বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

সেঞ্চুরির অপেক্ষায় বাংলাদেশ

e4821f5457d70dc7b3f5bfdb66b18b68-Bangladeshম্যাচে কোনো ব্যাটসম্যানের সেঞ্চুরি হতে পারে, ক্যারিয়ারে ১০০ উইকেটের মাইলফলকও পেরোতে পারেন কোনো বোলার। তাই বলে পুরো দলের সেঞ্চুরি? সাদা চোখে সাধারণ একটা ম্যাচ হলেও আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে আজ তেমনই এক মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ।

যদিও ব্যাট উঁচিয়ে উদ্‌যাপন বা বল হাতে তুলে দর্শকদের অভিবাদনের জবাব দেওয়ার রীতি এখানে না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। তবে ম্যাচ শেষে মাশরাফিদের মুখে হাসি ফুটলেই রেকর্ড বইয়ে নতুন একটা অধ্যায়ে পা দেবে বাংলাদেশ—ওয়ানডেতে শততম জয়ীদের তালিকায়।

৩১ মার্চ, ১৯৮৬। পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট দিয়েই প্রথমবারের মতো সেদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্বাদ পেয়েছিল বাংলাদেশ। সেদিনের বুনে দেওয়া বীজটি আজ ছায়াবৃক্ষের আকার নিয়েছে।

পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই ম্যাচের পর তিন দিন আগের আফগানিস্তান ম্যাচ—অনেক চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ খেলে ফেলেছে ৩১৩টি ওয়ানডে। জয়ের আবির মাখা গল্প এসেছে যার ৯৯টিতে। আজ জিতলেই হয়ে যাবে বাংলাদেশের জয়ের সেঞ্চুরি।

সিরিজের প্রথম ম্যাচে শেষ দিকে সাকিব-তাসকিন-রুবেলদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে জিতেছে বাংলাদেশ। আজ জিতলে সিরিজ জেতা তো হবেই, সঙ্গে হবে মাইলফলকও। মাশরাফিরা মাঠে নামার আগে একবার বাংলাদেশের আগের জয়-পরাজয়ের রেকর্ডে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক?

প্রথম ওয়ানডে জয়:
ওয়ানডেতে প্রথম জয়ের জন্য বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২২ বছর। অবশ্য তখন খেলার সুযোগই বা মিলত কোথায়। ১৯৮৬ থেকে যাত্রা শুরু হলেও প্রথম ২১ বছরে বাংলাদেশ ওয়ানডে খেলেছে মাত্র ১৯টি! জয়ও পাওয়া হয়নি।

অপেক্ষা ঘোচে ১৯৯৮ সালে হায়দরাবাদে ত্রিদেশীয় সিরিজে, কেনিয়ার বিপক্ষে। ব্যাটে বলে জয়ের নায়ক মোহাম্মদ রফিক। বোলিংয়ে ১০ ওভারে ৫৬ রানে পেলেন ৩ উইকেট। তাতে প্রথমে ব্যাট করে কেনিয়া অলআউট ২৩৬ রানে। ব্যাটিংয়েও ওপেনিংয়ে নেমে রফিক তুললেন ঝড়, ৮৭ বলে ১১ ছক্কায় করলেন ৭৭ রান। ওপেনিংয়ে তাঁকে যোগ্য সঙ্গ দিয়ে গেছেন আতহার আলী খান। তিনি করেছেন ৪৭। এই দুজনের ওপেনিং জুটিতেই বাংলাদেশ রান করে ফেলে ১৩৭। শেষ দিকে আকরাম খানের ৩৯ রানে বাংলাদেশ লক্ষ্যটা পেরিয়ে গেল ৬ উইকেট ও ২ ওভার হাতে রেখে।

সবচেয়ে বেশি জয়:
জিম্বাবুইয়ানরা একটু মনঃক্ষুণ্ন হতেই পারে। এখন পর্যন্ত জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই সবচেয়ে বেশি খেলেছে বাংলাদেশ, জিতেছেও সবচেয়ে বেশি। ৬৭ ম্যাচে জয় ৩৯টি। অবশ্য তাদের বিপক্ষেও প্রথম জয় পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২০০৪ সালের পর্যন্ত। এরপর থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের বিপরীত দিকেই হেঁটেছে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট। এই একটি দলের বিপক্ষে জয়ের ঘর দুই অঙ্কে গেছে বাংলাদেশের। যৌথভাবে দ্বিতীয় কেনিয়া ও নিউজিল্যান্ড, দুই দলের বিপক্ষেই বাংলাদেশের জয় ৮টি করে।

সবচেয়ে কম জয়:
কানাডা, হংকং, হল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রিকেটাররা চাইলে অস্ট্রেলিয়ানদের খোঁচা মেরে বলতেই পারেন, ‘হুঁহ! আমরা-তোমরা সমানে সমান!’ কিভাবে? সবার বিপক্ষেই বাংলাদেশের জয় একটি। অবশ্য শুধু মজার জন্যই বলা, এখানে মস্ত বড় শুভংকরের ফাঁকি আছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ ম্যাচ খেলেছে ১৯টি। শুধু ২০০৫ সালে কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেনের ওই ম্যাচটাই হয়ে আছে একমাত্র সুখস্মৃতি। আর বাকি চার দলের মধ্যে কানাডা ও হল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশ ম্যাচ খেলেছে ২টি করে, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে ১টি।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পারফরম্যান্স তো জানা গেল। বাকি ‘বড়’ দলগুলোর বিপক্ষে কেমন করেছে বাংলাদেশ? বড়দের মধ্যে নিউজিল্যান্ডই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ‘প্রিয়’ প্রতিপক্ষ। ঘরের মাটিতে দুবার হোয়াইটওয়াশসহ (৪-০ ও ৩-০) কিউইদের বিপক্ষে এখন পর্যন্ত ৮টি জয় বাংলাদেশের।

