মিয়ানমার থেকে প্রাণে বেঁচে পালিয়ে এসে যেসব রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন তারা অভিযোগ করছেন, রাখাইন প্রদেশে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী খুন এবং ব্যাপক নির্যাতন চালাচ্ছে।
তারা আসছে হাজার হাজার। মিয়ানমার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্য থেকে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল নামছে বাংলাদেশ সীমান্তে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সহিংসতা থেকে বাঁচতে তারা পালাচ্ছে।
কয়েকজন শরণার্থী বলছেন, তারা ধর্ষণ, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তারা চোখের সামনে নিজেদের পরিবারের সদস্যদের খুন করতে এবং তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতে দেখেছেন। লালু বেগম বলেছেন, যদি মিয়ানমার সেনা দশ বছরের বেশি বয়সী কোনও ছেলেকে পায় তাহলে তাকে হত্যা করে ফেলে। পুরুষদেরকেও সেনা সদস্যরা তুলে নিয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, যখন সেনাবাহিনী আসতো তখন আমরা আমাদের ঘর থেকে পালিয়ে যেতাম। আমি জানি না আমার স্বামী বেঁচে আছে না মরে গেছে।
টেকনাফের কুতুপালং এলাকায় মোজিনা খাতুন নামে একজন রোহিঙ্গা অভিযোগ করছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করেছে।
তিনি জানান, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে। পুরুষদের ধরে ধরে হয় গুলি করা হচ্ছে, নয়তো গলা কেটে ফেলা হচ্ছে। তার মতই আরো বহু নারী এখন স্বামীহারা।
মোজিনা খাতুন বলেন, তারা আমাদের বাচ্চাদের আগুনে ছুঁড়ে ফেলছে। প্রাণ বাঁচাতে রাতের অন্ধকারে আমরা তাই সীমান্ত অতিক্রম করে এখানে এসেছি।
জাতিঘত নিধন
লালু বেগম বর্তমান বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় কক্সবাজার জেলার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত আছেন। তিনি জানিয়েছেন, রাখাইনে তার গ্রামের বহু নারীকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ধর্ষণ করেছে।
তিনি বলেন, যখনই সেনা সদস্যরা কোনও সুন্দরী রোহিঙ্গা মেয়েকে দেখতে পায় তখনই তার কাছে পানি পান করার কথা বলে ঘরে ঢুকে পড়ে তাদের ধর্ষণ করে। রাখাইনে আনুমানিক দশ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করে। সেখানে তারা রাষ্ট্রহীন আদিবাসী সংখ্যালঘু হিসেবে নিপীড়িত হচ্ছে।
রোহিঙ্গরা বহু প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারে বসবাস করে আসলেও দেশটির সরকার তাদের নাগরিকতার স্বীকৃতি না দিয়ে তাদের অবৈধ বাঙালি অভিবাসী বলে অপবাদ দিচ্ছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ কার্যালয়ের কর্মকর্তা জন ম্যাককিসিক বলেছেন, রোহিঙ্গারা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত মানুষ। তিনি বলেছেন, এটি প্রতীয়মান যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা জনগণকে জাতিগতভাবে নিধন করছে।
মৃত্যুর রাস্তা
কুতুপালংয়ে থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বলেছেন, তারা মধ্যরাতে তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। এরপর সেনাবাহিনীর চোখ এড়িয়ে পায়ে হেটে গ্রামের পর অতিক্রম করে নাফ নদী পেড়িয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন তারা।
লালু বেগম বলেন, বাংলাদেশে আসতে আমার চারদিন লেগেছে। যখন আমাদের গ্রামের পুড়িয়ে দেয়া হলো, তখন আমরা আরেকটি গ্রামে আশ্রয় নেই এবং ক্রমাগত নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে থাকি। এভাবে এক পর্যায়ে আমরা নাফ নদীর তীরে পৌঁছে যাই। বিপজ্জনক এই যাত্রায় অনেকেই তাদের পরিবারের সদস্যদের হারিয়ে ফেলেছেন।
লালু বেগমের বোন নাসিমা খাতুন বলেন, যখন আমরা যাত্রা শুরু করি তখন আমাদের সঙ্গে ছয়জন ছিল। এরপর আমরা পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়ে ফেলি।
নাসিমা বলেন, আমার স্বামী ও ছেলে নিহত হয়েছে। আরেক ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যায় না।
মার্কিন সংবাদ মাধ্যম সিএনএন বলছে, শরণার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া এসব খবর এবং রাখাইনে সহিংসতা ও হতাহতের দৃশ্য সম্বলিত যেসব ভিডিও ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে তার সত্যতা তারা স্বাধীনভাবে খতিয়ে দেখতে পারেনি।
জাতিসংঘের মতে, রাখাইনে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাটি অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে, যেখানে সংবাদমাধ্যম এবং দাতা সংস্থাগুলোকে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।
ইউএনএইচসিআর কর্মকর্তা জন ম্যাককিসিক বলেন, আমরা মিয়ানমার সরকারকে বলেছি রোহিঙ্গাদের এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দিতে, তাহলে আমরা হিসাব করতে পারতাম যে সেখানে আসলে কতজন মানুষ মারা গেছে।
তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি শরণার্থীরা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে জঙ্গলে, প্রধান সড়কে, গ্রামে এবং অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নিচ্ছে, বলেন ম্যাককিসিক।


