আওয়ামী লীগ ছেড়ে যাননি কিংবা সভানেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কোথাও কোনো কটু কথাও বলেননি। তবুও তাদের দলের দায়িত্ব থেকে কেন বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে এই প্রশ্ন আজ বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী অনেকেরই। আগামী কাউন্সিল অধিবেশনে এদের দলে নিয়ে আসা উচিত হবে বলে আওয়ামী লীগের শুভাকাংখীরা মনে করেন। তা না হলে অন্য দল থেকে আওয়ামী লীগে আসা নেতারাই একসময় দলের ভিতরে সংখ্যাগরিষ্ট ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা দাবি করছেন। দলের নেতৃত্বে একটা পরিবর্তন আনলে দল চাঙ্গা হয়ে উঠবে বলে আওয়ামী লীগের শুভাকাংখীরা মনে করছেন।
তাছাড়া একসময়ের ছাত্রলীগের সভাপতি, তুখোড় ছাত্র নেতা, এরশাদ সরকারের সাবেক মন্ত্রী শেখ শহিদুল ইসলাম (মহাসচিব জে পি) আওয়ামী লীগে আসতে চাইলেও তাকে আসতে কেন দেওয়া হচ্ছে না সেবেপারে প্রশ্ন আসতে পারেl সূত্র মতে তিনি আওয়ামী লীগে আসতে চাইলেও দলের কয়েকজন নেতার কারণে সম্ভব হয়ে উঠছে নাl শোনা যায় এদের মধ্যে একজন না কি প্রধানমন্ত্রীর নিকটতম আত্বীয়l অনেকের মতে শেখ হাসিনার প্রয়োজন এখন শেখ শহিদুল ইসলামের মতো একজন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নেতাl শেখ শহীদকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে দায়িত্ব দিলে তিনি দলকে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করতে পারবেন বলেই অনেকে মনে করেনl বঙ্গবন্ধুর কন্যা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এখন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যকলাপ তদারকি করার জন্য বিশ্বস্থ ও আস্থাভাজন কয়েকজন নেতা খুঁজে বের করতে হবে যাদের উপর দায়িত্ব দিলে তারা দলকে শক্তিশালীভাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
বর্তমানে শেখ হাসিনা তার উপদেষ্টাদের পরামর্শে সকল প্রকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন বলে পর্যবেক্ষক মহল ধারণা করছেন। প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টারা প্রায় সকলেই একসময় পাকিস্থান সরকারের আমলা ছিলেন। তারা কখনো সরাসরি রাজনীতির সাথে সক্রিয় ছিলেন না। এসকল আমলাদের হস্তক্ষেপের কারণেই আজ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পরছে বলে তৃণমূলের নেতারা দাবি করেন। তৃণমূলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তত্পরতা রাজধানী ঢাকার মত ততটা শক্ত নয় বলে অনেকে মনে করছেন। ঢাকার বাহিরে বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের বেহাল অবস্থার কথা বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব স্বীকার না করে বাস্তবতাকে আড়ালে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। তবে দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূলের এই দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থার কথা অবহিত বলে অনেকে ধারণা করছেন। তাই হয়তো দলের এই বেহাল অবস্থার পরিবর্তন আনার লক্ষে শেখ হাসিনা আসছে কাউন্সিল অধিবেশনে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। দলের ভবিষ্যতের জন্য নেতৃত্বে একটা পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি বলে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতা কর্মীরা ইতিমধ্যে শেখ হাসিনার কাছে দাবি জানিয়েছেন বলেও শুনা যায়।
লেখক: ইলেকটেড কাউন্টি কাউন্সিলার স্টকহোল্ম কাউন্টি কাউন্সিল, সভাপতি সুইডিশ লেফট পার্টি স্টকহোল্ম হেসেলবি ভেলেংবি ব্রাঞ্চ



Leave a Reply