এরপরই এশিয়ার তিন প্রতিবেশী। গত বছর ২-১ ব্যবধানে সিরিজে হারানো ভারতকে সব মিলিয়ে ৩২ ম্যাচে পাঁচবার হারিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৫ বিশ্বকাপের পরই সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করা পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় ৪টি (৩৫ ম্যাচে)। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও তা-ই, তবে ম্যাচ খেলতে হয়েছে ৩৮টি।

ইংল্যান্ডে বিপক্ষে ২০১১ ও ২০১৫—টানা দুটি বিশ্বকাপে জয়ের বাইরে ১৪ ম্যাচে বাংলাদেশ জিতেছে ১ বার (সব মিলিয়ে ১৬ ম্যাচে ৩ জয়)। গত বছর ঘরের মাটিতে আরেক শিকার দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও বাংলাদেশের জয় মোট ৩টি (১৭ ম্যাচে)।

বিদেশের মাটিতে প্রথম হোয়াইটওয়াশের গর্ব যাদের বিপক্ষে, সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ২৮ ম্যাচে বাংলাদেশ হারিয়েছে ৭ বার। এর মধ্যে ঘরের মাটিতে ২০১২ সালের ৩-২ ব্যবধানে সিরিজ জয়ও আছে।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর…:
১৯৯৯ বিশ্বকাপ বাংলাদেশের জন্য ছিল অনেক আনন্দের উপলক্ষ্য। প্রত্যাশিতভাবে স্কটল্যান্ডকে হারানোর পর গ্রুপের শেষ ম্যাচে পাকিস্তানকেও হারিয়ে দিয়েছিলেন খালেদ মাহমুদ-আকরাম-নান্নুরা। কিন্তু ওই বিশ্বকাপ যে আশার বেলুন ফুলিয়ে দিয়েছিল, সেটি চুপসেই রইল পরের পাঁচ বছর। এক-এক করে টানা ৪৭টি ম্যাচে নেমেছে বাংলাদেশ, কিন্তু জয় থেকে গেছে অধরা। শুধু দুটি ম্যাচে কোনো ফল আসেনি (দুটিই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে, ২০০২ সালে চট্টগ্রামে ও ২০০৩ সালে বেনোনিতে)। বাকি সব ম্যাচেই সইতে হয়েছে হারের যন্ত্রণা। ২০০৪ সালের ১০ মার্চ, হারারেতে জিম্বাবুয়েকে ৮ রানে হারিয়ে টানা জয়হীন থাকার রেকর্ডে যতি টেনেছিল বাংলাদেশ।

সবচেয়ে বড় জয়:
এর চেয়ে সুখকর কিছু হতে পারত না বাংলাদেশের মানুষের জন্য। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতেই তাদের হোয়াইটওয়াশ করার পরও অনেকের ঠোঁট বাঁকানো মন্তব্য ছিল, টানাপোড়েনে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাদের ‘বি’ দল নামিয়েছে। সেটিরই উচিত জবাব হয়ে এল ২০১২ সালে খুলনার ম্যাচটি। প্রথমে ব্যাট করে এনামুল হক বিজয়ের সেঞ্চুরি ও মুশফিকুর রহিমের ফিফটিতে ২৯২ রান তোলে বাংলাদেশ। জবাব দিতে নেমে সোহাগ গাজী ও আবদুর রাজ্জাকের স্পিনে কুপোকাত গেইল-ব্রাভো-পোলার্ড-নারাইনদের পূর্ণ শক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজ। অলআউট মাত্র ১৩২ রানে। ১৬০ রানের বিশাল এই জয় এখন পর্যন্ত রানের হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়।
উইকেটের হিসেবে সবচেয়ে বড় জয় ৯ উইকেটের। ৩ বার এমন জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। দুটি ২০০৬ সালে, খুলনায়। কেনিয়া ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। অন্যটি গত বছর, চট্টগ্রামে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে।

সবচেয়ে কম ব্যবধানে জয়:
রানের হিসেবে সবচেয়ে কম ব্যবধানের জয়টি অবশ্য এখনো রোমাঞ্চ ছড়াবে। ২০১১ সালে নিউজিল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ করা সেই সিরিজের শেষ ম্যাচ— বাংলাদেশের ১৭৪ রানের জবাবে ১৭১ রান করে ফেলেছিল নিউজিল্যান্ড। হাতে ছিল ৪ বল আর একটি উইকেট। কিন্তু শেষ ওভারের তৃতীয় বলে রুবেল হোসেন ছত্রখান করে দিয়েছিলেন কাইল মিলসের স্টাম্প। ৩ রানের সেই জয়ই এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে কম রানে জয়।
উইকেটের হিসেবে সবচেয়ে কম ব্যবধানের জয় ১ উইকেটে। দুবার শেষ উইকেটটি হাতে রেখে জিতেছে বাংলাদেশ। দুটিই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে, ২০০৭ সালে হারারের পর ২০০৯ সালে চট্টগ্রামে।

আরও পড়ুন