বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

শেখ হাসিনার সামনেই আইভীর সঙ্গে শামীম ওসমানের ঝগড়া

শেখ হাসিনার সামনেই আইভীর সঙ্গে শামীম ওসমানের ঝগড়াএর আগে টেলিভিশনের এক টক-শোতে যা হয়েছিল, গণভবনের বৈঠকে তা ছাড়িয়ে যায়…

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলের সংসদ সদস‌্য এ কে এম শামীম ওসমানকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।

নারায়ণগঞ্জের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরোধিতায় সরব থাকা শামীমকে মঙ্গলবার গণভবনে বৈঠকে শেখ হাসিনা এই সতর্কবার্তা দেন। ওই বৈঠকে আইভী ছাড়াও নারায়ণগঞ্জের বেশ কয়েকটি কমিটির নেতা উপস্থিত ছিলেন, যাদের সবাই ছিলেন শামীম ওসমানের অনুগত।

গণভবনে বৈঠকে শেখ হাসিনার সামনেও তারা ঝগড়ায় জড়িয়েছিলেন বলে বৈঠকে উপস্থিত নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, “আপনারা ধারণাই করতে পারছেন না যে, কালকের মিটিংয়ে কী হয়েছে। ২০১৪ সালের অগাস্ট মাসে টেলিভিশন টক শো-তে যা হয়েছিল, কালকের (মঙ্গলবার) মিটিংয়ে তাও ছাড়িয়ে গেছে। নেত্রী (শেখ হাসিনা) অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন।”

মঙ্গলবারের বৈঠকে শেখ হাসিনার বক্তব‌্য ‘বিস্ময়কর’ বলে মন্তব‌্য করেন বৈঠকে উপস্থিত ক্ষমতাসীন দলটির কেন্দ্রীয় দুই নেতা। তারা বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা না মানলে কারোরই আওয়ামী লীগে থাকার ‘দরকার নাই’ বলে সাফ জানিয়ে দেন শেখ হাসিনা। এই দুই নেতার একজন বলেন, “শামীম ওসমানের দিকে তাকিয়ে নেত্রী বলেন, ‘শৃঙ্খলা না মানলে, দল ছেড়ে চলে যেতে পার, দলে থাকলে ডিসিপ্লিন মেনে চলতে হবে’।”

গণভবনে বৈঠকের শুরুতেই শামীম আইভীর বিরুদ্ধে দলীয় সভানেত্রীর সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকমের কুৎসা রটনার অভিযোগ তোলেন বলে কেন্দ্রীয় ওই দুই নেতা জানান।

তখন শেখ হাসিনা বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় যারা তাকে দল থেকে বাদ দিতে চেয়েছিলেন, তাদেরও তো তিনি মন্ত্রিসভায় নিয়েছেন।

বৈঠকে আইভী তার বিরুদ্ধে শামীমসহ তার অনুগত নেতাদের উত্থাপিত সব অভিযোগই খণ্ডন করেন বলে জানান বৈঠকে উপস্থিত এক সংসদ সদস্য।

আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বোমা বিস্ফোরণে নিহতদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ এবং দলীয় কার্যালয় নির্মাণে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা তখন বলেন আইভী।

শামীম ওসমান ও তার অনুগত নেতাদের আক্রমণাত্মক কথার এক পর্যায়ে আইভী প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, “আমি নির্বাচন করব না। আপনি আনোয়ার চাচাকে (নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন) দিয়ে দেন।”

এসময় শামীম ওসমানসহ তার অনুগতরা বলেন, “নেত্রী, তাহলে আমাদের ছেড়ে দেন।”

তারপর দুজনকে থামিয়ে শেখ হাসিনা দলীয় শৃঙ্খলা মানতে শামীমকে হুঁশিয়ার করে দেন বলে জানান ওই দুই কেন্দ্রীয় নেতা।

বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ কারও নাম উল্লেখ না করে বলেন, “দলের সিদ্ধান্ত মেনেই রাজনীতি করতে হবে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ কারও নেই।”

