বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

শততম টেস্টে ঐতিহাসিক জয়

100-match-test-winsশ্রীলংকা ৩৩৮ ও ৩১৯, বাংলাদেশ ৪৬৭ ও ১৯১/৬ * ফল : বাংলাদেশ ৪ উইকেটে জয়ী

রঙ্গনা হেরাথের ফুলটস বল মেহেদী হাসান মিরাজ সুইপ করে পাঠিয়ে দিলেন শর্ট ফাইন লেগ অঞ্চলে। দ্রুত দু’বার প্রান্ত বদলের আগেই শুরু হয়ে গেল জয়োল্লাস। অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম দু’হাত তুলে বাঁধনহারা উল্লাসে মেতে ওঠেন। অধিনায়ককে আনন্দ-আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেন মেহেদী। কলম্বোর পি সারা ওভালে শত ফুল ফুটল সাফল্যের সুরভি ছড়িয়ে। সেই ফুলের রং লাল-সবুজ। শত সূর্য উঠল অধরা জয়ের আঁধার দূর করে। উৎসবের ঢেউ আছড়ে পড়ল বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায়। শততম টেস্টে ঐতিহাসিক জয়ের হৃদয়গ্রাহী ছবি শিল্পীর তুলিতে রাঙিয়ে রাখল বাংলাদেশ। কলম্বো টেস্টে শ্রীলংকার বিপক্ষে চার উইকেটের অবিস্মরণীয় জয়ে ইতিহাসে ঢুকে গেলেন মুশফিকুররা। বাংলাদেশের আগে নিজেদের শততম টেস্টে জয়ের কীর্তি ছিল শুধু অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের। সেই সংক্ষিপ্ত তালিকায় এখন উজ্জ্বলতম সংযোজন বাংলাদেশ।

স্বপ্নের আবির মেখেই কাল শুরু হয়েছিল কলম্বো টেস্টের শেষদিন। হাতছানি ছিল অনেক কিছু পাওয়ার। শততম টেস্টে স্বপ্নের জয়, সাদা পোশাকে শ্রীলংকার বিপক্ষে প্রথম জয়, দেশের বাইরে বিরল জয়, ১-১-এ সিরিজ ড্র। লংকান অধিনায়ক রঙ্গনা হেরাথের ৩৯তম জন্মদিনটা বিষাদময় করে সব সমীকরণই মিলিয়ে ফেলল বাংলাদেশ। ১৯১ রানের লক্ষ্য তাড়ায় শুরুতেই হেরাথের জোড়া আঘাতে ঈশান কোণে জমেছিল সিঁদুরে মেঘ। কিন্তু তামিম ইকবালের রোদেলা ব্যাটিংয়ে মধ্যাহ্ন বিরতির পর কেটে যায় তা। উজ্জ্বল সূর্যের নিচে ঔজ্জ্বল্য ছড়ান সাকিবরা। তৃতীয় উইকেটে সাব্বির রহমানের সঙ্গে ১০৯ রানের অনবদ্য জুটিতে দলকে জয়ের পথে অনেকটাই এগিয়ে দেন তামিম। পথের শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারেননি তিনি দলকে, এই যা তার দুঃখ। দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলে থামলেন ৮২ রানে। তামিমের বিদায়ের পর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি সাব্বিরও (৪১)। পেরেরার জোড়া আঘাতে ম্যাচে ফিরেছিল শ্রীলংকা। চার উইকেটে ১৫৬ রানে চা-বিরতিতে যায় বাংলাদেশ। শেষ সেশনে দরকার আরও ৩৫ রান। দলীয় ১৬২ রানে সাকিবকে নিজের তৃতীয় শিকার বানিয়ে রোমাঞ্চ আরও জমিয়ে দেন পেরেরা। সাকিব যখন আউট হন, বাংলাদেশের তখন আরও ২৯ রান দরকার। কিন্তু তীরে এসে তরী ডুবতে দেননি মুশফিকুর (২২*)। আম্পায়ার এস রাভি লেগ বিফোর দিয়েছিলেন মুশফিককে। রিভিউয়ে সিদ্ধান্ত বদলে যায়। পরের ওভারে মোসাদ্দেকের ফিরতি ক্যাচ নিতে পারেননি হেরাথ। মোসাদ্দেক ও মেহেদীকে সঙ্গে নিয়ে বাকি পথটুকু পাড়ি দেন মুশফিক যোগ্য অধিনায়কের মতো। যাকে এই টেস্টে খেলাতেই চাননি বোর্ডপ্রধান, তিনিই ইতিহাসে অমর হয়ে গেলেন বাংলাদেশের শততম টেস্টজয়ী অধিনায়ক হিসেবে।

