মানবতাবিরোধী অপরাধে একাত্তরের বদর নেতা ও জামায়াতের অন্যতম অর্থযোগানদাতা মীর কাশেম আলী’র ফাঁসির রশি টান দিয়েছে সেই জল্লাদ শাজাহান।
সন্ধ্যার পর মীর কাসেমের সঙ্গে পরিবারের সবাই দেখা করে কারাগার থেকে বের হয়ে যান। কাসেমের স্বজনরা কারাগার থেকে বের হওয়ার পরই কারা ফটক ও আশপাশের এলাকা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগেই বিকেল সাগে পাঁচটার মধ্যে এদিন কারাগারের অন্য সব বন্দিকে নিজ নিজ সেল ও প্রকোষ্ঠে পাঠানো হয়।
শনিবার রাত সাড়ে ৯টায় কারা মসজিদের ইমাম হাফেজ মুফতি হেলাল উদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে জ্যেষ্ঠ জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক ও জেল সুপার নাসির আহমদ কনডেম সেলে মীর কাসেমের কক্ষে যান। সেখানে মীর কাসেমের কাছে গিয়ে তাঁরা জানতে চান, তার কোনো কিছু খেতে ইচ্ছে করছে কিনা?
জবাবে মীর কাসেম আলী বলেন, ‘না’। এরপর মীর কাসেমকে জেল সুপার নাসির উদ্দিন বলেন, ‘এটাই আপনার শেষ রাত। এ রাতেই আপনার ফাঁসি কার্যকর করা হবে। এখন আপনাকে তওবা পড়তে হবে’। তখন মীর কাসেম বলেন, ‘আমি নিজেই তওবা পড়তে পারবো’। এরপর তিনি নিজেই তওবা পড়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করেন।
এরপর ঊর্ধ্বতন কারা কর্তৃপক্ষের সামনে তাকে বিভিন্ন রকমের খাবার দেওয়া হয়। খাবারগুলোর মধ্যে ছিল গরুর মাংস, সবজি, ভাত, ডাল পায়েস ও কয়েক রকম ফল। কিন্তু তিনি শুধুমাত্র একটুখানি হালুয়ার মতো করে তৈরি করা পায়েস খেয়েছেন বলে জানিয়েছে কারাসূত্র।
এ সময়ে কারা কর্তৃপক্ষ রায় কার্যকরের বিষয়ে আলোচনা করে। এসময় উপস্থিত ছিলেন আইজি প্রিজন সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ, ডিআইজি প্রিজন গোলাম হায়দার, জ্যেষ্ঠ জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বনিক, কারাধ্যক্ষ (জেলার) নাসির উদ্দিন আহমদ, গাজীপুর জেলা প্রশাসক এস এম আলম, জেলা পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি সার্কেল এএসপি মনোয়ার হোসেন, জয়দেবপুর থানার ওসি খন্দকার রেজাউল হাসান, গাজীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. আলী হায়দার খান, কারা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আহসান হাবীব।
রাত দশটায় আলোচনা শেষে প্রধান জল্লাদ শাহজাহানের নেতৃত্বে চারজন জল্লাদ কনডেম সেলে প্রবেশ করেন। কনডেম সেলে প্রবেশ করে মীর কাসেমকে জমটুপি পরিয়ে দেন জল্লাদ দীন ইসলাম। এরপর সেখান থেকে মীর কাসেমকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রধান জল্লাদ শাহজাহানের নেতৃত্ব চার জল্লাদ মীর কাসেম আলীকে ধরে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যায়। এ সময় তিনি কোনো প্রকার হৈ চৈ করেননি। অনেকটা শান্ত ও স্থির ছিলেন।
তাকে আট ফুট দৈর্ঘ্য ও সাড়ে চার ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট ফাঁসির মঞ্চে উঠানো হয়। মঞ্চটি ভূমি থেকে বেশ উঁচু। মঞ্চ থেকে নিচের দিকে ১২ ফুট গভীর গর্ত আছে। সেই গর্তটি কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢাকা। রাত সাড়ে দশটার সময় জেলা প্রশাসক হাত থেকে লাল রুমাল নিচে ফেলে দেন। সঙ্গে সঙ্গে লিভারে চাপ দেয় জল্লাদ শাহজাহান। পায়ের নিচ থেকে সরে যায় পাটাতন। ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে থাকে মীর কাসেম আলী।
ফাঁসি কার্যকরের সময় মঞ্চ সংলগ্নস্থানে একটি লম্বা টেবিলের সঙ্গে বেশকিছু চেয়ার পাতা হয়। তাতে পাশাপাশি বসেন ১০ জন কর্মকর্তা। প্রায় ২০ মিনিট ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রাখার পর মীর কাসেমের লাশ তুলে টেবিলে রাখা হয়। লাশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন সিভিল সার্জন ডা. আলী হায়দার। এরপর গোসল শেষে মীর কাসেমের মরদেহ কফিনে করে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে মানিকগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় পুলিশ।
জল্লাদ শাজাহান বৃত্তান্ত:
জল্লাদ শাজাহান প্রসঙ্গে এক কারা কর্মকর্তা জানান, জল্লাদ শাজাহান অন্যদের চেয়ে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। সুঠাম দেহ ও অধিক মনোবলের কারণে শাহজাহানই প্রথম পছন্দ কারা কর্তৃপক্ষের।
এর আগে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় কার্যকরে জল্লাদের ভূমিকা পালন করেন শাজাহান।
এছাড়া এরশাদ শিকদার এবং বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকরেও ভূমিকা রেখেছেন শাহজাহান। কখনও কখনও তিনি ছিলেন প্রধান জল্লাদের ভূমিকায়।
জল্লাদ শাজাহান ১৪৩ বছরের সাজাপ্রাপ্ত একজন কয়েদী। ৩৬ বছর ধরে কারাবাস করছেন তিনি। কারাগার থেকে দ্রুত মুক্তিলাভের জন্যই তিনি জল্লাদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন বলেও সূত্র জানায়। তিনি এ পর্যন্ত প্রায় ৫০টি ফাঁসি কার্যকর করেছেন বলে জানা গেছে।
১৯৫০ সালের ২৬ মার্চ নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ইছাখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শাহজাহান ভূঁইয়া। ১৯৭৪ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন শাহজাহান। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অবিবাহিত।


