বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

আমেরিকার জীবন ছেড়ে সিলেটে এসে প্রাণ দিলেন দীপু

151527dipu2_kalerkantho_picসিলেটে শনিবার রাতের জঙ্গি হামলায় হত সিলেটের সুনামগঞ্জের সন্তান পুলিশ পরিদর্শক চৌধুরী আবু কয়ছর দীপুর মৃত্যুতে স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে সিলেটের বাতাস। প্

রতিবেশীরা সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। ধার্মিক, বিনয়ী, নির্লোভ, সাহসী ও সৎ এক পুলিশ অফিসারের মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান সুনামগঞ্জবাসী। ডিভি লটারি পেয়ে আমেরিকার গিয়েছিলেন দীপু। স্থায়ী নাগরিকত্ব এবং নিশ্চিত জীবন ছুড়ে ফেলে দীপু দেশে এসেছিলেন আমৃত্যু জননী জন্মভূমিতে কাটাবেন বলে। জন্মভূমির টানে আভিজাত্যের জীবন পায়ে দলে ফিরে আসলেও জঙ্গিরা চিরদিনের জন্য তাকে থামিয়ে দিয়েছে। মানুষের শান্তির জীবন প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে গিয়েই গত শনিবার দায়িত্ব পালনকালে জঙ্গিদের গ্রেনেডে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

রবিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় চৌধুরী আবু কয়ছর দীপুর শহরের নতুনপাড়াস্থ ‘নিলয় ২’ বাসায় গিয়ে দেখা যায় মানুষের ভিড়। শোকাতুর স্বজনদের সান্ত্বনা জানাতে এসেছেন প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের লোকজন। জড়ো হয়েছেন তার শৈশবের বন্ধুরাও। তাদের সান্ত্বনা পরিবারের বাঁধভাঙা বিলাপ থামাতে পারেনি। শ্রদ্ধেয় বড় ভাইকে হারিয়ে বারান্দায় বিলাপ করছিলেন ছোট ভাই চৌধুরী আবু সায়েদ বাবু। বিলাপের সুরে তিনি জঙ্গি নির্মূলে সরকারকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছিলেন।

নিহতর ছোট ভাই চৌধুরী আবু সায়েদ দীপু বলেন, ২০০৭ সালে ভাইয়া ডিভি পেয়ে পরিবারের চাপে আমেরিকা গিয়েছিলেন। দেশ ছেড়ে তার থাকার ইচ্ছে ছিল না তাই পুলিশ বাহিনী থেকে ছুটি নিয়ে গিয়েছিলেন। পরিবার জোর করে পাঠিয়েছিল। তার কলিগরাও নিশ্চিত জীবন ছেড়ে দেশে না আসার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ৭-৮ মাস থাকার পর তিনি সবকিছু ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। আবার পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়ে সাদামাটা জীবনযাপন শুরু করেন। তিনি বলেন, আমার ভাই একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন। তিনি নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন। জঙ্গিরা ধর্মের নামে আমার ধার্মিক ভাইকে হত্যা করেছে।

চৌধুরী আবু কয়ছর দীপুর প্রতিবেশী খেলার সাথী মোজাম্মেল হক মুনিম বলেন, ছোটবেলা থেকেই শান্ত, ভদ্র, বিনয়ী ও খেলাধুলায় নিমগ্ন এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিল দীপু। আমেরিকায় স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ পেয়েও সে আভিজাত্যের জীবন ছেড়ে দেশে এসে পরিবার ও দেশের মানুষের সেবায় দায়িত্ব পালন করেছে। দেশের পক্ষে কাজ করতে গিয়েই জঙ্গিদের হাতে প্রাণ হারিয়েছে। তার মতো এমন নির্লোভ, দেশপ্রেমিক মানুষ সচরাচর দেখা যায় না।

চৌধুরী আবু কয়ছর দীপুর অপর খেলার সাথী ও জেলা বিএনপির সদস্য নাদির আহমদ বলেন, পুলিশে চাকরি করে খুব কম মানুষই সৎ থাকতে পারে। আমাদের এই বন্ধুটি ছিল একজন আপাদমস্তক সৎ অফিসার। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে গিয়ে যে টাকা পেয়েছিল তা ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করে এবং বেতনের টাকায় সে কোনোরকমে চলত। জীবনে কখনো একটাকা ঘুষ খায়নি। এ কারণে তার বাহিনীর সবাই তাকে শ্রদ্ধা করত। এভাবেই স্বজনদের সান্ত্বনা জানাতে এসে চৌধুরী আবু কয়ছর দীপুর স্মৃতিচারণ করছিলেন সহপাঠী ও খেলার সাথীসহ বন্ধুরা।

চৌধুরী আবু কয়ছর দীপু সুনামগঞ্জ শহরের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক চৌধুরী আছদ্দর আলী মোক্তারের পুত্র। সাত ভাই ও ১ বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ১৯৭১ সনে সুনামগঞ্জ শহরের যে ৫টি বাড়ি পাকিস্তানি হানাদাররা জ্বালিয়ে দিয়েছিল তার একটি ছিল তাদের বাড়ি। সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি কলেজ ও পরবর্তীতে জগন্নাথ ইউনিভার্সিটি থেকে অনার্স মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে ১৯৯১ সনে পুলিশ বাহিনীতে এসআই পদে যোগ দেন দীপু। ২০০৭ সালে তার স্ত্রী ফারহানা আক্তারের সঙ্গে যৌথ ডিভি জয়ের মাধ্যমে পারিবারিক চাপে কিছুদিন আমেরিকায় যান। সেখানে ৭-৮ মাস থেকে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে এসে আবারও পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। ২০১২ সনে জাতিসংঘ মিশনে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করেন। সর্বশেষ সিলেট মেট্টোপলিটন পুলিশের এসবি শাখার সিআইও ১ হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *