পুরান ঢাকায় একসময় একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল শীর্ষ সন্ত্রাসী ডাকাত শহীদের। শহীদের বাইরে কিছুটা প্রভাব ছিল আরেক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী নাসিরের। শহীদ তার শিষ্যদের ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও টার্গেট কিলিং করে আসছিল। নাসির ছিল মূলত মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রক। র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ডাকাত শহীদ নিহত ও নাসির সুইডেনে পাড়ি জমানোর পর পুরান ঢাকায় দাপাচ্ছে অন্তত ৫৫ উঠতি মাস্তান। জাফর, খায়ের ও মাস্টার গ্রুপের হয়ে তারা খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসা করে আসছে। এই তিন গ্রুপের বাইরেও আলাদাভাবে কয়েকজন উঠতি মাস্তান পুরান ঢাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি করছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, খায়ের দুই দশক আগে গুলিস্তানে একটি খাবারের হোটেলের কর্মচারী ছিল।
আহাদ বক্সের পেছনে পরিবহন ব্যবসায়ী মুন্না হত্যা মামলার অনত্যম আসামি খায়ের। সে বর্তমানে পুরান ঢাকার চাঁদাবাজির একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তার হয়ে কাজ করছে লরেন্স, ফরিদ, লোকমান শিপন ও বাঙাল মামুন। বাঙাল মামুন একসময় ডাকাত শহীদের ‘ডান হাত’ হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০১২ সালে ডাকাত শহীদ নিহত হওয়ার কিছু দিন পর পুরনো দল গোছাতে শুরু করে খায়ের। ডাকাত শহীদ বাহিনীর সদস্য ভাগ্নে জুয়েল, পাভেল, রানা, দ্বিতীয় সোহেল, পাঞ্চিং সিরাজ, রনি, ফরহাদ, কাউসার, জামাই শাহিন, উত্তম, ইফরান, আমান, লিটন ওরফে হকার্স লিটন ও সোহেলকে দলে ভিড়ানোর চেষ্টা করে। তাদের মধ্যে শাহিন, পাভেল, আমান, লিটনসহ কয়েকজন তার দলে চলে আসে। ডাকাত শহীদ গ্রুপের অন্যরা মাস্টার ও জাফরের দলে যোগ দেয়।
একসময় খায়ের গ্রুপের হয়ে নানা অপারেশনে অংশ নিত গিয়াস উদ্দিন জাফর। পরে ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় জাফর নিজেই একটি দল তৈরি করে। আন্ডারওয়ার্ল্ডে জাফর দাউদ নামে পরিচিত। জাফরকে নেপথ্যে সব ধরনের বুদ্ধি-পরামর্শ দিত মোহাম্মদ আলী। তবে আলী ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর সেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। জাফর বাহিনী পুরান ঢাকা ছাড়াও যাত্রাবাড়ী এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। তার বাহিনীতে রয়েছে ছোট সম্রাট, সোহেল, জনি, আরিফ, মাসুদ, মনু, সাজু, রোকন, আরাফাত, কাক্কু মনোয়ার, আলিম, সুজন, তোহা, সাদিক ও ল্যাংড়া সুজন।
২০১৩ সালে মতিঝিলে পরিবহন মালিক ও আওয়ামী লীগ নেতা খায়রুল আলম হত্যার ঘটনায় জাফর সম্পৃক্ত ছিল। জাফরসহ ১৬ জনকে আসামি করে এরই মধ্যে এই মামলার চার্জশিট দিয়েছে ডিবি। এ মামলায় জাফরের অন্য সহযোগীদের মধ্যে রয়েছে এবিএম আওলাদ হোসেন, আলী আকবর বাবুল, মুসফিকুল মান্নান ওরফে বায়ু, আবুল কালাম, আলমগীর হোসেন, নায়মুর রহমান দুর্জয়, সালাউদ্দিন, তৈয়ব আলী, বাচ্চু মিয়া, সুমন রেজা, সেলিম সারোয়ার, মান্নান ভুঁইয়া, মোক্তার হোসেন নিপা, সাইদুজ্জামান শান্ত ও রহমত উল্লাহ সেন্টু।
