জাতীয় হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সিসিইউতে ১৯ আগস্ট চারজন রোগী মারা যান। তাঁদের একজন রাজধানীর মিরপুরের টিনশেড কলোনির আবদুল জলিল। তাঁর বয়স ছিল ৪৫ বছর। আবদুল জলিল বাস-ট্রাকের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর ডায়াবেটিস ছিল, নিয়মিত ধূমপান করতেন।
ওই একই দিনে বহির্বিভাগে পাঁচজনকে আনা হয়েছিল মৃত অবস্থায় (ব্রট ডেড)। মৃত পাঁচজনের একজন কুমিল্লা জেলার দক্ষিণ বেতিয়ারা গ্রামের আবু বকর সিদ্দিক (৩৫)। হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক এস টি এম আবু আজম বলেছেন, বয়সটা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। তবু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কম বয়সী অনেকেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।
আবু আজম বলেন, অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও রোগের প্রাদুর্ভাবে পরিবর্তন ঘটছে। সংক্রামক রোগের পরিবর্তে দীর্ঘস্থায়ী অসংক্রামক রোগ, যেমন—হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার ও শ্বাসতন্ত্রের রোগের প্রকোপ বাড়ছে। দেশে এখন মৃত্যুর প্রধান কারণ হৃদ্রোগ ও স্নায়ুতন্ত্রের রোগ। বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (২০১১) প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০৩০ সাল নাগাদ যে কয়টা দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষ বেশি বাস করবে, বাংলাদেশ তার অন্যতম।
২০৩০ সাল বৈশ্বিক উন্নয়নের একটি নির্দিষ্ট সময় সীমা। ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল-এসডিজি) এবং ১৬৯টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য এই সময়সীমা বৈশ্বিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সব বয়সী সব মানুষের সুস্থ জীবন ও ভালো থাকা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ১৩টি লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। এর একটিতে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরোধ ও চিকিৎসার মাধ্যমে অসংক্রামক রোগে মৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনতে হবে। এই সময়ের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে হবে এবং ভালো থাকার বিষয় এগিয়ে নিতে হবে।
সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যে (এমডিজি) অসংক্রামক রোগ বিষয়ে কোনো লক্ষ্য বা লক্ষ্যমাত্রা ধার্য ছিল না। তবে এসডিজিতে আছে। এমডিজি শেষ হওয়ার পর এসডিজির কার্যক্রম কাগজপত্রে এ বছর ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হলেও স্বাস্থ্য খাতে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অসংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ ও এতে মৃত্যু কমানোর বিষয়টি পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। উন্নয়ন সহযোগী ও দাতাদের অবস্থানও একই পর্যায়ে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এসডিজি পরিকল্পনা, কার্যক্রম পরিচালনা ও পর্যবেক্ষণ করার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একটি উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ১৬৯টি টার্গেট ধরে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ম্যাপিং করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তা চূড়ান্ত হবে। এতে অসংক্রামক ব্যাধির বিষয়ও থাকছে। তিনি বলেন, জাতিসংঘের আগামী সাধারণ অধিবেশনে সূচক চূড়ান্ত হলে মনিটরিংয়ের বিষয়গুলো ঠিক করা হবে।
অসংক্রামক রোগের বোঝা:
বিশ্বব্যাংকের ‘ট্যাকলিং ননকমিউনিকেবল ডিজিজেস ইন বাংলাদেশ’ নীতি প্রকাশনায় বলা হয়েছে, ২৩টি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে হৃদ্রোগ ও ডায়াবেটিসে মৃত্যুর দিক থেকে বাংলাদেশ নবম স্থানে। এতে বলা হয়েছে, ৩০ বছর বা বেশি বয়সী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের এক-তৃতীয়াংশ ডায়াবেটিস, ক্যানসার, হৃদ্রোগ বা শ্বাসতন্ত্রের জটিলতার রোগী। অন্যদিকে জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ২০১১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে অসংক্রামক ব্যাধি-বিষয়ক আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বৈশ্বিকভাবে ৬০ শতাংশ এবং বাংলাদেশে ৬১ শতাংশ মৃত্যুর কারণ হৃদ্রোগ, শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা, ক্যানসার ও ডায়াবেটিস।
