বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা ঠিকই জয় করতে পেরেছেন ২৬ বছর বয়সী সূচি আক্তার। স্নাতকের পাশাপাশি কম্পিউটারে লেখালেখি, আঁকাআঁকিসহ আরও অনেক কারিগরি দক্ষতাও অর্জন করেছেন তিনি।
এরপরেও বছরের পর বছর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও চাকরির দেখা না পেয়ে নতুন করে হতাশা পেয়ে বসেছে প্রতিবন্ধিতাজয়ী এই নারীকে।
রোববার খ্রিষ্টীয় বছরের প্রথম দিনে ঢাকার আগারগাঁওয়ে আইসিটি বিভাগ আয়োজিত প্রতিবন্ধীদের চাকরি মেলার খবর পেয়ে সূচিকে অনেকটা জোর করেই নিয়ে এসেছেন তার মা শাহীন আক্তার। তবে শত শত চাকরিপ্রার্থীর বিপরীতে চাকরিদাতাদের উপস্থিতি না দেখে আবারও হতাশ তিনি।
সূচির মায়ের মতোই চাকরিপ্রার্থীদের সারিতে দাঁড়ান আরও দুই অভিভাবক হোমিও চিকিৎসক ফাতেমা বেগম ও কম্পিউটার অপারেটর রফিকুল ইসলাম। এই তিনজনের মেয়েই আইসিটি ডিভিশনের সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজঅ্যাবলিটির (সিএসআইডি) তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণধারী।
শিক্ষিত-দক্ষ প্রতিবন্ধী সন্তানের চাকরির জন্য ছুটাছুটি করে তাদের ব্যর্থ হওয়ার গল্পও একই ধরনের।
“যেখানেই চাকরির কথা শুনি সেখানেই যাই। শারীরিক প্রতিবন্ধী এমনকি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদেরও টুকটাক চাকরি হয়, কিন্তু বাকপ্রতিবন্ধীদের কেউ চাকরিতে নিতে চায় না, তাহলে আমরা কোথায় যাব?,” প্রশ্ন রাখেন বাক প্রতিবন্ধী সুমি আক্তারের মা ফাতেমা বেগম।
মেয়ের চাকরির জন্য ঘুরে বঞ্চনার শিকার হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “গত বছর এক অনুষ্ঠানে আমার মেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কন্যা পুতুলের হাত থেকে পুরস্কার পেল। পুতুল বললেন- আপনার মেয়ে তো অনেক মেধাবী, সে অনেক কাজ করতে পারে। চাকরির ব্যবস্থাও করে দিতে বললেন, কিন্তু কেউ তো এগিয়ে আসেনি!
“আজকে এসেছি, কিন্তু পুতুলের অনুষ্ঠানে ঢুকতে পারিনি। সেখানে যেতে পারলে আমি দাঁড়িয়ে বলতাম, তখন মেয়ের চাকরি ঠিকই হয়ে যেত।”
প্রতিবন্ধীদের চাকরির ক্ষেত্রে বাকপ্রতিবন্ধীরা পিছিয়ে আছে দাবি করে তিনি বলেন, “দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের তুলনায় তারা আরও সক্ষম। তারা পড়তে পারে, লিখতে পারে, ইশারা ভাষায় ৯০ ভাগ মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে।”
কম্পিউটারে লেখালেখি করতে জানা নিজের মেয়ে সুমী ইশারা ভাষার শিক্ষক হতে চায় জানিয়ে তিনি বলেন, এখনও সে দুটি টিউশনি করছে। দুইটি মেয়েকে বাসায় গিয়ে পড়াচ্ছে।
সূচির মা শাহীনের অভিযোগ, প্রতিবন্ধীদের নিয়ে যেভাবে প্রচারণা চলছে সেভাবে কার্যক্রম তারা দেখতে পাচ্ছেন না।
“মেয়ে রায়েরবাজারে ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে চারুকলায় অনার্স কমপ্লিট করেছে। কম্পিউটারে গ্রাফিক্সের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছে, সিএসআইডিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। কিন্তু টানা তিনবার এই চাকরি মেলায় এসেও চাকরি জোটেনি।”
তবে প্রাপ্তি হিসাবে প্রতিবন্ধীদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ার কথা বলেন তিনি।
“আগে আমাদের মেয়ে কারও সঙ্গে মিশলে বকা খেতাম। তবে এই সরকারের সময়ে কিছুটা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছি। প্রতিবন্ধীর মা বলে কেউ খারাপ দৃষ্টিতে তাকাতে সাহস করছে না, এটাই এখন পর্যন্ত বড় প্রাপ্তি।”
মেয়ের চাকরি না হওয়ায় একই আক্ষেপের কথা জানান রাহেলার বাবা রফিকুল ইসলাম।
রোববার আগারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত প্রতিবন্ধীদের চাকরি মেলায় এসেছিলেন বরগুনা জেলার আমতলী উপজেলার আবু সালেহ, হাবিবুর রহমানসহ প্রায় তিনশ প্রতিবন্ধী তরুণ-তরুণী।
সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে মাত্র দেড়শ জনের চাকরির প্রতিশ্রুতি মিলেছে বলে আয়োজকরা জানান। চাকরি প্রত্যাশীদের জন্য সরাসরি স্টল দিয়ে বসে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান।
এগুলো হল- মাই আউটসোর্সিং, ডিজিকম, নিটা ও সেবা ডট এক্সওয়াইডেজ।
আউটসোর্সিং কোম্পানিগুলোর জোট ‘বাক্য’ তাদের সদস্যদের পক্ষ থেকে প্রতিবন্ধীদের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে অনুষ্ঠানে আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি ছিল হাতে গোনা।
গত বছরও এখানে চাকরির জন্য দূরের পথ পাড়ি দিয়ে এসেছিলেন অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি।
কম্পিউটারে এমএস ওয়ার্ডের কাজে পারদর্শী শারীরিক প্রতিবন্ধী আবু সালেহ জানান, চাকরি মেলার খবর পেয়ে তিনি বরগুনা থেকে ছুটে এসেছেন। মেলায় সিভি জমা দিলেও কোনো সাড়া পাননি। সাক্ষাৎকারের জন্যও ডাক পাননি।
বরিশালের বিএম কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করা রুবেল জানান, তিনি চাকরি মেলায় তিনটি প্রতিষ্ঠানে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সব কটি প্রতিষ্ঠান থেকেই বলা হয়েছে, চাকরির বিষয়ে পরে জানানো হবে।
চাকরি মেলা পরিদর্শনে আসা যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সিবিএম’র প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট জাহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকার অনেকগুলো যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে তাদের চাকরির ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপই কাম্য।
“একজন প্রতিবন্ধীকে শাহবাগ থেকে আগারগাঁও আসতে অনেক হিসাব-নিকাশ করতে হয়। সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মতো তাদের জীবন নয়। সুতরাং তাদের চাকরির অভিগম্যতা আরও সহজ হওয়া উচিত। যোগ্যতা অর্জন করার পরও দ্বারে দ্বারে ঘুরা দূর করা উচিত।”
বিগত দুটি চাকরি মেলার প্রথমটিতে ৬০ জন এবং দ্বিতীয়টিতে ৩২ জনের চাকরি হয়েছিল বলে জানান মেলার অন্যতম আয়োজক বিসিসির নির্বাহী পরিচালক আশরাফুল ইসলাম।


