বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

মামলার সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা ট্রাফিক পুলিশে

মামলার সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগেট্রাফিক পুলিশের যে কর্মকর্তা যত বেশি মামলা দায়ের করবেন, তার ‘পারফরম্যান্সের’ খাতা তত ভারী হবে। ‘সুনাম’ বাড়বে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের। অদ্ভুত এ প্রবণতা তৈরি হয়েছে ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশে। এতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের চেয়ে মামলার সংখ্যা বাড়াতেই তৎপর ট্রাফিক পুলিশ সার্জেন্টরা। ক্ষেত্রবিশেষে মামলার জন্য মাঝরাস্তায় গাড়ি আটকানোর কারণে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট।

ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৫ সালে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অপরাধে রাজধানীতে যানবাহনের বিরুদ্ধে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৬৭টি মামলা করা হয়। এতে জরিমানার অঙ্ক ছিল ১৮ কোটি ২৮ লাখ ৯৫ হাজার ৯৫০ টাকা। কিন্তু এ বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ গত ৯ মাসেই মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৩১ হাজার ৪৫টি। এর সঙ্গে জরিমানার পরিমাণ ২৪ কোটি ৯৮ লাখ ৫৪ হাজার ৬১৩ টাকা। এ পরিসংখ্যানে স্পষ্ট, বছর শেষে মামলার সংখ্যা কমবেশি দুই লাখ হবে।

জানা গেছে, গত ৯ মাসের মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে ট্রাফিক পূর্ব বিভাগ। ওই বিভাগে মামলা হয় ২ লাখ ১২ হাজার ৩৫টি। এর পর ট্রাফিক উত্তরে ১ লাখ ৮১ হাজার ৪৯টি, দক্ষিণে ১ লাখ ৭২ হাজার ৫৩৭টি ও পশ্চিমে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫২৪টি।

নগরীর কয়েকজন ট্রাফিক সার্জেন্ট অভিযোগ করেন, নিজেদের পারফরম্যান্স (কর্মদক্ষতা) যাচাইয়ে রুটিনমাফিক যানজট নিয়ন্ত্রণের চেয়ে এখন মামলার সংখ্যা বাড়ানোই তাদের প্রধান টার্গেট। লক্ষ্যপূরণে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) থেকে শুরু করে একই বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চেইন অব কমান্ড অনুযায়ী চাপ প্রয়োগ করে থাকেন। আর মামলার যোগ্যতায় প্রতি মাসে মহানগর ট্রাফিক পুলিশের একজন উপ-কমিশনার (ডিসি) সেরা নির্বাচিত হন। একইভাবে ডিসি কার্যালয়ের অধীন একজন সহকারী কমিশনার (এসি) থেকে শুরু করে সার্জেন্ট পর্যন্ত সেরা নির্বাচিত হন। এতে মহানগর ট্রাফিক বিভাগে মামলা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলছে। সামান্য বা ক্ষমাযোগ্য অপরাধেও যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা দিতে বাধ্য হচ্ছে মাঠ ট্রাফিক পুলিশ।

এ মুহূর্তে রাজধানীতে প্রায় ৫০০ নারী-পুরুষ ট্রাফিক সার্জেন্ট ও ৬৪ জন টিআই আছে বলে জানা গেছে।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেন, নগরীতে বসবাসকারী বা চলাচলকারী যানবাহন মালিকদের মধ্যে ট্রাফিক সচেতনতা বেড়েছে। আগের বছরগুলোয় শহরে মামলা দায়েরের অন্যতম বাহন ছিল মোটরসাইকেল। অনিবন্ধিত বা কাগজপত্র ছাড়াই অনেকে মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় নামত। সাংবাদিক, পুলিশ, ছাত্রলীগ, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার কথা উল্লেখ করে অথবা সরকারি প্রতিষ্ঠানের লোগো ব্যবহার করে বছরের পর বছর মোটরসাইকেল চালাত অনেকে। কিন্তু গত মে মাসে মহাপুলিশ পরিদর্শক একেএম শহীদুল হকের নির্দেশে ডিএমপি কমিশনার এমনকি জেলা পুলিশ সুপাররাও অনিবন্ধিত/কাগজপত্রবিহীন মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে অভিযানে নামেন। এর ফলে অধিকাংশ মোটরসাইকেল মালিক দ্রুত নিবন্ধন করেন। সাংবাদিক বা প্রেস লেখা স্টিকার সেঁটে যে কেউ যেন অবাধে চলাচল করতে না পারে সেজন্য মহানগর পুলিশ সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের নামটিও স্টিকারে লেখার নির্দেশ দেয়। এতে অনেকেই ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য হন। এরপরও মামলার সংখ্যার বিপরীতে কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন হবে কেন?

