বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ক্যাম্পাস হবে কেরানীগঞ্জে

jagonnath universityপুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ‌্যালয়ের জন‌্য বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জে ‘অখণ্ড জমিতে’ সব সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত নতুন ক‌্যাম্পাস স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক ‘জরুরি’ সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সরকারের এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেন, “মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ায় আমরা খুবই আনন্দিত।”

আবাসিক হলের দাবিতে গত প্রায় এক মাস ধরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সরকারের এই সিদ্ধান্ত এল।

কেরানীগঞ্জে নতুন ক‌্যাম্পাস হলেও পুরান ঢাকার চিত্তরঞ্জন এভিনিউয়ে ঢাকার অন‌্যতম প্রাচীন এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পুরনো স্থাপনাগুলোও থাকবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।

তিনি বলেছেন, “বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপুরি কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর হবে কি না, তা এখনই বলার বিষয় নয়। বড় যে কার্যক্রমগুলো তা ওখানে হবে। কোনটি মূল ক‌্যাম্পাস হবে, কোথায় কী কাজ হবে- সেসব বিষয়ে একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জগন্নাথের ছাত্রদের জন‌্য কেরানীগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে ১০ তলা একটি আবাসিক হল নির্মাণের যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, সেখানেই আরও জমি নিয়ে নতুন ক‌্যাম্পাস হবে বলে জানান নাহিদ।

তিনি বলেন, “ওখানে ২৫ বিঘা জায়গা কেনা আছে। ওই জায়গার আশপাশে আরও জমি আছে। সবার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি। বিশ্ববিদ‌্যালয়ের যে পরিমাণ জমি প্রয়োজন, তা ওখান থেকে নিতে পারব।”

কেরানীগঞ্জে নতুন ক্যাম্পাস করার পক্ষে যুক্তি দিয়ে নাহিদ বলেন, “যে পরিমাণ জমি এখন আমাদের আছে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর মত যে ধরনের অবকাঠামো এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যা যা প্রয়োজন তা করার মত উপযুক্ত জায়গা নেই। এর মধ্যে এত বিশাল ইউনিভার্সিটি চালানো কঠিন, অসম্ভব প্রায়।”

হলের দাবিতে আন্দোলনরত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বুধবার রাজধানীর পল্টন মোড়ে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন।
সিদ্ধান্ত দিল মন্ত্রিসভা

কলেজ থেকে বিশ্ববিদ‌্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার পর গত সাত বছর ধরে হলের দাবি জানিয়ে এলেও তা পায়নি পুরান ঢাকার এই উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। কেরানীগঞ্জে ১০ তলা হল নির্মাণের জন‌্য প্রকল্প নেওয়া হলেও তাতে গতি আসছিল না।

এর মধ‌্যে নাজিমউদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার পর ওই স্থানটি হলের জন‌্য চেয়ে গত মাসে রাজপথে নামে জগন্নাথের শিক্ষার্থীরা।

এরপর গত ২৪ অগাস্ট সচিবালয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ‌্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠক করে শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ জানান, হল নির্মাণ প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়েছেন।

সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে জগন্নাথ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে আলোচনা হলে সরকারের নতুন নির্দেশনা আসে।

বৈঠকে উপস্থিত মন্ত্রিসভার একজন সদস‌্য বলেন, নাজিমউদ্দিন রোডে পুরনো কারাগারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতার স্মৃতি জড়িয়ে থাকায় সেখানে পার্ক ও জাদুঘর করার আগের সিদ্ধান্তই ঠিক থাকবে বলে প্রধানমন্ত্রী জানান। আর জগন্নাথের শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে- তা শিক্ষামন্ত্রীর কাছে জানতে চান তিনি।

“জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, কেরানীগঞ্জে ছেলেদের জন্য একটি হল নির্মাণ করা হবে। আর মেয়েদের জন্য একটি হল নির্মাণ করা হচ্ছে। এর বাইরে পূর্বাচল ও ঝিলমিলি প্রকল্পে তারা জায়গা খুঁজছেন।”

“এ সময় প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন- অ্যাকাডেমিক ভবন এক স্থানে, মেয়েদের হল আরেক জায়গায়, ছেলেদের হল অন্য জায়গায় কেন?”

