বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

৪১ দিনের কথা বলে ফারাক্কা চালু করেছিল ভারত

Farakka-Barrage১৯৭৫ সালে ২১ এপ্রিল ৪১ দিনের জন্য পরীামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধের সব ফিডার ক্যানেল চালুর কথা বাংলাদেশে শেখ মুজিব সরকারকে বলেছিল ভারত। কিন্তু ওই ৪১ দিনের পরিবর্তে ৪১ বছর ধরে বাঁধটি চালু আছে…

নদীমাতৃক বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৩০টিরও বেশি নদ-নদী রয়েছে। এর মধ্যে ৫৭টি নদী আন্তর্জাতিক যার মধ্যে ৫৪টির মূল উৎস তিব্বত (চিন), নেপাল, ভুটান ও ভারতের পর্বতময় অঞ্চল। অবশিষ্ট ৩টি নদী এসেছে পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার থেকে। বাংলাদেশের অবস্থান ভাটি অঞ্চলে হওয়ায় উজানে যে কোনো ধরনের পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের ওপর। ভারত কর্তৃক গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধের কারণে মারাত্মক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বাংলাদেশের।

ভারত কর্তৃক ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির ব্যাপক প্রত্যাহার বাংলাদেশের গঙ্গা-নির্ভর এলাকার জনগণের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। মনুষ্যসৃষ্ট এই দুর্বিপাক দেশের সমগ্র দণি-পশ্চিমাঞ্চলে নিদারুণ আঘাত হানে। বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, বনজ, শিল্প, নৌপরিবহন, জল সরবরাহ ইত্যাদি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় ফারাক্কা বাঁধের ফলে। বাংলাদেশের এসব প্রত্যক্ষ ক্ষতির আনুমানিক পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পরো ক্ষতি হিসেবে আনলে এই পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে।

এই বাঁধের কারণে বাংলাদেশে পদ্মা ও এর শাখানদীগুলোর জলবিদ্যা ও ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলো মারাত্মকভাবে তিগ্রস্ত হয়েছে। গঙ্গার প্রবাহ হ্রাসের ফলে অত্যধিক পলিময়তার সৃষ্টি হয়েছে যা নদীর বুক ভরাট করে নদীর খাড়িগুলোর পরিবহন মতা কমিয়ে দিয়েছে। যার কারণে বর্ষায় বন্যার তীব্রতা দেখা দিচ্ছে বাংলাদেশে। এবারও বর্ষায় ফারাক্কা বাঁধ খুলে দেওয়ায় দেশের অনেক জেলা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। বসতবাড়ি ভেসে যাওয়ায় বাস্তুহারা হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হয়েছে কোটি-কোটি মানুষকে। এ ছাড়া নষ্ট হয়েছে আবাদি ফসল, প্রাণ গেছে অসংখ্য গবাদিপশুর।

কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় রাজমহল ও ভগবানগোলার মাঝে ফারাক্কা নামক স্থানে বাঁধ নির্মাণ করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পশ্চিম সীমানা থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার (১১ মাইল) উজানে গঙ্গা নদীর ওপর বসানো হয় বাঁধটি। ১৯৬১ সালে বাঁধের মূল নির্মাণকাজ হাতে নেওয়া হয় যা ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হয়। ১৯৭৫ সালে ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৪১ দিনের জন্য পরীামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধের সব ফিডার ক্যানেল চালুর কথা বলে ভারত। কিন্তু ওই ৪১ দিনের পরিবর্তে ৪১ বছর পরও বাঁধটি চালু আছে।

ভারত কর্তৃক ফারাক্কায় একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, কৃষি, লবণাক্ততা, নৌপরিবহন, মৎস্যসম্পদ ইত্যাদি বিভিন্ন েেত্র এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ল করা যায়। ভারত সরকার শুকনো মৌসুমে ফারাক্কার উজানে পানি প্রত্যাহার করে। ফলে ফারাক্কার ভাটিতে বাংলাদেশ অংশে পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ কমে আসে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। যার ফলে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যায়, ধারণক্ষমতা কমে আসে বাংলাদেশের পদ্মা এবং এর শাখানদীগুলোতে। আবার বর্ষা মৌসুমে যখন বাঁধের নিয়ন্ত্রক গেট খুলে দেওয়া হয় সেই সময় তীব্র বেগে ধেয়ে-আসা পানিতে প্রায় প্রতিবছরই বন্যার সৃষ্টি হয় বাংলাদেশে।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৫১ সালের ২৯ অক্টোবর তৎকালীন পাকিস্তান সরকার প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ভাগিরথী নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গানদী থেকে বিপুল পরিমাণ পানি প্রত্যাহারের ভারতীয় পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে গঙ্গার বিষয়টি সবার নজরে আসে। ১৯৫২ সালে প্রত্যুত্তরে ভারত জানায় যে, পরিকল্পনাটি মাত্র প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে পাকিস্তানের উদ্বেগ সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর। এ ঘটনা থেকেই গঙ্গার জলবণ্টন-সংক্রান্ত আলোচনার দীর্ঘ ইতিহাসের সূত্রপাত। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান ও ভারত সরকার বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সরকারপ্রধান পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে গঙ্গার প্রবাহ বণ্টনের ব্যাপারে বহুবার আলোচনায় বসেছে।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারের সঙ্গে গঙ্গা প্রশ্নে আলোচনা শুরু করে। ১৯৭২ সালে গঠিত হয় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন । এই কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শুকনা মৌসুমে ভারতের অংশে ফারাক্কা বাঁধের ভাটিতে এবং বাংলাদেশ অংশে হার্ডিঞ্জব্রিজের ভাটিতে যৌথভাবে পানি প্রবাহ এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত তথ্যাদি দুদেশের মাঝে নিয়মিত বিনিময় করা হয়। কমিশনের দীর্ঘ বৈঠকের পরেও বাংলাদেশ তার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়।