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রকাশনায় দেশে অসংক্রামক রোগের বোঝা অনেক বড়—এটাই শুধু বলা হয়। তবে দু-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপে (২০১১) বলা হয়েছিল, দেশে ৫০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছে। আর উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছে, দেশে ১০ থেকে ১১ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত। আর প্রতিবছর নতুন করে প্রায় দেড় লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। তবে জাতীয় পর্যায়ে এ নিয়ে কোনো জরিপ নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক কর্মসূচি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধান চারটি অসংক্রামক রোগ (ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, ক্যানসার ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা) ছাড়াও আর্সেনিকোসিস, কিডনি রোগ, শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, থ্যালাসেমিয়া, অস্টিওপরেসিস নিয়েও তাঁরা কাজ করেন।
অধ্যাপক আবু আজম বলেন, উচ্চ মাত্রায় তামাক সেবন, অপুষ্টি, কায়িক শ্রমে অনীহা, উচ্চ রক্তচাপ, এগুলো অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। এর সঙ্গে বায়ুদূষণ, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জীবনযাপন প্রণালিতে পরিবর্তন অসংক্রামক রোগের বোঝা বাড়াচ্ছে।
আর্থিক চাপ:
এসডিজি-বিষয়ক জাতিসংঘ দলিলে বলা হয়েছে, অসংক্রামক রোগ টেকসই উন্নয়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মানসম্পন্ন সেবা ও সেবার ক্ষেত্রে ন্যায্যতার যে কথা এসডিজি দলিলে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ তা থেকে অনেক দূরে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসংক্রামক রোগের চিকিৎসাসেবা ব্যয় অনেক বেশি। অনেকে চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে দরিদ্র হয়ে পড়ে। রুহুল আমিন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ৩৪ বছর নিরাপত্তা কর্মকর্তার চাকরি করার পর সম্প্রতি অবসরে গেছেন। রুহুল আমিন প্রথম আলোকে জানান, তাঁর ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়েছে ১১ বছর আগে। এর পাঁচ বছর পর তাঁর হৃদ্রোগ ধরা পড়ে। চিকিৎসা বাবদ মাসে চার হাজার টাকার মতো খরচ হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষার একটি কাগজ দেখিয়ে ম্লান মুখে বললে, ‘পরীক্ষায় এবার কিডনির সমস্যা ধরা পড়েছে। এখন খরচ আরও বাড়বে।’
ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, একজন ডায়াবেটিস রোগীর জন্য বছরে ২৮ ডলার মূল্যের ওষুধ লাগে। বাংলাদেশে যে পরিমাণ রোগী ডায়াবেটিসে ভুগছে, তাদের ওষুধের জন্য বছরে ২৬২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হবে, যা ২০১০-১১ সালের স্বাস্থ্য বাজেটের ২৪ শতাংশ।
সরকার কী করছে:
অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর মো. ফারুক আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, সরকার পাঁচ বছরমেয়াদি স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির প্রকল্প দলিল তৈরি করছে। ২০১৭ সালের শুরু থেকে এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু হবে। অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ-বিষয়ক কার্য পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা মাথায় রেখে।
গত পাঁচ বছরে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ-বিষয়ক কর্মসূচিতে সরকারের বরাদ্দ ছিল ৩৪৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এর বড় অংশ খরচ হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণে।
উন্নয়ন সহযোগীদের অবস্থান: জাতিসংঘ দলিলে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আর্থিক সম্পদ, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি—এসব ক্ষেত্রে যে দৃঢ় অংশীদারত্ব গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবে দেখা যাচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, ‘লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কাজটি শুরু হওয়া দরকার মৌলিক তথ্য-উপাত্ত কী আছে, তা যাচাই করার মধ্য দিয়ে। আমরা যদি না জানি কত মানুষের মৃত্যু হয়, তাহলে এক-তৃতীয়াংশ মৃত্যু কমানোর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া সম্ভব হবে না।’ ভিত্তি ডেটার ওপর জাতিসংঘও জোর দিয়েছে। দলিলে বলা হয়েছে, যেখানে তথ্য-উপাত্ত নেই, সেখানে তা উৎপাদন করতে হবে।
স্বাধীনতার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা করে আসছে। কিন্তু অসংক্রামক রোগের ব্যাপারেও তাদের অবস্থান দৃঢ় নয়। ইউএসএআইডির জ্যেষ্ঠ পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন উপদেষ্টা কান্তা জামিল প্রথম আলোকে বলেন, ইউএসএআইডি মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়তা দিয়ে আসছে। অসংক্রামক রোগ খাতে ‘ইমপ্লিমেন্টেশন রিসার্চ’ নামের একটি গবেষণা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। তিনি বলেন, অসংক্রামক ব্যাধি ইস্যুটি বাংলাদেশের জন্য যত বড় সমস্যা, দাতা বা উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে গুরুত্ব ততটা পাচ্ছে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে মূলত কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান বা কাজ কী করছে, লিখিতভাবে জানতে চাইলে তাদের পক্ষ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।


