বাংলাদেশের বিখ্যাত বনগুলোর মধ্যে মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়ার বন অন্যতম। পরিচিতির দিক থেকে সুন্দরবনের পরেই লাউয়াছড়া বনের অবস্থান। এটি একটি মিশ্র চিরহরিৎ বনাঞ্চল। দেশের ১০টি জাতীয় উদ্যান ও ৭টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যর মধ্যে এটি অন্যতম।
সরকার ১৯৯৭ সালে ১২৫০ হেক্টর আয়তনের বন জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এই বনকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য এ বন বিখ্যাত। উল্লুক ছাড়াও এখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির দুর্লভ জীব জন্তু, কীটপতঙ্গ এবং উদ্ভিদ। নিরক্ষীয় অঞ্চলের চিরহরিৎ বর্ষাবন বা রেইন ফরেস্টের মতো এ বনে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। একটু সূর্যের আলো পেতে এ বনের গাছপালা খুব উঁচু হয়ে থাকে এবং অনেক ওপরে ডালপালা ছড়িয়ে চাঁদোয়ার মতো সৃষ্টি করে। এই বন এতই ঘন যে মাটিতে সূর্যের আলো পড়ে না বললেই চলে।
১৯২৫ সালে তদানীন্তন বৃটিশ সরকার এখানে বৃক্ষায়ন করলে তা পর্যায়ক্রমে বেড়ে আজকের এই বনে পরিণত হয়। ২০০৯ সালে লাউয়াছড়ায় নিঃসর্গ প্রকল্প পরে ক্রেল প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষগুলোর সঙ্গে বন বিভাগের অংশীদারিত্বের সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সুষ্ঠু সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা চলছে। এতে বনের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এবং বনের সংরক্ষণের স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ইউএসআইডির আর্থিক সহযোগিতায় দেশের ১৭টি বনাঞ্চলে এই প্রকল্প চালু আছে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত।
এ প্রকল্পের আওতায় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে প্রকৃতি ভ্রমণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নির্দিষ্ট হারে প্রবেশ মূল্য দিয়ে বনের ভিতর পরিভ্রমণ করা যায়। প্রকৃতি ভ্রমণের জন্য তিনটি ট্রেইল বা হাঁটাপথ রয়েছে। তিনটি পথের মধ্যে একটি ৩ ঘণ্টার পথ, ১টি এক ঘণ্টার পথ আর অপরটি ৩০ মিনিটের পথ। প্রশিক্ষিত গাইডের সহায়তায় বনের একেবারে ভেতর পর্যন্ত যাওয়া যায়। প্রকৃতিকে বিরক্ত না করে তৈরি করা এ তিনটি পথে চোখে পড়বে নানা প্রজাতির কীটপতঙ্গ, গাছপালা, পাখি ও অর্কিড। ভাগ্য ভালো হলে হনুমান, বানর এবং উল্লুকের দেখা মিলতে পারে। দেশ বিদেশের অসংখ্য পর্যটক লাউয়াছড়ার প্রকৃতি ভ্রমণে আসেন। বছরজুড়েই এ বনে পর্যটকদের আনাগোনা থাকলেও শীতের সময় সবচেয়ে বেশি লোকসমাগম হয়। তবে বিশেষ দিবসে শুক্র ও শনিবার দর্শনার্থী বেড়ে যায়। উদ্যানটিকে ঘিরে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়েছে। টুরিস্ট পুলিশের একজন এএসআইয়ের নেতৃত্বে রয়েছে ১০ জন পুলিশ।
ক্লাইমেট রিলিজিয়েন্ট ইকোসিস্টেম এন্ড লাভলি হোডস (ক্রেল) প্রজেক্ট দেয়া তথ্যে জানা গেছে, ১লা নভেম্বর ২০০৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে মোট দর্শনার্থী এসেছে ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৮২৪ জন, এর মধ্যে বিদেশি পর্যটক এসেছে ৯ হাজার ৬১৮ জন। এ থেকে আয় হয়েছে ১ কোটি ৫৮ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৫ টাকা। এর মধ্যে ৪৬ হাজার ৫৭১টি যানবাহন থেকে আয় হয়েছে ১১ লাখ ৬৪ হাজার ২৭৫ টাকা, পিকনিক স্পটের ব্যক্তিগতভাবে পরিবার নিয়ে আসা ২২ হাজার ৯৮৫ জনের কাছ থেকে আয় হয়েছে ২২,৯৮,৫০ টাকা এবং ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা আয় হয় ২১টি শুটিং থেকে। সব মিলিয়ে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৮৬ হাজার ৫০ টাকা আয় হয়।
শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার মৌলভীবাজার ফরেস্ট রেঞ্জের আওতাধীন ২ হাজার ৭৪০ হেক্টর আয়তনের পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বন ছিল এলাকাটি। সেই সুবাদে লাউয়াছড়া বনের পূর্ববর্তী নাম পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বন।