১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানি বণ্টন বিষয়ে এক যৌথ বিবৃতি দেন। এই যৌথ বিবৃতি অনুসারে, বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য শুকনো মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে (ব্যারাজের ভাটিতে) ৪৪,০০০ কিউসেক পানি (১ কিউসেক = প্রতিসেকেন্ডে প্রবহমান এক ঘনফুট পানি) পাবে। ১৯৭৫ সালের ৩১ মে তারিখে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। ওই শীর্ষ বৈঠকে আরও আলোচিত হয়, শুকনো মৌসুমের পানি ভাগাভাগির পর্যায়ে দুদেশের মধ্যে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ফারাক্কা বাঁধ চালু করা হবে না। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ভারত বাংলাদেশকে জানায় যে, ফারাক্কা বাঁধের ফিডার ক্যানাল পরীা করা তাদের প্রয়োজন। সে সময় ভারত ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ৪১ দিন ফারাক্কা থেকে ৩১০-৪৫০ কিউবিক মিটার/সেকেন্ড গঙ্গার প্রবাহ প্রত্যাহার করার ব্যাপারে বাংলাদেশের অনুমতি প্রার্থনা করে। বাংলাদেশ সরল বিশ্বাসে এতে সম্মতি দেয়। ভারত বাঁধ চালু করে এবং নির্ধারিত সময়ের পরেও একতরফাভাবে গঙ্গার গতি পরিবর্তন করতে থাকে যা ১৯৭৬ সালের পুরো শুকনো মৌসুম পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

ভারতকে এ কাজ থেকে বিরত করতে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশ এ ব্যাপারে জাতিসংঘের শরণাপন্ন হয়। ১৯৭৬ সালের ২৬ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি সর্বসম্মত বিবৃতি গৃহীত হয়, যাতে অন্যান্যের মধ্যে ভারতকে সমস্যার একটি ন্যায্য ও দ্রুত সমাধানের ল্েয জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় বসার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর জের ধরে কয়েক দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর দুদেশ ফারাক্কায় প্রাপ্ত শুকনো মৌসুমের জলবণ্টনের ওপর ৫ বছর মেয়াদি (১৯৭৮-৮২) একটি চুক্তি স্বার করে। বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই তাতে স্বাক্ষর করেন। কিন্তু ১৯৮২ সালের ৪ নভেম্বর চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হয়।

তার পর সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে ১৯৮২ ও ১৯৮৫ সালে ভারতের সঙ্গে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বারিত হয়। কিন্তু ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন বিষয়ে আর কোনো চুক্তি হয়নি। ১৯৮৯ সালের পর শুকনো মৌসুম থেকে জল ভাগাভাগি-সংক্রান্ত কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা চালু ছিল না। এই সুযোগে ভারত শুকনো মৌসুমে নদীর পানি ব্যাপকভাবে একতরফা প্রত্যাহার শুরু করে। ফলে বাংলাদেশে গঙ্গার প্রবাহ ব্যাপক কমে আসে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ফারাক্কা বাঁধ দেওয়ার আগে বছরের মার্চ মাসে হার্ডিঞ্জ সেতুর কাছে যেখানে গঙ্গার (পদ্মা) প্রবাহ ছিল প্রতি সেকেন্ডে ১৯৮০ কিউবিক মিটার, ১৯৯৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ২৬১ কিউবিক মিটারে।

অবশেষে ফারাক্কা পয়েন্টে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে সময়ের মধ্যে ১০ দিন অন্তর-অন্তর হিসাবে ভারত ও বাংলাদেশ কে কী পরিমাণ পানি পাবে, এই ভাগবাটোয়ারার বিষয়ে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারত সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের মাঝে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে স্বার করেন বাংলাদেশ সরকারের পে তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারত সরকারের পে দেশটির প্রধানমন্ত্রী এইচডি দেবগৌড়া। চুক্তি অনুযায়ী, ফারাক্কা পয়েন্টে পানি প্রবাহ ৭০,০০০ কিউসেক হলে ভারত ৫০% এবং বাংলাদেশ ৫০% পাবে। পানি প্রবাহ ৭০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ কিউসেক হলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫,০০০ কিউসেক এবং অবশিষ্ট পাবে ভারত। পানি প্রবাহ ৭৫,০০০ কিউসেকের বেশি হলে ভারত ৪০,০০০ কিউসেক এবং অবশিষ্ট বাংলাদেশ। এই চুক্তিটি বর্তমানে কার্যকর আছে। ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি ভারত ও বাংলাদেশের মাঝে প্রথম এবং একমাত্র পূর্ণাঙ্গ পানি চুক্তি।

আরও পড়ুন