বৈঠকের পর সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “দল করলে শৃঙ্খলা মানতে হবে। শৃঙ্খলার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যারা দলীয় শৃঙ্খলা মানবে না, তাদের নিয়ে দল ভাববে।”

এই বৈঠকের বিষয়ে আইভীকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি নারায়ণগঞ্জে ফিরে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “নেত্রী আমাদের সকলকে নির্দেশ দিয়েছেন মিলেমিশে নৌকার জন্য কাজ করতে।”

বৈঠকের বিষয়ে কথা বলতে একাধিকবার শামীম ওসমানের মোবাইলে কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

শামীম-আইভী দ্বন্দ্বের ইতিহাস:
তাদের দুজনের এই দ্বন্দ্ব পারিবারিক উত্তরাধিকার। ওসমানদের বিরোধী শিবির থেকে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম‌্যান হয়েছিলেন আইভীর বাবা আলী আহমেদ চুনকা।

বিএনপির ভোট বর্জনের মধ্যে গত নির্বাচনে শামীমকে এক লাখের বেশি ভোটে হারিয়ে মেয়র হয়েছিলেন আইভী। তখন আওয়ামী লীগ কাউকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন না দিলেও কেন্দ্রীয় বেশ কয়েকজন নেতা শামীমের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন। দলে বিরুদ্ধ স্রোতের মধ‌্যেই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়ে নামা আইভী ভোটে জয়ী হন; যদিও শামীমের দাবি, বিএনপির ভোট আইভীকে জয়ী হতে সহায়তা করে। ভোটের পর ত্বকী হত‌্যাকাণ্ড এবং ৭ খুন নিয়ে আইভী ও শামীমের দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে। প্রকাশ‌্যে সভায় একে অন‌্যের বিষোদগারের পাশাপাশি টেলিভিশন বিতর্কে তাদের মারমুখী ভূমিকায়ও দেখা যায়।

ত্বকী হত‌্যা ও ৭ খুন নিয়ে ব‌্যাপক সমালোচনার মধ‌্যেও ওসমান পরিবারের পক্ষে দুই বছর আগেও সংসদে কথা বলতে দেখা গিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। শামীমের ভাই এ কে এম নাসিম ওসমানের মৃত‌্যুর পর সংসদে শোক প্রস্তাবের উপর আলোচনায় আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় শামীম ওসমানের দাদা খানসাহেব ওসমান আলীর ভূমিকা, দলের বিস্তৃতিতে শামীমের বাবা এ কে এম শামসুজ্জোহার অবদান স্মরণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকন‌্যা শেখ হাসিনা।  তখন তিনি বলেছিলেন, “এ পরিবারটি বারবার আঘাতের শিকার হয়েছে। যখন যে সরকার এসেছে কখনও না কখনও এ পরিবারের ওপর হামলা-নির্যাতন করেছে। অনেকে থাকে, যারা বারবার আঘাতের লক্ষ্যে পরিণত হয়। অনেকে অনেক অপরাধ করে, তা কেউ দেখে না। কিন্তু তার থেকে ঘটনাচক্রে কম অপরাধ করেও ঘটনার শিকার হয়। ক্ষেত্র বিশেষে সামান্য কিছু হলে বড় করে লেখা হয়।”

তখন প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব‌্যে নারায়ণগঞ্জে ‘সন্ত্রাসের গডফাদারদের’ পক্ষে অবস্থান প্রকাশ পায় বলে বিএনপি অভিযোগ তোলে।

শামসুজ্জোহার ছেলে শামীম ছাত্রলীগ হয়ে আসেন আওয়ামী লীগে। তোলারাম কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রোড মার্চের গাড়িবহর আটকে ব‌্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস‌্য শামীম ওসমান ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বিদেশে চলে যান।

তখন প্রবাস থেকে ফিরে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন দলটির এক সময়ের নেতা চুনকার মেয়ে ডা. আইভী। ২০০৯ সালে শামীম দেশে ফেরার পর দুজনের দ্বন্দ্ব চলছে।

আরও পড়ুন