বিশেষ প্রতিনিধি: বাংলাদেশে চালের দাম প্রতিদিনই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকারের মজুদ কমে গেছে। কম দামের চাল বেচার সরকার কোনো উদ্যোগ নিতে পারছে না। এই অবস্থায় মরিয়া হয়ে সরকার মিয়ানমার থেকে চাল আমদানির জন্য খাদ্যমন্ত্রীকে পাঠিয়েও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এরই মধ্যে ভারতও বাংলাদেশে আগামী আড়াই মাস চাল বিক্রি নিষিদ্ধ ঘোষণা করলো। প্রতিবেশি এই দুইটি দেশের এই আচরণ সেই ‘ভাতে মারব’ কথাটাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সোমবার জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, দেশটিতে চালের মূল্য যাতে বৃদ্ধি না পায় এবং খাদ্য সঙ্কট সৃষ্টি না হয়, বিষয়টি বিবেচনা করে বাংলাদেশে চাল রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আড়াই মাস চাল রফতানি বন্ধ থাকবে বলে ওই প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। প্রজ্ঞাপনের কপি সব ভারতের সব স্থলবন্দরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
এদিকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যা ও নির্যাতনের কারণে গোটা বিশ্ববাসী যখন দেশটির পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করছেন তখন বাংলাদেশের খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম মিয়ানমার সফর করেন চাল আমদানির চুক্তি করতে। এই সফরের আগেই দেশবাসীর তীব্র সমালোচনা শুরু হলেও ক্ষান্ত হননি তিনি। গিয়েছিলেন বড় আশা করে, কিন্তু তার অর্জন শূন্য। তিনি আশা নিয়ে গেলেও ফিরেছেন খালি হাতে। এখনই দেশটি জি-টু-জি’র ভিত্তিতে চাল রপ্তানি চুক্তি করতে সম্মত হয়নি।
দেশে চালের মজুদ বাড়াতে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামের পর মিয়ানমার থেকে চাল আমদানির চুক্তি করতে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল নিয়ে মিয়ানমার সফরে গিয়েছিলেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। তবে মিয়ানমার সরকার চাল রফতানির বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কোন চুক্তি স্বাক্ষর করেনি।
খাদ্যমন্ত্রীর মিয়ানমার সফরের উদ্দেশ্য ছিলো সরকার টু সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে বছরে ১০ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানির জন্য মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে এমওইউ (সমঝোতা চুক্তি) স্বাক্ষর করা। কিন্তু বাংলাদেশের এমন প্রস্তাবে রাজি হয়নি মিয়ানমার। বছরে ১০ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানির লক্ষ্যে বাংলাদেশি প্রস্তাবে তাৎক্ষণিকভাবে সম্মত হয়নি মিয়ানমার।
উল্লেখ্য, সরকার বছরে অন্তত ৩০ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানির সুযোগ রাখতে চেয়েছিলো। এ লক্ষ্যে ভিয়েতনাম থেকে ১০ লাখ মেট্রিক টন, থাইল্যান্ড থেকে ১০ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানির লক্ষ্যে চুক্তি করেছে সরকার। বাকি ১০ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানির জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি করতে চেয়েছিলো।
এদিকে দেশে চালের দাম সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে দাম। চালের মজুত এখন নাজুক পর্যায়ে আছে। সরকার চাল সংগ্রহে নানা উদ্যোগ নিলেও তা কাজে আসছে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম আরও বাড়বে।
খাদ্য অধিদপ্তরের গুদামে যেখানে ন্যূনতম ছয় লাখ টন চাল থাকার কথা, সেখানে আছে মাত্র সোয়া তিন লাখ টন। দেশের চালকলমালিক ও কয়েকটি দেশের সঙ্গে একের পর এক চুক্তি করেও খাদ্য মন্ত্রণালয় মজুত বাড়াতে পারেনি। বেসরকারি চালকলমালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে কত চাল আছে, তা জানার জন্য ২০১৩ সালে খাদ্য মজুত নিয়ে একটি আইন করেছিল সরকার। ওই আইন অনুযায়ী প্রতি মাসে বেসরকারি খাতের মজুতের হিসাব খাদ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে থাকার কথা। কিন্তু চার বছরেও ওই হিসাব নিতে পারেনি তারা। খাদ্যমন্ত্রী ও খাদ্যসচিব বলেছেন, মজুতের পরিমাণ তাঁরা জানেন না। এই পরিস্থিতিতে যখন চালের দাম প্রতি সপ্তাহে বাড়ছে, তখন খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নিজেরাই বিস্মিত। দায় এড়িয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় এ জন্য সরাসরি দুষছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। তাদের দাবি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তদারকির অভাবেই চালের দাম এভাবে বেড়েছে।
তবে দেশের অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সংগঠনগুলো চালের মূল্যবৃদ্ধির জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়কে দায়ী করছে। তারা বলছে, সরকারের চালের মজুত কমে গেলে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দেবেন, এটাই সাধারণত ঘটে থাকে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরকারি মজুত বাড়ানো সবচেয়ে জরুরি।
চালের দাম ৪০ টাকার ওপরে উঠলেই দেশের প্রায় আড়াই কোটি অতি দরিদ্র মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বল্পমূল্যে খোলাবাজারে চাল বিক্রি কার্যক্রম চালু করা হয়। কিন্তু সরকারি মজুত পাঁচ মাস ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকার কারণে খাদ্য মন্ত্রণালয় এখনো ওএমএস চালু করতে পারেনি। নিয়মিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো চালাতেই তারা হিমশিম খাচ্ছে। ১০ টাকায় চাল বিক্রির জন্য দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচি চালু হওয়ার কথা থাকলেও তা এক মাস পিছিয়ে দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৬ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় দুই মাসে ৩ লাখ ৬৩ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে। চালের সংকট মোকাবিলায় ঈদের আগে সরকার দুই দফায় আমদানির শুল্ক কমিয়ে ২৮ থেকে ২ শতাংশে নিয়ে এসেছে। এ ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির জন্য বাকিতে ঋণপত্র খোলার সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রভাব চালের বাজারে পড়ার কথা। কিন্তু ইতিবাচক কোনো প্রভাব দেশের চালের বাজারে দেখা যাচ্ছে না।



Leave a Reply