বনের অস্তিত্ব ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি প্রকৃতি ভ্রমণ ও জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পশ্চিম ভানুগাছ বনের ১ হাজার ২৫০ হেক্টর এলাকাকে ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও সংশোধন) আইনানুযায়ী ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। চিরহরিৎ এ বনে নিরক্ষীয় অঞ্চলের বর্ষাবন বা রেইন ফরেস্টের বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। এক সময় বৃহত্তর সিলেটের সর্বত্রই এ ধরনের বন ছিল।
তবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা বাগান সৃষ্টি, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ এবং নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে ক্রমেই সংকুচিত হতে হতে মাত্র কয়েকটি স্থানে চিরহরিৎ বর্ষাবনের অস্তিত্ব টিকে আছে। হলিউডের চলচিত্রের শুটিং: জুলভানের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে করা ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’ ছবিটির একটি দৃশ্য শুটিং হয়েছিল এ বনে। ১৩টি দেশের ১১৪টি লোকেশনে চিত্রায়িত হয় ছবিটি। এসব দেশের মধ্যে ছিল বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ভারত, স্পেন, থাইল্যান্ড ও জাপান। আর বাংলাদেশের অংশের শুটিং হয়েছিল লাউয়াছড়া জঙ্গলে।
বন ঘেঁষে যে রেলপথ চলে গেছে, ঠিক সেখানেই হয়েছে ছবিটির কিছু দৃশ্যের শুটিং। ছবিটির দৃশ্য ছিল এরকম- ট্রেন ছুটছে, হঠাৎ চালক খেয়াল করলেন লাইনের সামনে একপাল হাতি আপন মনে চরে বেড়াচ্ছে। ট্রেন থেমে যায়। কামরা থেকে নেমে আসেন নায়ক ডেভিড নিভেন- ব্যাপারটা কি দেখতে। সামনের গ্রামেই তখন হচ্ছিল সতীদাহ। নায়ক ছুটে গিয়ে মেয়েটিকে বাঁচান। মেয়েটির নাম হলো শার্লি ম্যাক্লেইন। ছবির এই অংশটুকুই চিত্রায়িত হয়েছিল লাউয়াছড়া রেললাইন এলাকায়।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভূ-প্রকৃতি পাহাড়ি মৃত্তিকা গঠিত। উঁচুনিচু টিলাজুড়ে এ বন বিস্তৃত। বনের মাটিতে বালুর পরিমাণ বেশি এবং প্রচুর পাথর দেখা যায়। বনের মাটিতে পাতা জমে জমে পুরু স্পঞ্জের মতো হয়ে থাকে। জায়গায় জায়গায় মাটিই দেখা যায় না। এসব স্থানে জোঁকের উপদ্রব বেশি। বনের ভেতর দিয়ে অনেক ছড়া বয়ে চলেছে। এসব ছড়ার কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলোতে শুধু বর্ষার সময় পানি থাকে। ছড়ার পানি পরিষ্কার টলটলে ও ঠাণ্ডা। যেসব ছড়াতে শুষ্ক মৌসুমেও পানি থাকে সেসব ছড়ার কাছে বন্যপ্রাণীর আনাগোনা দেখা যায়।
জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের সমৃদ্ধ বনগুলোর একটি। আয়তনে ছোট হলেও এ বন দুর্লভ উদ্ভিদ এবং প্রাণীর এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। বনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই নানাধরনের বন্যপ্রাণী, পাখি ও কীটপতঙ্গের শব্দ শোনা যায়। বনের মধ্যে প্রায় সারাক্ষণই সাইরেনের মতো শব্দ হতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে এটি এক ধরনের ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দ। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি এবং ২০ প্রজাতির স্তন্যপ্রাণী দেখা যায়। এ বনে স্তন্যপ্রাণী আছে নানা প্রজাতির। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য এ বন বিখ্যাত। বনের মধ্যে কিছু সময় কাটালেই উল্লুকের ডাকাডাকি কানে আসবে।
উল্লুক ছাড়াও এখানে রয়েছে মুখপোড়া হনুমান, বানর, শিয়াল, মেছোবাঘ, বন্য কুকুর, ভাল্লুক, মায়া হরিণসহ (বার্কিং ডিয়ার) নানা প্রজাতির জীবজন্তু। মায়া হরিণ সাধারণত উচ্চতায় ২০-২২ ইঞ্চি। এদেও বাদামি রঙের দেহ যা পিঠের দিকে গিয়ে গাঢ় রং ধারণ করে। এ বনে সরীসৃপ আছে নানা প্রজাতির। তার ভেতর অজগর হচ্ছে অনন্য। এখানে পাওয়া যায় হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ। উদ্যানে বন্যপাখির মধ্যে সবুজ ঘুঘু, বন মোরগ, তুর্কিবাজ, সাদা ভ্রু সাতভায়লা, ঈগল, হরিয়াল, কালো মাথা টিয়া, কালো ফর্কটেইল, ধূসর সাত শৈলী, পেঁচা ফিঙে, লেজ কাটা টিয়া, কালোবাজ, হীরামন, কালোমাথা বুলবুল, ধুমকল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সাধারণ দর্শনীয় পাখিদের মধ্যে টিয়া, ছোট হরিয়াল, সবুজ সুইচোরা, তোতা, ছোট ফিঙে, সবুজ কোকিল, পাঙ্গা, কেশরাজ প্রভৃতির দেখা মিলে।



Leave a Reply