বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

জঙ্গিদের অর্থ দিত দেশের কিছু বড় কর্মকর্তা: র‌্যাব

জঙ্গিদের অর্থ দিত দেশের কিছু বড় কর্মকর্তা: র‌্যাববাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বড় পদে কর্মরত কিছু ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করত নব্য জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের সদস্যরা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান।

রাজধানীর উত্তরা ও আদাবর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা নব্য জেএমবির পাঁচ জঙ্গি বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে এ সংবাদ সম্মেলন করে র‍্যাব।

বুধবার রাত সোয়া ৮টায় বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন এলাকা থেকে মাওলানা আব্দুল হাকিম ফরিদী ওরফে সুফিয়ান (৪০) ও রাজীবুল ইসলাম ওরফে রাজীব ওরফে আহমেদকে (২৯) গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-২। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাত সাড়ে ১২টায় আদাবরের মোহাম্মদিয়া ক্যাফে থেকে গাজী কামরুস সালাম সোহান ওরফে আবু আব্দুল্লাহ (২৭), মো. সোহেল রানা ওরফে খাদেম ওরফে মোয়াজ্জিন ওরফে সোহেল ওরফে শহীদুল্লাহ (২৩) ও শেখ মো. আবু সালেহ ওরফে লিটন ওরফে হুরাইয়াকে (৪২) গ্রেপ্তার করা হয়।

মুফতি মাহমুদ খান জানান, গ্রেপ্তার হওয়া গাজী কামরুস সালাম সোহানের প্রধান দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন স্থান থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তা অন্য জঙ্গিদের যোগান দেওয়া। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বড় পদে কর্মরত ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করত সে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ২৮ লাখ টাকা আদান-প্রদানের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জঙ্গি কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং অস্ত্র ক্রয় ও বিস্ফোরক তৈরি করতে শামীমকে ১ লাখ ২২ হাজার টাকা, সাইদকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা, রেজওয়ানকে ৫ লাখ টাকা, আমিন বেগকে ৩ লাখ টাকা, সাইফকে ৩ লাখ টাকা, শেলীকে ৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা, জাকিরকে ৩ লাখ টাকা, সাইফুল্লাহর আত্মীয়কে ৪ লাখ টাকা এবং নাম না জানা অন্যদের ২ লাখ ৩ হাজার টাকা দেয় সে।

মাওলানা আব্দুল হাকিম ফরিদী ওরফে সুফিয়ানের বাবার নাম মৃত আব্দুস সাত্তার। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থানার হোসেনপুরে। রাজীবুল ইসলাম ওরফে রাজীব ওরফে আহমেদের বাবার নাম মো. শফি উদ্দিন। তারা বাড়ি মাগুরা সদর থানার রামনগর গ্রামে। গাজী কামরুস সালাম সোহান ওরফে আবু আব্দুল্লাহর বাবার নাম মৃত গাজী আব্দুস সালাম। তার বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার ভেড়াবাজার থানার আড়পাড়া গ্রামে। মো. সোহেল রানা ওরফে খাদেম ওরফে মোয়াজ্জিন ওরফে সোহেল ওরফে শহীদুল্লাহের বাবার নাম নুরু ইসলাম। তার বাড়ি ঝিনাইদহের কালীচরণপুর থানার বড় কামারকুন্দু গ্রামে। শেখ মো. আবু সালেহ ওরফে লিটন ওরফে হুরাইয়ার বাবার নাম মৃত আব্দুস সোবহান শেখ। তার বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানার তৃলোনা গ্রামে।

মুফতি মাহমুদ বলেন, গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে একটি নাইন এমএম পিস্তল, দুটি ম্যাগজিন, ২০ রাউন্ড গুলি, ১০টি ককটেল, ৫টি ডেটোনেটর, এক কয়েল তার, এক কেজি সাদা পাউডার, ২০০ গ্রাম বারুদ, দেড় কেজি তারকাটা ও বল, দুটি সার্কিট বোর্ড এবং ১৫টি ক্লিপ টাইপ সার্কিট উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব সূত্রে জানা যায়, গাজী কামরুস সালাম ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ায়। সে ২০০৭ সালে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে গাজীপুরের ইসলামী ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক্স বিষয়ে বিএসসি শেষ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে সে তার বন্ধু ‍সিফাতের মাধ্যমে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। ২০১৩ সালে জঙ্গিবাদ তার মনে দৃঢ়ভাবে জায়গা করে নেয়। পরে তাকে ক্ষুদ্রাস্ত্র ও বোমা বানানোর প্রশিক্ষণের জন্য চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। প্রশিক্ষণ শেষে সে বিস্ফোরক তৈরির শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পায়। এ ছাড়া সে জঙ্গিবাদী কার্যক্রমের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বড় কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ ও নিজে অর্থ সহায়তা করত।

মাওলানা আব্দুল হাকিম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবন শুরু করে। পরে রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার মাখাবাপুর উলুম মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস পাশ করে। সে ভালো বক্তা ও প্রশিক্ষক। আব্দুল হাকিম জঙ্গিবাদে অনুপ্রাণিত হয় জসিম উদ্দীন রহমানির মাধ্যমে। পর্যায়ক্রমে সে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) শীর্ষ পর্যায়ে চলে যায়। সারোয়ার-তামিম গ্রুপের কর্মীদের মোটিভেট করাই ছিল তার প্রধান কাজ।

রাজীবুল ইসলাম ওরফে রাজীব ওরফে আহমেদ ছিল সারোয়ার-তামিম গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। সে আধা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করে। সে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত জসিম উদ্দীন রহমানির ঘনিষ্ঠ সহচর ছিল। ঢাকা কলেজ থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স শেষে করে ফাইভ স্টার সিমেন্ট কোম্পানির সেলস রিপ্রেজেন্টিটিভ হিসেবে কর্মরত ছিল রাজীব।

মো. সোহেল রানা ছিল সারোয়ার জাহান ওরফে শাইখ আবু ইব্রাহিম আল হানিফের গুপ্তচর। ২০১৩ সালে সে জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হয়। ২০১৫ সালে সে সারোয়ার-তামিম গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হয়। সে ঝিনাইদহের একটি মসজিদে মোয়াজ্জিন ছিল। সেই মসজিদটি দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জঙ্গিদের সেফ হাউজ ছিল। তার আস্তানায় জঙ্গিদের সব বৈঠক হতো।

শেখ মো. আবু সালেহ ছিল সারোয়ার-তামিম গ্রুপের শারীরিক ও কারাতে প্রশিক্ষক ছিল। ২০০২ সালে মামুন নামের এক জঙ্গির মাধ্যমে জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হয় সে। ২০০৩ সালে সে কারাতে শেখার জন্য কলাবাগান থানা এলাকার কিউকুশান নামের একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। ২০০৯ সালে সে ব্ল্যা বেল্ট পায়। এর পরে সে জঙ্গিদের কারাতে প্রশিক্ষক নিযুক্ত হয়।

মুফতি মাহমুদ বলেন, ‘গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর দেশব্যাপী জঙ্গিবিরোধী অভিযানে তারা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাছাড়া বেশ কয়েকজন জঙ্গির আত্মসমর্পণের পর তাদের মনোবলে ভাঙন ধরে। ফলে আত্মগোপনে থাকা কিছু জঙ্গি সংগঠনকে চাঙ্গা রাখতে গোপনে সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা চালাত।’ জঙ্গিরা আবারও সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে গোয়েন্দারা অনুমান করছেন বলেও জানান মুফতি মাহমুদ খান।

আরও পড়ুন