পুরোপুরি সুস্থ না হলেও রংপুরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই সাঁওতালকে গাইবান্ধার কারাগারে নিয়েছে পুলিশ। পুলিশের আবেদনে মঙ্গলবার চরণ সরেন ও বিমল কিসকোকে ছাড়পত্র দেওয়া হয় বলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
গোবিন্দগঞ্জ পুলিশ বলছে, ‘নিরাপত্তার কারণে’ সংঘর্ষের মামলার আসামি সমতলের নৃগোষ্ঠীর এই দুই সদস্যকে হাসপাতাল থেকে কারাগারে স্থানান্তর হয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই দুই সাঁওতালের হাতকড়া ও কোমরের রশি খুলে দিতে হাইকোর্টের নির্দেশ পালনে লুকোছাপার খবর প্রকাশের পর তাদের স্থানান্তরের পদক্ষেপ নিল পুলিশ।
গত ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে রংপুর সুগার মিলের সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মের জমিতে বসতি গড়া সাঁওতালদের চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারীরা তুলে দিতে গেলে সংঘর্ষ বাঁধে।
তখন পুলিশের গুলিতে তিন সাঁওতাল নিহত হন, আহত হন অনেকে। আহতদের মধ্যে চরণ সরেন ও বিমল কিসকোর পাশাপাশি দ্বিজেন টুডুকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।
সেখান থেকে দ্বিজেন টুডুকে ঢাকার চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়। তবে চরণ ও বিমল রংপুর মেডিকেল হাসপাতালে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন ছিলেন।
মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ ভ্যানে করে দুজনকে গাইবান্ধায় নিয়ে যায় পুলিশ।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, চরণ সরেনের বাম হাঁটুর নিচে ও পায়ের তলায় গুলি লেগেছিল। বিমলের বাম পায়ের বুড়ো আঙুলে গুলি লাগে। ক্ষত স্থানগুলো ড্রেসিং করা হয়েছে।
“আমি নিজেই তাদের ক্ষতস্থানে ড্রেসিং করেছি। তারা কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠেছেন।”
তাদের অবস্থা ছাড়পত্র দেওয়ার মতো ছিল কি না- জানতে চাইলে এই চিকিৎসক বলেন, “আরও কিছুদিন থাকলে ভালো হত। তবে গাইবান্ধার পুলিশ এসে তাদের নিয়ে যাওয়ার আবেদন করে।
“পরে হাসপাতাল পরিচালকের নির্দেশে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। তাদের তিন সপ্তাহ পর আবার ড্রেসিংয়ের জন্য আসতে বলা হয়েছে।”
গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি সুব্রত সরকার বলেন, “চরণ সরেন ও বিমল কিসকো মামলার আসামি। তারা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে থাকায় গণমাধ্যমকর্মীরা তাদের কাছে যখন-তখন আসা-যাওয়া করত।
“ফলে নিরাপত্তার অভাব বোধ করছিলাম আমরা। সে কারণে তাদেরকে নিয়ে এসে গাইবান্ধা কারাগারে রাখা হয়েছে।”
চরণ ও বিমলকে প্রথমে গাইবান্ধার আদালতে নেওয়া হয়, তারপর নেওয়া হয় কারাগারে।
সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে যে মামলা করেছে, তাতে চরণ ও বিমল দুজনকেই আসামি করা হয়েছে। তবে সেদিন সাঁওতাল নিহত হওয়ার ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি।
চরণ ও বিমলকে হাসপাতালে কোমরে রশি বেঁধে ও হাতকড়া পরিয়ে রাখার খবর গণমাধ্যম প্রচারিত হলে একটি রিট আবদন হয়। তাতে সোমবার হাইকোর্ট তাদের হাতকড়া ও কোমরের দড়ি খুলে দেওয়ার আদেশ দেয়।
তবে সোবার দুপুরে ওই আদেশের পর সন্ধ্যায়ও তাদের দুজনের হাতে হাতকড়া থাকার ছবি গণমাধ্যমে এসেছে। তাদের স্বজনরা জানান, পুলিশ সাংবাদিক দেখলে হাতকড়া খুলে দিত, সাংবাদিকরা চলে গেলে আবার পরিয়ে দিত।
মঙ্গলবার হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় দুজনের কোমরে রশি কিংবা হাতকড়া ছিল না বলে জানান হাসপাতালের সহকারী পরিচালক শফিকুল।
এদিকে আহত দ্বিজেন টুডুর স্ত্রীসহ দুই সাঁওতাল তাদের উচ্ছেদ অভিযান কোন ক্ষমতাবলে হয়েছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানাতে প্রশাসনকে আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন।
সমতলের এই নৃগোষ্ঠীর উপর গুলিবর্ষণের এই ঘটনায় সমালোচনা চলছে দেশজুড়ে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
এদিকে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন, চিনিকলের ওই জমি সাঁওতালদের না হলেও তাদের ব্যবহার করে ‘ভূমিদস্যুরা’ সেগুলো দখল করতে চেয়েছিল।
আগের দিন শিল্পসচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াও সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, একটি ‘স্বার্থান্বেষী মহল’ জমি উদ্ধার করে দেওয়ার কথা বলে সাঁওতালদের সংগঠিত করে চিনিকলের জমিতে অস্থায়ী স্থাপনা তৈরি করেছে।
তবে এই ভূমিদস্যু ও স্বার্থান্বেষী মহল কারা, মন্ত্রী-সচিব কেউই তা খোলাসা করেননি।
শিল্পমন্ত্রী ও সচিব অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের কথা বললেও গোবিন্দগঞ্জের ইউএনও ও ওসি দুজনই দাবি করেছেন, তারা কোনো উচ্ছেদ অভিযানে অংশ নেননি। সংঘর্ষের খবর পেয়ে তা থামাতে গিয়েছিলেন।


