প্রায় ১৩৬ বছর আগের কারা বিধি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটিও করা হয়েছে। তদন্ত শেষে ওই কমিটির রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে প্রধান বিচারপতির সুপারিশক্রমে পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশে প্রথম কারাগার স্থাপিত হয়েছিল ১৭৮৮ সালে ঢাকায়। প্রথম দিকে এটাকে বলা হত ক্রিমিনাল ওয়ার্ড। কিন্তু কারাগারের ব্যবস্থাপনার বিধান সম্বলিত একটি কোড তৈরি করা হয়েছিল ১৮৬৪ সালে। এরপর ওই কোড সাতবার সংশোধন করা হয়েছে।
সর্বশেষ সংশোধন হয় ১৯৩৭ সালে। ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। এরপর ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধ শতাব্দী কেটে গেছে। কিন্তু নির্বাহী আদেশে কারাবিধির কতিপয় পরিবর্তন ও সংশোধন হলেও, জেল কোডে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনও পরিবর্তন হয়নি।
জানা গেছে ২০০৬ সালে চার দলীয় জোট সরকারের সময় জেল কোড সংশোধনের উদ্দ্যেগ গ্রহণ করা হয়েছিল। মন্ত্রীপরিষদে দফায় দফায় বৈঠক করার পর সর্বশেষ আপডেট কতটুকু তা জানা যায়নি। কিন্তু বর্তমান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা দ্বায়িত্ব গ্রহণের পর এবিষয়ে উদ্যোগ নেন এবং তদন্ত কমিটি করে তাদের কারাগারে জরিমানার বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখার জন্য বলা হয়।
কি কারণে কারা বন্দিদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়, এ বিষয়ে হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার সাব্বির ফয়েজ বলেন, কারা বন্দিদের জরিমানার কারণ আমারাও জানি না।
তবে কারাগার সূত্র বলছে রায় ঘোষণার সময় সাজার বদলে কাউকে কাউকে কিছু অর্থ জারিমানা করে রায় ঘোষণা করা হয়। সেটিই হতে পারে কারাবন্দিদের জরিমানা।
বিশ্বব্যাপী অপরাধ আইনে যখন বৈপ্লবিক সব সংস্কার আনা হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের অপরাধ আইনে পরিবর্তন আসছে একেবারে ঢিমেতালে। কারাব্যবস্থার উন্নতকরণ, বন্দিদের শাস্তির চেয়ে সংশোধনের প্রতি বেশি গুরুত্বারোপ এসবের প্রতিই আধুনিক রাষ্ট্রের কারাগারগুলোয় বেশি জোর দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে কারাগারের পরিবেশ উন্নতকরণের যে প্রচেষ্টা রয়েছে, তা একদিকে যেমন অপর্যাপ্ত অন্যদিকে এর প্রয়োগের অভাব কারাবন্দিদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে প্রতিনিয়ত।
সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা কারাগার পরিদর্শন করার পর এসব টুকিটাকি বিষয় চোখে পড়ে। তারপর তিনি কারা বিধির দিকে নজর দেন। সে হিসেবে প্রধান বিচারপতি সুপারিশ ক্রমে সংশোধন হচ্ছে কারাবন্দিদের জরিমানা আদায় সংক্রান্ত একশত ৩৬ বছর আগের ১৮৮০ সালের বিধান।
প্রধান বিচারপতির নির্দেশে জেল কোডের শত বছরেরও বেশি সময়ের পুরনো এই নিয়ম সংশোধন করতে কাজ করছে সর্বোচ্চ আদালত। এজন্য সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতির নির্দেশে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ পাঠাবে প্রধান বিচারপতির কাছে। এরপরই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবেন প্রধান বিচারপতি।
হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার সাব্বির ফয়েজ বলেন, একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। জনগণের স্বার্থে জরিমানা আদায়ের বিষয়টি সহজ করার জন্য কমিটি কাজ করছে। তাদের সুপারিশের আলোকে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাঁচ সদস্যের এই কমিটিতে প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার আবু সৈয়দ দিলজার হোসেন। সদস্য হিসাবে রয়েছেন অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার (অর্থ ও উন্নয়ন) মো. যাবিদ হোসেন, স্পেশাল অফিসার বেগম হোসনে আরা আক্তার, অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার (সার্বিক) এস. এম. এরশাদুল আলম, ডেপুটি রেজিস্ট্রার (প্রশাসন) মো. আজিজুল হক এবং সহকারী রেজিস্ট্রার (অর্থ) মো. ইসমাইল হোসন।
জরিমানা আদায় সংক্রান্ত হাইকোর্ট বিভাগের ৯ ফেব্রুয়ারি ১৮৮০ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী কারাবিধির ৫৩৩ ধারায় বলা আছে, ‘কারা তত্ত্বাবধায়ক অথবা কারা পরিদর্শক জরিমানার অর্থ গ্রহণ করতে পারবেন না। এক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষ জরিমানা প্রদানের জন্য কারাবন্দির প্রতিনিধি বা আত্মীয়স্বজনকে জরিমানার নির্দেশ প্রদানকারী আদালতে পাঠাবেন।’
রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, কারাবন্দিরা সাধারণত আগে কারাদণ্ড ভোগ করেন এবং কারাদণ্ড উত্তীর্ণ হওয়ার কাছাকাছি সময়ে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করেন। কিন্তু সাজাপ্রাপ্ত অধিকাংশ বন্দির প্রতিনিধি বা আত্মীয়স্বজনদের আদালতে গিয়ে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করা কঠিন হয়। অনেক সময় আইনজীবীর শরণাপন্ন হতে হয়। আবার কখনো মামলার নথি খুঁজে পাওয়া যায় না। এতে অনেক সময়ই জরিমানা আদায় সম্ভব হয় না।
জানাগেছে, কয়েক মাস আগে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা গাজীপুরের কাশেমপুর কারাগার পরিদর্শনে গেলে তখনই তাকে বিষয়টি জানিয়েছিল কারাকর্তৃপক্ষ। তারই ধারাবাহিকতায়ই সুপ্রিমকোর্টে এই চিঠি পাঠানো হয়।