পরে প্রধানমন্ত্রী এক জায়গায় জমি কিনে সেখানেই অ্যাকাডেমিক ভবন, আবাসিক হল, উপাচার্যর বাসভবনসহ সব স্থাপনা নির্মাণের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা করতে শিক্ষামন্ত্রীকে নির্দেশনা দেন বলে জানান ওই মন্ত্রী।

মন্ত্রিসভার বৈঠকের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সীমাবদ্ধ সম্পদ ও জমি নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ‌্যালয়ের ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর বর্তমান সঙ্কট যে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়, তা তিনি বৈঠকে তুলে ধরেন।

“প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা কেবিনেটে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা খুবই আশাবাদি যে যথাসম্ভব স্বল্প সময়ের মধ্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা সমাধান করে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচালনার জন্য যা যা প্রয়োজন সেই ব্যবস্থা করতে পারব।

“সেটা করার জন্য আমরা চাচ্ছি অখণ্ড জমি। আলাদা আলাদা জায়গায় স্থাপনা করলে বিশ্ববিদ্যালয়ে লিংক থাকে না, যোগাযোগ থাকে না। আমরা একই জায়গায় যেন বড় জমি পেতে পারি প্রধানমন্ত্রী সেটাই বলেছেন, আমরাও সেটাই চেয়েছি।”

জমি অধিগ্রহণ: কেরানীগঞ্জে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ শিগগিরিই শুরু করা হবে বলে জানান মন্ত্রী।

“আমরা একমত হয়েছি যে, কেরানীগঞ্জের ২৫ বিঘা জমির আশপাশে আরও জমি আছে যা সরকার কিনতে পারবে। এই সম্ভাব্যতা প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভায় বসেই ওখানে যাদের জানাশোনা আছে, সংসদ সদস্য আছেন, প্রতিমন্ত্রী আছেন, সকলের সঙ্গে কথাবার্তা বলেই তথ্যগুলো নিশ্চিত হতে পেরেছেন।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ চালাতে যে পরিমাণ জমি প্রয়োজন, তা কিনে নেওয়া হবে অথবা সরকার অধিগ্রহণ করবে বলে জানান নাহিদ।

“সেখানে যাদের সহযোগিতা নিলে কাজটা সহজ হতে পারে সে রকম দু্’একজনের সাথে কথা বলা শুরু করে দিয়েছি, কারণ আমাদের দেরি করার সময় নেই। তার মানে এই নয় যে, কালই হয়ে যাবে, দ্রুত করতে হবে।”

নতুন করে কী পরিমাণ জমি কেনা হবে সে বিষয়ে কোনো ধারণা না দিয়ে নাহিদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ পূর্ণাঙ্গভাবে চালাতে যে পরিমাণ জমি লাগবে তা নেওয়া হবে- একটু ‘নিশ্চিত’।

“সেখানে অ্যাকাডেমিক ভবন, ল্যাবরেটরি, অডিটোরিয়াম দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর মত অবকাঠামো থাকবে, সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারী, উপাচার্যের থাকা দরকার, শিক্ষকদের থাকা দরকার। সেই পরিমাণ জায়গা লাগবে।”

শিক্ষামন্ত্রীর বলেন, “সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়া মানে অর্ধেক কাজ হয়ে যাওয়া। সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় সমস্যা চলছিল। সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ায় আমরা আনন্দিত।”

হবে ‘মহাপরিকল্পনা’: কেরানীগঞ্জে জমি অধিগ্রহণ করে সেখানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে মহাপরিকল্পনা নেবে সরকার।

এ বিশ্ববিদ‌্যালয়ে ৩০ হাজার শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “জমি নেব, মাস্টার প্ল্যান সামনে রেখেই আমরা (স্থাপনা) করব। জমিটা আমরা সেভাবেই তৈরি করব।”

আবাসনের দাবিতে জগন্নাথের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে ‘অস্থিরতা কেটে যাবে’ বলেই তিনি আশা করছেন।

“আমি আশা করি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং জগন্নাথ পরিবারের সবাই খুশি হবেন। আমি তাদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি যে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে। তাদের উদ্বেগে থাকার কারণ নেই।”

পুরনো ক্যাম্পাসও থাকবে: কেরানীগঞ্জে নতুন ক‌্যাম্পাস হলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ‌্যালয়ের পুরনো ক্যাম্পাসে কার্যক্রম চলবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।

“বিশ্ববিদ্যালয় আছেই, জমি আছে, বিল্ডিং আছে সেটাও কাজে লাগবে। কোন কাজে লাগবে সেটা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঠিক করবেন। এখানে (বর্তমান ক্যাম্পস) কী কাজ করবেন আর ওখানে (কেরানীগঞ্জ) কি কাজ করবেন… এটা বিশ্ববিদ্যালয় আছে বিশ্ববিদ্যালয়ই থাকবে।”

শিক্ষা সচিব সোহরাব হোসাইন ছাড়াও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

 

আরও পড়ুন