বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

‘সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় সরকারের রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতা কাজ করছে’

‘সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় সরকারের রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতা কাজ করছে’ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনায় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের অন্তর্কোন্দলের সুযোগ নিয়েছে বলে মতো দিয়েছেন চট্টগ্রামের পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিক।

‘জেগে ওঠো বাংলাদেশ’ এর ব্যানারে চট্টগ্রামের পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে অধ্যাপক ড. অনুপম সেন, শহীদজায়া বেগম মুশতারী শফী, অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম, কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

শনিবার সকালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, ওই এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের কোন্দলের বিষয়টি উঠে এসেছে। হামলার পেছনে হেফাজত-আহলে সুন্নাত, বিএনপি-জামায়াত জোটের সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থ কাজ করেছে।

তারা হামলার নিন্দা জানিয়ে ‘বাংলাদেশ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠনসহ ১০ দফা সুপারিশ হাজির করেন তারা।

ড. মইনুল বলেন, এ হামলার পেছনে জঘন্য সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তি রয়েছে। এর সাথে যে বিএনপি-জামায়াত ও জঙ্গিগোষ্ঠী যুক্ত রয়েছে তা গোপন করা উচিত নয়।

“এ নিয়ে সরকারের বেশ কিছু রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতা কাজ করছে।”

দেশজুড়ে বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগোষ্ঠীর ওপর হামলার ঘটনায় ‘সাইলেন্ট মাইগ্রেশন’ হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, এতে করে বিএনপি-জামাত গোষ্ঠীর অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন হচ্ছে। কারণ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন চলে গেলে প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সমর্থন কমে যাবে।

সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক অনুপম সেন দেশে বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনার বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, এ ধরণের অপরাধও মানবতাবিরোধী। সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান তিনি।

লিখিত বক্তব্যে আবুল মোমেন বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। কিন্তু সরকার বা সমাজ মানবতার বিরুদ্ধে এসব অপরাধ কোনোভাবেই বন্ধ করতে পারছে না।

“নাসিরনগরের ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক কর্তাব্যক্তির দায়িত্বে অবহেলা এবং ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতার উসকানি ও সংযোগ গোপন থাকেনি।”

ফেইসবুকে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তুলে গত ৩০ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ১৫টি মন্দির ভাঙা হয়; ভাঙচুর-লুটপাট করা হয় হিন্দুদের শতাধিক ঘর-বাড়ি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ওসির উপস্থিতিতে সমাবেশে ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্যের পর ওই হামলার ঘটনা ঘটায় স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতির অভিযোগ ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। এর পাঁচদিনের মাথায় একই এলাকায় কয়েকটি বাড়ি ও মন্দিরে আগুন দেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই হামলার নেপথ‌্যে ছিল নাসিরনগরের এমপি ছায়েদুল হকের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাংসদ র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর দ্বন্দ্ব। মোকতাদিরের সমর্থকরা যে প্রতিপক্ষকে বেকায়দায় ফেলতে হিন্দুদের বাড়ি-মন্দিরে হামলায় ইন্ধন যুগিয়েছে তা দলীয় নেতা-কর্মীরাও বলেছেন।

নাসিরনগর ছাড়াও গত দুই সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েক ডজন মন্দিরে হামলা ও প্রতীমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সরকারের যুদ্ধাপরাধী ও জঙ্গিবাদীদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানকে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সমর্থন দিচ্ছে। আগামী নির্বাচনে সরকারের ভোট কমানোর কৌশল হিসেবে সংখ্যালঘুদের দেশছাড়া করার অপতৎপরতা হতে পারে।

পাশাপাশি জঙ্গিবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে ঘোলাজলে তাদের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে।

সংবাদ সম্মেলন থেকে দেশে স্থায়ীভাবে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে বলা হয়, সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের অভিযোগ জানাতে পারবে এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার ব্যবস্থা নেবে।

জঙ্গিবাদের মতো যেকোন সাম্প্রদায়িক হামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, পুলিশ ও প্রশাসনের ব্যক্তিদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা উদ্বুদ্ধ করা, জঙ্গিবাদের মতো সাম্প্রদায়িকতার ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্সের নীতি গ্রহণ করার দাবি জানানো হয়।

এছাড়া স্বাধীনতার পর থেকে হওয়া সকল সাম্প্রদায়িক ঘটনাবলী এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষতি ও দেশত্যাগের বিবরণীসহ তদন্ত প্রতিদেন বা শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আবৃত্তিকার রাশেদ হাসান। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উদীচীর কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ডা. চন্দন দাশ, অধ্যাপক হোসাইন কবীর, সুনীল ধর, শরিফ চৌহান।

আরও পড়ুন