বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

দরজা ভেঙ্গে রাবি শিক্ষিকার লাশ উদ্ধার: পাওয়া গেল সুইসাইড নোট

দরজা ভেঙ্গে রাবি শিক্ষিকার লাশ উদ্ধার (2)রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আকতার জাহান জলির (৪৪) মরদেহ বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরি ভবনের ৩০৩ নম্বর কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কক্ষের দরজা ভেঙ্গে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

আকতার জাহান জলি ঢাকার মহাখালী ডিওএইচএস এলাকার মৃত ফোরকান আলী মিয়ার কন্যা।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাতিল সিরাজ শুভ জানান, বৃহস্পতিবার থেকে আকতার জাহানের ছেলে সোয়াদ তাকে ফোনে পাচ্ছিলেন না। পরে বিষয়টি সোয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপুকে জানান। পরে তিনি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের কয়েকজন শিক্ষককে জানান। এরপর তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মুজিবুল হক আজাদ খান এবং পুলিশ নিয়ে জলির কক্ষের সামনে গিয়ে ডাকাডাকি করেন। পরে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তারা দরজা ভেঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করেন।

তিনি আরও জানান, কক্ষে ঢুকে দেখা যায় জলি মশারি টানানো অবস্থায় অচেতন হয়ে আছেন। পরে দ্রুত তাকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মাহিনুল ইসলাম বলেন, ‘আকতার জাহানকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি বেশ আগেই উনি মারা গেছেন। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ এবং ময়না তদন্ত ছাড়া কিছু বলা সম্ভব নয়।’

বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক মশিহুর রহমান বলেন, ‘কক্ষ ভেঙ্গে প্রবেশ করে তার মুখের চারপাশে একধরনের পদার্থ দেখতে পাই। সম্ভবত ফেনা জাতীয় পদার্থ। তবে সেটা আসলে কি তা ময়না তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়।’

বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আকতার জাহান ব্যক্তিগত কিছু সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। বেশ কিছু ডিপ্রেশন ছিল। আর সম্প্রতি তার ছেলেকেও তিনি রাজশাহী থেকে ঢাকাতে ভর্তি করিয়েছিলেন। সেটার কারণেও মনে এক ধরনের কষ্ট কাজ করত। তবে তিনি এসব কষ্ট খুব কমই শেয়ার করতেন।’

বিভাগের আরেক সহযোগী অধ্যাপক দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘তার ফোন বর্তমানে বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাতিল সিরাজ শুভর কাছে রয়েছে। তার ফোনটি দেখা উচিত। শেষ কল কে করেছে? কোনো গালাগালি দেয়া এসএমএস আছে কি না তা তদন্ত করে দেখা উচিত। তার মৃত্যুটি রহস্যজনক।’

বিভাগের সূত্র জানায়, আকতার জাহান জলি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন ওই বিভাগেরই শিক্ষক তানভীর আহমেদকে। কিন্তু  তাদের মধ্যে বনিবনা না হওয়ার কয়েক বছর আগে ডিভোর্স হয়। বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত ছিল। প্রায় এক বছর আগে তানভীর আহমেদ বিভাগের আরেক শিক্ষিকাকে বিয়ে করেন। তখন থেকে তারা আলাদা থাকতেন।

২০১২ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকে শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দকৃত ওই আবাসিক ভবনে (জুবেরি) একাই থাকতেন আকতার জাহান। তাদের সংসারে একটি ছেলে (সোয়াদ) রয়েছে। সে ঢাকায় নানির বাড়ি থেকে পড়াশোনা করে।

এব্যাপারে তানভীর আহমেদকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মতিহার থানার ওসি হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আকতার জাহান জীবিত আছে ভেবে আমরা হাসপাতালে পাঠাই। পরে জানতে পারি তিনি মারা গেছেন। জীবিত আছে ভেবে তার ফোন জব্দ করিনি। এখন করা হবে। লাশ মর্গে আছে। ময়না তদন্তের আগে মৃত্যুর কারণ বলা যাচ্ছে না। তার পরিবারের সদস্যরা এলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

বিভাগের শিক্ষক মামুল আব্দুল কাইয়ুম জানান, আকতার জাহানের ঢাকা যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার ফোন বন্ধ ছিল। যোগাযোগ করতে না পেরে তার ছেলে সোয়াদ বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে বিভাগের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা তার কক্ষে যান। সেখানে গিয়ে তারা দেখেন দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। পরে দরজা ভেঙে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

এদিকে ওই কক্ষে আকতার জাহানের একটি সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে বলে সূত্র জানায়।

তার ওই সুইসাইড নোটে বলা হয়েছে:
‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। শারীরিক, মানসিক চাপের কারণে আত্মহত্যা করলাম। সোয়াদকে যেনো ওর বাবা কোনওভাবেই নিজের হেফাজতে নিতে না পারে। যে বাবা নিজের সন্তানের গলায় ছুরি ধরতে পারে, সে কোনও সময় সন্তানকে মেরেও ফেলতে পারে বা মরতে বাধ্য করতে পারে। আমার মৃতদেহ ঢাকায় না নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেওয়ার অনুরোধ করছি।’

(ছবিতে আকতার জাহানের ছেলে সোয়াদ)

 

আরও পড়ুন