সৌদি আরবে বাংলাদেশি হাজিদের ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের জের ধরে মক্কায় বাংলাদেশি সাংবাদিক উবায়দুল্লাহ বাদলকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন ‘সরকারি হজ গাইড’ হয়ে যাওয়া এক ছাত্রলীগ নেতা।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর যুগান্তরের প্রথম পাতায় হাজীদের ভোগান্তি নিয়ে নিউজ করায় সৌদিআরবে অবস্থানরত যুগান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার উবায়দুল্লাহ বাদলকে হত্যার হুমকি দিয়েছে হজগাইড ও গাইবান্ধা জেলা ছাত্রলীগ নেতা শাহরিয়ার আহমেদ শাকিল।
শুক্রবার সৌদিআরব স্থানীয় সময় রাত ১০ টা ৫০ মিনিটে মক্কায় অবস্থানরত হোটেল লবিতে এ হুমকি দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ইউএনবির সিনিয়র রিপোর্টার মাসউদুল হকসহ হোটেল কমর্কতারা।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, বাদল ও মাসুদ লবিতে বসে গল্প করার সময় বাইরে থেকে এসে হজগাইড শাকিল বাদলকে উদ্দেশ্য করে বলে- “নিউজের পারিশ্রমিক দেয়া হবে। কত বড় সাংবাদিক হয়েছিস দেখবো। দেশে গিয়ে এর জন্য চরম মুল্য দিতে হবে। তুই ক্যামনে সাংবাদিকতা করিস তা দেখবো। ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে নিউজ করিস। দেখি তোকে কে বাচায়। ”
বিষয়টি তাৎক্ষনিকভাবে হোটেলে অবস্থানরত ধর্মমন্ত্রীর সহকারি একান্ত সচিব শফিকুল ইসলামকে জানানো হয়েছে। তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে জানিয়েছেন।
জানা গেছে, শাকিল সাধারন শিক্ষায় শিক্ষিত। ধর্মীয় বিশেষ কোনও জ্ঞান নেই। সরকারি খরচে হজ পালনের জন্য আবেদন করলে ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে তাকে সরাসরি হজগাইড হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
সংশ্লিস্ট হাজীদের অভিযোগ, হজগাইডের সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিলেও হাজীদের কোন দায়িত্ব পালন করেনি এই ছাত্রলীগ নেতা। বরং হাজীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন। এমনকি হাজীরা তাদের থাকা-খাওয়া বা অব্যবস্থাপনা নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে চা্ইলে তাতে বাধ সাধেন হজগাইড শাকিল। হজের আগে ৬ নং ভবনের হজ সংক্রান্ত সমন্বয় সভায় ভবনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে সচিবালয় কর্মকর্তা কর্মচারি নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, রুহুল আমিন, হাসান ইমাম,নিজামুল ইসলাম মিলন ও গোলাপ মিয়াসহ হাজীরা কথা বলতে চাইলে ছাত্রলীগের এ্ই নেতা বাধা দেন।
প্রসঙ্গত, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে বাংলাদেশ থেকে সরকারি খরচে যাওয়া হাজীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে ভুক্তভোগীরা এই প্রতিবেদকের কাছে নানা অভিযোগের কথা জানান। বিশেষ করে হজ গাইডদের অবহেলার বিষয়টি উঠে এসেছে তাদের অভিযোগে।
হজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মে হাজিদের ভোগান্তি:
বাংলাদেশের সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের মহাসচিব রুহুল আমিন এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সহকারী সচিব মুজাহিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, আরাফাতের ময়দান থেকে মুজদালিফায় যাওয়ার পথে হজযাত্রীরা যানবাহন পাননি। দীর্ঘ সাত কিলোমিটার পথ হেঁটে পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশী হাজীদের জন্য নির্ধারিত গাড়িতে তাদের না নিয়ে অর্থের বিনিময়ে পাকিস্তানি হাজীদের পরিবহন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন এই দুই কর্মকর্তা। তারা জানান, অযোগ্য-অদক্ষ হজ গাইডরা (মুয়াল্লেম) তাদের খাবার পর্যন্ত দেননি। মুয়াল্লেমদের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে অসুস্থ হয়ে অনেক হাজীকে বাড়তি অর্থও গুনতে হয়েছে।
জানা গেছে, এবার গাইড হিসেবে যাদের নেয়া হয়েছে তারা সবাই অনভিজ্ঞ। এর মধ্যে রয়েছেন গাইবান্ধা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাকিল, ডা. কমোলের মালিকানাধীন হজরে আসওয়াদ ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে হজে যাওয়া ৮নং বাড়ির ২১৩নং কক্ষের হায়দার আলী (পাবনা), তোরাব আলী (পাবনা), ২১২নং কক্ষের খলিলুর রহমান (পাবনা), মতিয়ার সরদার (সাতক্ষীরা), আকিব হজ এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়া ২নং বাড়ির ১০২নং কক্ষের মোয়াজ্জেম হোসেন (কুষ্টিয়া), ১০১০নং কক্ষের আবদুস সালাম (নারায়ণগঞ্জ)। এর মধ্যে ছাত্রলীগের শাকিল ছাড়া বাকি সবাই নিজ খরচে হজে গেলেও সেখানে পৌঁছে দেখেন তারা গাইড হিসেবে হজে গিয়েছেন।