মাঠ পুলিশ আরও জানায়, মামলার বিপরীতে জরিমানার টাকায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কিছু কমিশন পান কিনা সেটা তাদের জানা নেই। নয়তো তারা মামলায় বেশি আগ্রহী কেন? অবশ্য ট্রাফিক পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কমিশনের বিষয়টি অস্বীকার করেন।

ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোসলেহ উদ্দীন আহমদ বলেন, চলতি বছর মে মাস থেকে ট্রাফিক বিভাগের বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। ফলে মামলার সংখ্যা বেড়েছে। মানুষও আগের চেয়ে বেশি সচেতন হয়েছে। তিনি বলেন, মামলাগুলো বেশি হয় ফিটনেসবিহীন গাড়ি, কাগজপত্র সংক্রান্ত সমস্যার কারণে। তবে উল্টো পথে গাড়ি চালানো বা তিনজন আরোহী নিয়ে মোটরসাইকেল চালানো এখন নেই বললেই চলে।

মোসলেহ উদ্দীন বলেন, ট্রাফিকে পস মেশিন (পয়েন্ট ওভার সার্ভিস) থাকার কারণে অর্থ লেনদেন হয় ব্যাংকের মাধ্যমে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রাফিক সার্ভারে চলে যায়। এর কোনো সুবিধা ট্রাফিক পুলিশ পায় না। মামলার ভিত্তিতে পারফরম্যান্স নির্ধারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার জানা নেই। এমনটা হওয়ার কথা নয়।

জানা গেছে, মামলা করে রাজস্ব বাড়াতে হলুদ অ্যাপ্রোন ধারণ করে দ্বিগুণ জরিমানা করে পুলিশ। সাধারণ ট্রাফিক পুলিশ ও হলুদ ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে যোগ্যতা বা বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু একজন সার্জেন্ট শুধু একটি হলুদ অ্যাপ্রোন ধারণ করলেই মুহূর্তে হয়ে যান ‘হলুদ সার্জেন্ট’। আর পরিবহন মালিকদের গুনতে হয় দ্বিগুণ অর্থ।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন বাস মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ট্রাফিকের মামলা গত কয়েক বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। কাগজপত্র বা নিয়ম মানলেও অনেক সময় মামলায় পড়তে হয় বাসমালিকদের। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকারীদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা থাকার কারণে ট্রাফিক মামলা বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি।

এনায়েত উল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, এক ট্রাফিক স্টেশনের সঙ্গে আর এক স্টেশনের প্রতিযোগিতা চলে। যে কারণে অনেক সময় নিরীহ চালকরা মামলা ও হয়রানির মুখে পড়ে। একই সঙ্গে অফিসের সিনিয়রদের কর্মদক্ষতা দেখাতেও বেশি করে মামলা দেখান সার্জেন্টরা।

একাধিক পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সাধারণ মামলার পাশাপাশি রেকারের মামলায় ঊর্ধ্বতনদের চাপ আছে। প্রত্যেক সার্জেন্ট/টিএসআইর মাসে নির্দিষ্টসংখ্যক গাড়িকে রেকারের মামলা দিতে হয়। এ কারণে অনেক সময় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী গাড়ির মালিক বা চালক তাৎক্ষণিক রেকারের বিল পরিশোধ করলে সার্জেন্টরা তাদের ছেড়ে দেন। সূত্র জানায়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর চারটি ট্রাফিক বিভাগে ৫৫১টি গাড়ির বিপরীতে রেকারের বিল আদায় করা হয়।

পুলিশ সূত্র জানায়, রাজধানীর পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণ এ চারটি ট্রাফিক বিভাগে মোট ৩৩টি রেকার আছে। এর মধ্যে চুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানির রেকারের সংখ্যা ২৮টি। পুলিশের নিজস্ব রেকার মাত্র পাঁচটি। প্রাইভেট কোম্পানিকে রেকারের ভাড়া বাবদ নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদানের পর যা টাকা থাকে তা পুলিশের পকেটে যায়।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, যে কোনো চাকরিতে যোগ্যতা প্রমাণে কয়েকটি মাপকাঠি থাকতে পারে। কিন্তু একটি মাত্র মাপকাঠি দিয়ে যদি যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়, তাহলে কাজের অপপ্রয়োগ হবেই। একইভাবে সার্জেন্টদের যদি প্রধানত মামলার সংখ্যা বাড়িয়েই কর্মদক্ষতা প্রমাণ করতে হয়, সেখানে আইনের অপপ্রয়োগ অবশ্যম্ভাবী।

আরও পড়ুন