বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

আওয়ামী লীগের কমিটিতে আইভীর নাম: নতুন মেরুকরণ

আওয়ামী লীগের কমিটিতে আইভীর নাম১৪ বছর পর নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ কমিটি নিয়ে যতটা না আলোচনা তার চেয়ে বেশি আলোচনা সহ-সভাপতি পদে সেলিনা হায়াত আইভীর নাম নিয়ে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে এই আলোচনা আইভীর জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ৮ অক্টোবর ১৪ বছর পর জেলা আওয়ামী লীগের তিন জনের কমিটির নাম ঘোষণা করা হয়। কমিটিতে সভাপতি পদে আবদুল হাইকে চূড়ান্ত করা হয়েছে, যিনি বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও জেলা পরিষদের প্রশাসক। সেক্রেটারি পদে আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদলকে চূড়ান্ত করা হয়েছে, যিনি বর্তমানে জেলা যুবলীগের সেক্রেটারি হিসেবে আছেন। বাদল নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমানের অনুগামী নেতা হিসেবে পরিচিত।  সহসভাপতি হিসেবে আছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভীর নাম। তিনি বিলুপ্ত নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের কমিটিতেও সহসভাপতি ছিলেন।

নতুন কমিটি নিয়ে নারায়ণগঞ্জে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। কারণ, সচরাচর ঘোষিত কমিটিতে সহসভাপতি পদে কারও নাম বলা হয় না। সাধারণত সভাপতি ও সেক্রেটারি পদে নাম ঘোষণার পর তারা পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আইভীর বিষয়টি পজেটিভ হয়ে উঠেছে।

জানা গেছে,  নারায়ণগঞ্জে এমপি শামীম ওসমানের সঙ্গে আইভীর দীর্ঘদিনের বিরোধ আছে। এর মধ্যে সংসদে আইভীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন শামীম ওসমান। শামীম ওসমান অনুগামীরা আইভীর বিরুদ্ধে সমাবেশ, বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন, আইভীকে ব্যাঙ্গ করে শহরের বিভিন্ন স্থানে ফেস্টুন ব্যানার সাঁটায়। জেলা আওয়ামী লীগের নেতারাও তার নামে সমালোচনা করেন।

মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, ‘২০১১ সালের সিটি নির্বাচনের আগে আইভী জামায়াত ও বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করে জয়ী হয়েছেন। আইভী জামায়াতকে পছন্দ করতেন।’ এছাড়া, অন্য নেতারাও প্রায়ই আইভীকে জামায়াত ও বিএনপিঘেঁষা নেত্রী হিসেবে বলতেন। শামীম ওসমান বলয়ের লোকজন আইভীকে কোনঠাসা করে রাখারও চেষ্টা করে আসছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ অবস্থায় গত ২১ জুলাই মহানগর আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় শামীম ওসমান অভিযোগ করেন, আইভী প্রায়ই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনা করেছেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় দলের শীর্ষ নেতাদের প্রতিও ক্ষোভ প্রকাশ করেন শামীম ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইভীর ঘনিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আইভীর বিরুদ্ধে এতদিন যেসব অভিযোগ তোলা হতো কমিটি গঠনের মাধ্যমে হয়তো সেসব অভিযোগ এখন আর বিকৃতভাবে উপস্থাপন করতে পারবে না প্রতিপক্ষ। কারণ যেহেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই আওয়ামী লীগের কমিটিতে স্বাক্ষর করেছেন, সেখানে এ কমিটির কোনও পদায়িত নেতার বিরুদ্ধে কথা বলা মানে নেত্রীর বিরুদ্ধেই কথা বলা। তাছাড়া আগামী সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিপক্ষদের পরিকল্পনা ছিল, আইভী আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন না এমন কথা বলে তার মনোনয়ন না দেওয়ার পক্ষে লবিং করবেন। কিন্তু কমিটিতে সহসভাপতির পদায়নে আইভীর বিষয়টি পজেটিভ হয়ে গেছে। তাছাড়া সরকার আইভীকে উপমন্ত্রীর মর্যাদা ও উন্নয়নের জন্য ১৯১ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ায় বোঝা যাচ্ছে তিনি সরকারের সুদৃষ্টিতে আছেন।

এ ব্যাপারে সেলিনা হায়াত আইভী বলেন, ‘আমাকে কমিটিতে রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ। সামনে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজনীতি ও কাজ করতে হবে।’

অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে একটি মহল নানা ধরনের অভিযোগ তুলে। আমার উন্নয়ন কাজে বাধা দিতেই এসব অভিযোগ। তবে কোনও কিছুই আমার উন্নয়ন কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে পারবে না।  আমিও চাই অভিযোগ তদন্ত হোক।’

আইভীর ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবলীগ সভাপতি আবদুল কাদির বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী  বিচক্ষণ নেত্রী। তিনি জানেন কাকে কোথায় রাখতে হবে। জনপ্রতিনিধিদের বড় পদে রাখা হবে না জানানোর পরও আইভীকে সহসভাপতির পদ দেওয়াটা অনেক কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমরা আগামী নির্বাচনের স্বপ্ন এখন  দেখতেই পারি।’

এদিকে সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও আইভী ইস্যুতে কিছু বলতে নারাজ নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই। দল গোছানোকেই এখন বড় কাজ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আগামী ২২ ও ২৩ অক্টোবর জাতীয় সম্মেলনের আগেই আমরা জেলা কমিটির খসড়া ও সম্মেলনের কাউন্সিলরদের তালিকা কেন্দ্রে জমা দেবো। দলের দুঃসময়ের ত্যাগী, পরীক্ষিত ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদেরকে নিয়েই কমিটি গঠন করবো। কোনও ধরনের সন্ত্রাসী ভূমিদস্যু মাদক ব্যবসায়ী ও বিতর্কিতদের কমিটিতে স্থান দেওয়া হবে না। আমাদের নেত্রীও এমনটা চান না। আমরা আশা করি আগামীতে সব নির্বাচনের প্রার্থীরাও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে।’

আরও পড়ুন