একসময়ের দুঃস্বপ্নের ভেন্যুতেই এবার স্বপ্নের আখ্যান লিখল বাংলাদেশ। কলম্বোর এই পি সারা ওভালে আগের তিন টেস্টেই ছিল ইনিংস ব্যবধানে হার। সেখানেই ধরা দিল শ্রীলংকার বিপক্ষে প্রথম জয়। অনেক বৃষ্টির পর এক মুঠো রোদ্দুরের মতো মধুর জয়। সব মিলিয়ে ১০০ টেস্টে বাংলাদেশের এটি নবম জয়। এর মধ্যে ছয়টিই এসেছে মুশফিকের নেতৃত্বে। ঐতিহাসিক জয়ের পর আবেগে ভেসে যাওয়া অধিনায়ক কৃতিত্ব দিলেন তার সহযোদ্ধাদের। বিশেষ করে বোলারদের। আলাদা করে প্রশংসা করতে ভুললেন না সাকিব ও মোস্তাফিজের।

টেস্ট আঙিনায় প্রায় ১৭ বছরের পথ চলায় বাংলাদেশ এখন যেখানে দাঁড়িয়ে, তার প্রধান তিন স্তম্ভ সাকিব, তামিম ও মুশফিকুর। শততম টেস্টে জয়ের নায়কও এই ত্রয়ী। ম্যাচের বাঁকবদলের সন্ধিক্ষণে ১২৫ বলে সাত চার ও এক ছক্কায় সাজানো ৮২ রানের অমূল্য এক ইনিংস খেলে ম্যাচসেরা হয়েছেন তামিম। টেস্টে নিজের ২২তম ফিফটিকে তিনি নবম শতকে রূপ দিতে পারেননি পেরেরাকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে। কিন্তু যতক্ষণ উইকেটে ছিলেন, থিতু হতে দেননি লংকান স্পিনারদের। তামিমের পায়ের কাজ ছিল দেখার মতো। নিঃসন্দেহে এটি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংস।

এরআগে দলীয় ২২ রানে টানা দুই বলে সৌম্য সরকার ও ইমরুল কায়েসকে ফিরিয়ে বাংলাদেশকে চাপে ফেলে দিয়েছিলেন হেরাথ। সেখান থেকে দলকে টেনে তোলেন তামিমই। ৭৬ বলে ৪১ করে তাকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন সাব্বির। শেষদিকে সঠিক রিভিউ নিয়ে আম্পায়ারের দেয়া আউটের সিদ্ধান্ত পাল্টে দলকে বিপদমুক্ত করেন মুশফিকুর। তার অপরাজিত ২২ রানের ইনিংসটিকেও অমূল্য বলতে হবে। ম্যাচসেরা হতে পারতেন সাকিবও। প্রথম ইনিংসে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া সেঞ্চুরির পাশাপাশি বল হাতে দুই ইনিংস মিলিয়ে নিয়েছেন ছয় উইকেট। ম্যাচসেরার পুরস্কার তামিমের হাতে ওঠায় মন খারাপ করার কথা নয় সাকিবের। তিনি যে পেয়েছেন সিরিজসেরার স্বীকৃতি। তবে সব ছাপিয়ে শততম টেস্টে দলের সোনালি জয়ই সেরা প্রাপ্তি। যে জয় মুশফিক উৎসর্গ করেছেন সমর্থকদের।