মাস্টার বাহিনীর প্রধানের নাম মো. সবুর (৫০)। টিটিপাড়া বস্তিতে সন্ত্রাসী নাসিরের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিল সবুর। নাসির সুইডেনে চলে যাওয়ার পর তার জায়গা দখল করে সে। কীভাবে কোনো অপারেশনে গিয়ে নিখুঁতভাবে কাজ শেষে নির্বিঘ্নে চলে আসা যায়, সে ব্যাপারে শিষ্যদের ‘ইনডোর ট্রেনিং’ দিয়ে আসছে সবুর। তাই সে ‘মাস্টার’ নামে পরিচিত। তার সেকেন্ড ইন কমান্ড হলো দিলু মুদ্দি। বছরখানেক আগে সবুর গ্রেফতার হয়ে কিছুদিন কারাবন্দি ছিল। এরপর জেলখানা থেকে বেরিয়ে আবারও দল গুছিয়ে নেয় সে। সবুরের বিরুদ্ধে এক ডজনের বেশি মামলা আছে। কয়েকটি মামলার রায়ে তার সব মিলিয়ে একশ’ বছরের বেশি সাজা হয়েছে। সম্প্রতি সবুরের সেকেন্ড ইন কমান্ড দিলু মুদ্দি ধলপুরে পুলিশ চেকপোস্টে তল্লাশির সময় অস্ত্রসহ ধরা পড়ে। সবুরের লোকজন পুরান ঢাকাসহ যাত্রাবাড়ী এলাকায় ডাকাতি, ছিনতাই করে আসছে। সবুরের দলের উঠতি সন্ত্রাসীদের মধ্যে রয়েছে জানে আলম আশিক, ওমর ফারুক, শফিকুল ইসলাম চুইকা, রাহাত হাছান মিলন, রাফায়েতুল ইসলাম রাব্বী, লিমন, সাগর, রানা হাসান শুভ।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়- জাফর, খায়ের ও মাস্টার গ্রুপের বাইরে লালবাগ, হাজারীবাগ ও বেড়িবাঁধ এলাকায় চাঁদাবাজি করছে মিজান, ইছমাইল ও চশমা সেলিম। বেড়িবাঁধ এলাকায় বিভিন্ন কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে তারা প্রায়ই চাঁদা দাবি করে। গত বছরের মাঝামাঝিতে চাঁদা না দেওয়ায় আজিমপুরে এক ডেভেলপার কোম্পানির কার্যালয়ে ভাংচুর চালানো হয়। এ ঘটনায় লালবাগ থানায় মামলাও হয়েছিল। কোতোয়ালি ও বংশালে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা করছে কাশেম।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, পুরান ঢাকায় উঠতি অপরাধী হিসেবে যারা সক্রিয়, তাদের অধিকাংশই বহিরাগত। পুরান ঢাকায় অপরাধ সংঘটিত করেও তারা ঢাকার আশপাশ এলাকায় চলে যায়। পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক উঠতি সন্ত্রাসী অনেকের নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও কামরাঙ্গীরচরে আস্তানা রয়েছে।
র্যাব-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর বলেন, পুরান ঢাকায় একসময় সন্ত্রাসীদের ব্যাপক দাপট ছিল। উঠতি কিছু মাস্তান অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে, তবে খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কোতোয়ালি জোনের এডিসি মাহমুদা আফরোজ লাকি বলেন, পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক ছিনতাই, চাঁদাবাজির ঘটনায় কোনো উঠতি সন্ত্রাসীর নাম এলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিভিন্ন সময় কিছু সংখ্যক উঠতি অপরাধীকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।


