বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

ভয়ে বিশেষ নাম্বার প্লেট বাদ দিতে চান ঢাকার বিদেশি কূটনীতিকরা

বিশেষ নাম্বার প্লেট বাদ দিতে চান ঢাকার বিদেশি কূটনীতিকরানিরাপত্তার স্বার্থে যানবাহনের বিশেষ চিহ্ন মুছতে চান বিদেশি কূটনীতিকরা। তারা তাদের গাড়িতে হলুদ রংয়ের পরিবর্তে সাধারণ যানবাহনের আদলে সাদাকালো নাম্বার প্লেট ব্যবহারে আগ্রহী।

সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রমতে, কূটনৈতিক জোনের হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় জঙ্গি হামলার পর আতঙ্কিত পশ্চিমা কূটনীতিকরা সরকারের কাছে এ দাবি জানান। পরে অন্য অনেকে দাবিটির পক্ষে মত দেন। তাদের যুক্তি ছিল- বিশেষ নিশানা মুছে দিলে সহজে কেউ টার্গেট করতে পরবে না। বিদেশি নাগরিক ও কূটনীতিকদের নিরাপত্তায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় টাস্কফোর্সের একাধিক সভায় দাবিটির যৌক্তিকতা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা হয়। শুরুতে নীতিনির্ধারকরা ভিন্নমত পোষণ করলেও সর্বশেষ সভায় তারা এটি মুছে ফেলার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান।

সেই সভার সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা মতে, এখন থেকে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংগঠন ও সংস্থাগুলোর গাড়িতে হলুদ রংয়ের বিশেষ চিহ্নযুক্ত নাম্বার প্লেটের বদলে সাদাকালো নাম্বার প্লেট সরবরাহ করবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

কূটনৈতিক সূত্র মতে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির ঢাকা সফরের ঠিক আগের দিন রমনার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় টাস্কফোর্সের সর্বশেষ বৈঠকটি হয়। সেখানে বিদেশি নাগরিক ও কূটনীতিকদের নিরাপত্তায় বিভিন্ন দূতাবাসের চাহিদা এবং সরকারের পরিকল্পনার বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। সেই সভায় উল্লিখিত বিষয় ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

সভায় বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, কূটনীতিক ও তাদের বাসভবনের নিরাপত্তায় নিযুক্ত বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি সংক্রান্ত আবেদন নাকচ করে দেয়া হয়। তার বদলে নিরাপত্তায় বিদেশি মিশনগুলোকে সশস্ত্র আনসার দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

ওই সভার সুপারিশ মতে, বিদেশি কূটনীতিক, দূতাবাসের স্টাফ ও তাদের পরিবার তথা বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য সরকারের  একটি বিশেষ ‘আনসার পুল’ থাকবে। সশস্ত্র আনসাররা ওই পুলে থাকবেন। বিভিন্ন দেশে রীতিনীতি ও ভাষার বিষয়ে তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত রাখা হবে। নিরাপত্তার প্রয়োজনে যে কোনো দেশের মিশন বা আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘সশস্ত্র আনসার’ চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করবে। তাদের চাহিদামতো সরকার আনসার সদস্যদের নিয়োগ দেবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট মিশন বা সংস্থাকে প্রত্যেক সদস্যের জন্য মাসে আড়াই শ’ ডলার (প্রায় ২০ হাজার টাকা) পরিশোধ করতে হবে।

সরকারের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গত বৃহস্পতিবার বলেন, টাস্কফোর্সের সর্বশেষ সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে অন্তত দুটির বিষয়ে চিঠি দিয়ে তাৎক্ষণিক বিভিন্ন মিশন বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে অবহিত করা হয়েছে।

প্রথমত নিরাপত্তায় ‘আনসার পুল’ থেকে সশস্ত্র আনসার ভাড়া নেয়ার সুযোগ। দ্বিতীয়ত বিদেশি কূটনীতিক ও ত্রাণকর্মীদের জন্য আর্মার্ড ভেহিক্যাল আমদানি এবং ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার বিষয়টি।

ওই কর্মকর্তা বলেন, বুলেটপ্রুফ গাড়ি ব্যবহারের অনুমতি আগেই ছিল। নতুন নির্দেশনায় আর্মার্ড ভেহিক্যাল আমদানি ও ব্যবহারের বিষয়ে কিছু শর্ত (টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন) যুক্ত করা হয়েছে। নির্দেশনায় অত্যন্ত স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে গাড়িগুলো কোনোভাবেই যুদ্ধে ব্যবহৃত সাঁজোয়াযানের মতো হতে পারবে না।

সরকারের অনুমতি পাওয়ার পর আনেক মিশন আর্মার্ড ভেহিক্যাল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করলেও গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কেউ আনসার চেয়ে আবেদন করেননি জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, বিদেশিদের নিরাপত্তায় সামপ্রতিক সময়ে সরকার যেসব পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা নিয়েছে সে বিষয়ে কূটনীতিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হবে। এ লক্ষ্যে রোববার একটি কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ের আয়োজন করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠেয় ওই ব্রিফিংয়ে বর্তমানে ঢাকায় থাকা বিভিন্ন দেশের মিশন এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংগঠনের প্রধানদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

ওই ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বিদেশি মিশন, কূটনীতিক ও নাগরিকদের নিরাপত্তায় সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে অবহিত করবেন। পাশাপাশি কূটনীতিকদের মতামত, প্রতিক্রিয়া ও নতুন কোনো প্রস্তাব থাকলে তা-ও শোনবেন।

বিশেষ ছুটির দিনে আয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ ওই ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হকসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অংশ নেবেন।

উল্লেখ্য, গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় জঙ্গি হামলায় দেশি-বিদেশি ২২ নাগরিক নিহত হওয়ার পর কূটনৈতিক অঙ্গনের উদ্বেগ নিরসনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে তাদের ব্রিফ করেছেন। সেই সব ব্রিফিংয়ের আগে পরে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে বিভিন্ন দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের চাহিদা দিয়েছে। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা নিজ নিজ কূটনীতিক ও নাগরিকদের নিরাপত্তাও পর্যালোচনা করেছে। সরকারের তরফে দফায় দফায় বিদেশিদের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ঢেলে সাজানো হয়েছে কূটনৈতিক জোন গুলশানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

আরও পড়ুন