এছাড়া ৬নং বাড়ির ৬১০নং কক্ষের কাউসার হোসেন (সিরাজগঞ্জ) ও কমল উদ্দিনকে (ভাঙ্গুরা) যথাক্রমে ২ লাখ ৭৩ হাজার এবং ২ লাখ ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে হজে পাঠান গোপালগঞ্জের তৈয়ুবর রহমান। কিন্তু পরবর্তীতে এ দু’জন জানতে পারেন তাদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে নেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে কমল উদ্দিনের জিও নং ১৪২। এদিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব বজলুল হক বিশ্বাসের সাবরিনা ট্রাভেল এজেন্সির গাইড হিসেবে যাওয়া মো. দেলোয়ার হোসেন, মনিরুজ্জামান, ফরিদুল আলম ও জাহাঙ্গীর আলম ৬নং ভবনের সরকারি গাইড হিসেবেও দায়িত্ব পান। তারা সাবরিনা এজেন্সির হাজীদের সেবা দিলেও সরকারি হাজীদের কোনো প্রকার সেবা দেননি। এমনকি সরকারি হাজীদের কাছ থেকে বাসে ঘোরানো, পাথর নিক্ষেপ এবং কোরবানি দেয়ার নামে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন। হাজীরা আরও অভিযোগ করেন, গাইড হিসেবে ছাত্রলীগ নেতা শাকিল কোনো সহযোগিতা না করে দুর্ব্যবহার করেছেন।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মিনার ২নং জোনের ৩৯নং তাঁবুতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সালিশ বৈঠক হয়। বৈঠকে তারা অভিযোগ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এ সময় তাদের তাঁবু থেকে বের করে দেয়া হয়। তবে এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগ নেতা শাকিল বলেন, তিনি হজে যাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। সেখানে গিয়ে দেখেন তিনি গাইড।
সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের মহাসচিব রুহুল আমিন অভিযোগ করেন, ‘আমরা হাজীরা কোনো গাইডের দেখা পাইনি। তারা আমাদের পরিবর্তে পাকিস্তানি হাজীদের গাড়িতে চড়িয়ে আরাফাতের ময়দান থেকে মুজদালিফায় নিয়ে গেছেন। কিন্তু আমাদের হেঁটে যেতে হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আগে থেকে না জানিয়ে হেঁটে যেতে বাধ্য করায় বয়স্ক হাজীরা চরম বিপদে পড়েন। কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তারা পাঁচশ’ থেকে এক হাজার রিয়াল দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছেছেন।’ রুহুল আমিন আরও অভিযোগ করেন, ‘সরকারি ব্যবস্থাপনায় ২৮৩ জনকে হজ করতে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে মহির উদ্দিন ময়েজুদ্দিন নামে একজনকে গাইড হিসেবে দেয়া হয়েছিল। তিনি আমাদের জানিয়েছেন, তিনি ২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা দিয়ে হজ করতে এসেছেন। তিনি গাইডের কিছুই জানেন না।’
এ ব্যাপারে হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানানো হয়, মহিরের পরিবর্তে মনিরুজ্জামানকে সাময়িকভাবে গাইড হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু তাকে (মহির) চোখে দেখেননি বলে জানান সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের মহাসচিব। তিনি অভিযোগ করেন, ‘সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে হাজীদের জন্য সবকিছুর সুন্দর আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু হজ ব্যবস্থাপনায় আওয়ামী লীগবিরোধী লোকজন থাকায় হাজীদের ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে।’ তিনি জানান, স্থানীয় সময় বুধবার ধর্ম সচিব মো. আবদুল জলিলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অব্যবস্থাপনার বিষয়টি জানিয়েছেন। সচিব অভিযোগের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
এদিকে স্থানীয় সরকার বিভাগের সহকারী সচিব মুজাহিদুল ইসলামও চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা চরম অব্যবস্থাপনার শিকার হয়েছি। মনে হয়েছে বাংলাদেশী হাজীদের মতো অসহায় কেউ নেই। আমাদের গাইড নেই, গাড়ি নেই, খাবার পর্যন্ত নেই।’ তিনি বলেন, ‘মিনায় গিয়ে দেখি আমাদের জন্য নির্ধারিত সিটে অন্যরা বসে আছে। আরাফাতের ময়দানে যাওয়ার পরও দেখি গাইড নেই, বের হওয়ার পরও দেখি গাইড নেই।’ মুজাহিদুল আরও বলেন, ‘হাজীদের কাছ থেকে দুই হাজার রিয়াল নেয়া হয়েছে গাইড খরচ বাবদ। কিন্তু আমরা কোনো গাইডের চেহারা দেখিনি। বয়স্ক নারীরা আরাফাতের ময়দান থেকে মুজদালিফায় যাওয়ার জন্য গাড়ি না পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এতে তাদের হজ অসম্পূর্ণ রয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তখন তারা দুই হাজার রিয়াল খরচ করে মুজদালিফায় পৌঁছেছেন।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘ঢাকার শান্তিনগরের একটি মসজিদের মুয়াজ্জিন খন্দকার দেলোয়ার গাইডের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বাংলাদেশী হাজীদের সহযোগিতা না করে পাকিস্তানি হাজীদের মাথা মুণ্ডন করে ১০ রিয়াল করে আয় করতে ব্যস্ত ছিলেন।’



Leave a Reply