শেষদিনের প্রথম সেশনটা শ্রীলংকারই ছিল। আগেরদিন ২৩৮ রানে অষ্টম উইকেট পড়েছিল স্বাগতিকদের। সেখান থেকেই শুরু দিলরুয়ান পেরেরা ও সুরঙ্গা লাকমালের প্রতিরোধ। আট উইকেটে ২৬৮ রান নিয়ে দিন শুরু করা শ্রীলংকা এ জুটিতে ভর করে কালও এগোতে থাকে সাবলীলভাবে। বাংলাদেশের বোলারদের হতাশা বাড়িয়ে লিড ছাড়িয়ে যায় দেড়শ’। অবশেষে দিনের ১৩তম ওভারে এসে ভুল করে বসেন দুই লংকান ব্যাটসম্যান। শুভাশিস রায়ের মিসফিল্ডিংয়ে দ্রুত রান নিতে গিয়ে ভুল বোঝাবুঝিতে রানআউট হয়ে যান শ্রীলংকার আশার বাতি জ্বালিয়ে রাখা পেরেরা। শুভাশিসের থ্রো ধরে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে উইকেট ভেঙে দেন বোলার মেহেদী হাসান মিরাজ। সেই সঙ্গে ভেঙে যায় বাংলাদেশের জন্য গলার কাঁটা হয়ে ওঠা ৮০ রানের নবম উইকেট জুটি। ১৭৪ বলে ঠিক ৫০ রান করে ফেরেন পেরেরা। টেস্টে এটি তার চতুর্থ ফিফটি। জুটি ভাঙার পর আর এক রান যোগ করতেই অলআউট হয়ে যায় শ্রীলংকা। সাকিবের করা পরের ওভারেই উড়িয়ে মারতে গিয়ে মোসাদ্দেকের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন লাকমাল। আউট হন ক্যারিয়ারসেরা ৪২ রানে। ৭৪ রানে চার উইকেট নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের সফলতম বোলার সাকিব। কাল আরও ৫১ যোগ করে ৩১৯ রানে শ্রীলংকা অলআউট হলে চতুর্থ ইনিংসে বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৯১ রান। এর চেয়ে কম রানের পুঁজি নিয়ে দুটি টেস্ট জয়ের কীর্তি আছে লংকানদের। দুটিই গলে, পাকিস্তান ও ভারতের বিপক্ষে। কিন্তু কলম্বোর পি সারা ওভালে সেই পথে হাঁটেনি বাংলাদেশ। হেরাথ ও পেরেরার স্পিন জাল ছিন্নভিন্ন করে ঐতিহাসিক উপলক্ষটা জয়ের আল্পনাতেই রাঙিয়েছেন তামিম, মুশফিকুররা। শততম টেস্টে চার উইকেটের অবিস্মরণীয় জয়ে সাদা পোশাকেও দিনবদলের বার্তা দিয়ে রাখল বাংলাদেশ। গলে প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ হেরেছিল ২৫৯ রানে। দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ শেষে এবার একদিবসী দ্বৈরথ।

আগামী ২৫ মার্চ ডাম্বুলায় বাংলাদেশ-শ্রীলংকা প্রথম ওয়ানডে। একই ভেন্যুতে দ্বিতীয় ওয়ানডে ২৮ মার্চ। এরপর ১ এপ্রিল কলম্বোয় তৃতীয় ও শেষ একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ৪ ও ৬ এপ্রিল কলম্বোয় দুই ম্যাচের টি ২০ সিরিজ দিয়ে বাংলাদেশ শেষ করবে এবারের শ্রীলংকা সফর।

আরও পড়ুন