বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

নাসিরনগরে হিন্দুদের ওপর হামলার নেপথ্যে আওয়ামী লীগের বিরোধ

নাসিরনগরে হিন্দুদের ওপর হামলার নেপথ্যে নাসিরনগরে হিন্দুদের মন্দির ও বাড়িঘরে হামলা, আগুন দেওয়ার ঘটনায় গঠিত তিনটি কমিটির তদন্ত শেষ পর্যায়ে। ধর্মীয় উন্মাদনা কাজে লাগানো হলেও স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধে এসব ঘটনা ঘটেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

ঘটনার নেপথ্যে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় একাধিক নেতা ভূমিকা রেখেছেন বলে তদন্তে প্রমাণ মিলেছে। মাঠপর্যায়ের কাজ শেষে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এখন এসব তথ্য বিশ্লেষণ করছেন। দু-এক দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

আক্রান্ত হিন্দু বসতি হরিণবেড় গ্রামসহ নাসিরনগরে এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্যে ৭৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আটজনকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গতকাল শনিবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

জেলা পুলিশের গঠন করা তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘তদন্তকাজ মূলত শেষ। মাঠপর্যায় থেকে উঠে আসা বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছি।’

নাসিরনগর থানার ওসি মো. আবু জাফর জানান, এলাকার পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। তবু সার্বিক দিক বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। রিমান্ডে আট আসামির কাছ থেকে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

এদিকে যে যুবককে ঘিরে ঘটনার সূত্রপাত সেই রসরাজ দাসের মোবাইল ফোন থেকে ‘অবমাননাকর’ ছবি ফেসবুকে আপলোড করা হয়েছিল কি না, তা গতকাল পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। মোবাইল ফোনটি সিআইডির পরীক্ষাগারে রয়েছে বলে জানা গেছে। আর রসরাজ কারাগারে বন্দি।

তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এসআই মিজানুর রহমান জানান, রসরাজের মোবাইল ফোন থেকে ছবিটি পোস্ট করা হয়েছিল কি না তা জানতে ঢাকায় বিশেষজ্ঞ টিমের কাছে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে কাজ চলছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদকালে রসরাজ ফেসবুকে ছবি পোস্ট করার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান গতকাল নাসিরনগর থানা প্রাঙ্গণে জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। হামলার ঘটনায় নিরীহ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয় সেদিকে নজর দিতে অনুরোধ করে এলাকাবাসী। পুলিশ সুপার জানান, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযান চলছে। গ্রেপ্তার বিষয়ে শুরু থেকেই সতর্ক রয়েছে পুলিশ।

স্থানীয় লোকজন জানায়, হামলার ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্যে। জড়িতদের সবাইকে না চিনলেও এলাকাবাসী অধিকাংশের পরিচয় জানে। বিতর্কিত ভূমিকার জন্য ইতিমধ্যে তিন আওয়ামী লীগ নেতাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ছাড়া একাধিক জনপ্রতিনিধির হামলার নেপথ্যে থাকার অভিযোগ রয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ বিষয়গুলো নিয়ে সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাতে ঘটনার জন্য দায়ী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে অনেকের নাম। রাজনৈতিক স্বার্থে অনেকে ‘ছোট ঘটনাকে বড় করেছে’ বলে অভিযোগ করে ক্ষতিগ্রস্তরা। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ মুহূর্তে দায়ী ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ্যে না আনলেও জানিয়েছেন, প্রতিবেদনে আসল ঘটনা উল্লেখ থাকবে।

ওদিকে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের একটি প্রতিনিধিদল শনিবার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়েছিল। কাশিপাড়ার একটি অস্থায়ী কালীমন্দিরের সামনে শতাধিক শিশুকে হাতে হাত রেখে শপথবাক্য পাঠ করান খেলাঘরের নেতারা। খেলাঘর আসরের পক্ষে এ সময় উপস্থিত ছিলেন হাসান আলী, অ্যাডভোকেট সুনীল কুমার সরকার, গোবিন্দ বাগচী, নীহার রঞ্জন সরকার, মাহবুব আলম, আল ইসলাম, আবুল কালাম প্রমুখ।

ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননাকর ছবি পোস্ট করার অভিযোগে পুলিশ রসরাজ দাস নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছিল ২৯ অক্টোবর। পরদিন নাসিরনগরে হিন্দুদের মন্দির ও বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয় অভিন্ন ইস্যু সামনে রেখে। দেশে-বিদেশে আলোচিত এ ঘটনা তদন্তে পুলিশ সদর দপ্তর, জেলা পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন