খ. আলম।
আরেফিন স্যারের পরিমিতিবোধ সুবিদিত। আমি তাঁর পরিমিতিবোধের একজন স্তাবক! তাই এই লেখার সঙ্গের ছবিটি দেখে প্রথম দিন খানিক বিব্রতবোধ করি। কারণ বহুবিধ: এক. ছবিটির লোকেশন ভিসি অফিস (বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহীর কার্যালয়) এবং বলাবাহুল্য, ওটি একটি পাবলিক প্লেস; দুই. ভিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী এবং হাতলে উপবেশনকারী তাঁর প্রতিষ্ঠানের এমপ্লয়ি; তিন. হাতলে উপবেশনকারী তাঁর সাবেক ছাত্রী; চার. এটি পারিবারিক পরিসরে তোলা অনানুষ্ঠানিক কোনো মুহুর্ত নয়, ছবিটিতে রয়েছেন আরও জনা পাঁচেক পদস্থ মুখ (ফ্যাকাল্টি’র ডীন, তাঁর নিজ বিভাগের চেয়ার, আরেকটি বিভাগের তৎকালীণ চেয়ার, তাঁর নিজ চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী প্রমুখ।)।
বঙ্গীয় মূল্যবোধ ও সম্পর্ক চর্চার জায়গা থেকে ছবিটির দিকে তাকালে অপ্রস্তুতবোধ না করার কোনো কারণ নেই।
প্রসঙ্গত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার এক সহকর্মী ছবিটি দেখে অপ্রস্তুতবোধ করলে, ফেইসবুকে ইনবক্স করে প্রথমে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সেও বহুদিন আগের কথা। যখন কি না, হাতলে উপবেশনকারী ও তার সহ-লেখকের গ্রন্থের (গণমাধ্যমের চাণক্য কৌশল) মোড়ক উন্মোচন করেন দেশের জনৈক মন্ত্রী বাহাদুর, বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামান্য ভিসি, চ্যানেল প্রধান নির্বাহী প্রমুখ! উন্মোচন কর্মটি সম্পন্ন হয় ভিসি অফিস সংলগ্ন সভাকক্ষে। সত্যিই চাণক্য কৌশলই বটে!
ফ্ল্যাশব্যাক : দুই
আরেফিন স্যার তখন সদ্য ভিসি হয়েছেন। সময়টা সম্ভবত ২০০৯ এর মাঝামাঝি। ভিসি অফিসে স্যারের রুমে ঢুকতেই শুনতে পেলাম স্যার তাঁর একজন স্টাফকে ডেকে নির্দেশ দিচ্ছেন : Erasmus Mundus স্কলারশীপের সার্কুলারটা হাতলে উপবেশনকারীনির চ্যানেলে ফ্যাক্স করে পাঠিয়ে দিতে।
অামি অবাক হলাম। কারণ : ১. স্যার সার্কুলারটা তো আমাদের বিভাগে পাঠাতে পারতেন যেনো আগ্রহী সবাই এপ্লাই করতে পারে; ২. তিনি এমন একজনকে স্কলারশীপের সার্কুলারটা পাঠাচ্ছেন যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্থায়ী চাকুরি রেখে বিভিন্ন চ্যানেলের হেড অব কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স কিংবা অন্য কোনো পদে বছরের পর বছর ধরে দায়িত্বপালন করে বেড়াচ্ছেন! যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তিনি আইন বহির্ভূত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরনের জন্য তিরস্কার করবেন, সেখানে তিনি একটি চ্যানেলের এড্রেসে ফ্যাক্স করতে বলে কার্যত তার কর্মকান্ডকে পুরস্কৃত/উৎসাহীত করছেন। সপ্তাহের ১ দিন বিভাগে এসে দায়সারাভাবে শিক্ষার্থীদের ক্লাশ নিয়ে নেয়া আর মাসে-দু’মাসে এক-আধটা বিভাগীয় মিটিং এ হাজিরা দেয়ার নাম কি শিক্ষকতা?
পাবলিকের টাকায় চলা বিশ্ববিদ্যালয়কে লাটে তুলবো অথচ তার ইমেজ-আইডেন্টটিটি ব্যবহার করে চ্যানেলের পারপাস সার্ভ করা তো এপ্রিশিয়েটেড হওয়া উচিত নয়। অবশ্য যদ্দূর বুঝি, আরেফিন স্যারের কাছে বরাবরই একাডেমিক কাজের চাইতে মিডিয়ায় অবস্থান করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলি – মাস্টার্স শেষে ২০০৬ সালে প্রথম আলোতে সাব-এডিটর হিসেবে জয়েন করি। স্যারের সাথে দেখা হলে জানাই যে রিপোটিং-এ না গিয়ে, সাব-এডিটিং-এ গেলাম কারণ তাতে পড়া-শোনার করার জন্য আরও বেশি সময় পাওয়া যাবে।
প্রতিক্রিয়ায় তিনি বললেন, আর কতো পড়বে, অর্নাস-মাস্টার্স তো পড়লেই, এখন সাংবাদিকতা করো, জীবনে অনেক পড়তে পারবে। পরে ২০০৮ সালে বিবিসি’র জব ছেড়ে লেকচারার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করি। নিজের শক্তি-সামর্থ্যের সব্বোর্চ দিয়ে আমার কাঙ্ক্ষিত জায়গাটিতে সময় দিচ্ছি, ঠিক তেমনি একসময় স্যার বললেন, তুমি বিবিসি’র চাকরিটা ছাড়লে কেনো, পাশাপাশি করতে পারতে তো। এখন বুঝতে পারি, একজন ফুলটাইমার ডেডিকেটেড বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের চাইতে ওনার কাছে সংবাদমাধ্যম সংশ্লিষ্টের মূল্য ও উপযোগ অনেক বেশি! হয়তো সে কারণেই, অধিকাংশ প্রো-একাডেমিক, মেধাবী ও স্বাধীনচেতা বিভাগীয় সহকর্মী-শিক্ষার্থীদের সাথে স্যারের এই ঐতিহাসিক দূরত্ব!
ফ্ল্যাশব্যাক : তিন
ক’দিন আগে জানতে পারলাম হাতলে উপবেশনকারী আরেফিন স্যারের সুপারভিশনে পিএইচডি ডিগ্রী শুরু করেছেন। সম্পর্ক বরাবরই সোস্যাল ডিসকোর্স-এর অংশ। কে কার প্রতি বিশ্বস্ত, কে কাকে কাছে টানে, কাকে দূরে ঠেলে দেয় ইত্যাদি সোস্যাল মিনিং ক্রিয়েট করে, আমাদের নিয়ত বার্তা দেয়। তাই তো প্রফেসর রাজ্জাককে বলতে শুনি, আফনে কাগর লগে চলেন হেইডাও ইমপরটেন্ট। বিশ্ববিদ্যালয় অনিয়ম এবং জবাবহীনতার এক ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এখানে মানসম্পন্ন উচ্চতর ডিগ্রী, আরটিক্যাল, পাবলিকেশন্স, কনফারেন্স পেপার-প্রেজেন্টেশন ইত্যাদির কানা-কড়ি মূল্য নেই। প্রোমোশনকালীণ সময় নিয়ম রক্ষার তাগিদে আরটিক্যাল সংখ্যাটি কেবল গুনে দেখা হয়; মাঝে মাঝে তারও ব্যতয় ঘটে। কি আরটিক্যাল লেখা হলো, কোত্থেকে ছাপা হলো ইত্যাদি ধর্তব্যের বাইরে। অামেরিকার সাথে বাংলাদেশের কমপেয়ার চলে না; এমন কি ঢালাও কমপেয়ার সমীচিনও নয়। ওসব মাথায় রেখেই বলছি, এখানে আমার বিভাগের বয়স অর্ধ-শতকেরও ওপর অথচ এই মুহূর্তে অধ্যাপক মাত্র ১ জন। পাবলিকেন্সের (sole authored book) অভাবে ষাটোর্ধ্ব ৮/১০ শিক্ষক অধ্যাপক না হয়েই দিন কতক বাদে রিটায়ারমেন্টে যাবেন।
অার ”পিএইচডি ছাড়া শিক্ষক” – শুনলে ওরা ঠিক বোঝার চেষ্টা করে এটা ঠিক কোন গ্রহের কথা বলছি! বিভাগের আন্ডার গ্র্যাড ডিরেক্টর ড. নাভিতা জেম্স। তিনি ডেভেলপিং কান্ট্রির কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একটি একচেইঞ্জ প্রোগ্রাম করতে আগ্রহী। আমি ওনাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বিভাগের সাথে প্রোগ্রামটি করার জন্য পুশ করতে থাকি। তিনি আগ্রহী হয়ে আমার বিভাগের ওয়েব সাইটটি দেখতে চাইলেন। আমি দিলাম। তারপর থেকে উনি আর কোনো দিন একচেইঞ্জ প্রোগ্রাম নিয়ে আমার সাথে আলাপ তোলেন না। এমনকি আমি আলাপ তুললেও বিষয়টি সযত্নে এড়িয়ে যান। কারণটা আমি বুঝি, ২/১ জন শিক্ষক ছাড়া কেউই বিভাগীয় ওয়েব সাইটে নিজেদের কাজ সাইট করেন না। রিচার্স ইন্টারেস্ট, এক্সপারটিজ, এচিভম্যান্ট ইত্যাদি কিছুই নেই ওতে। এমনকি অনেক ফ্যাকাল্টির ছবিটি পর্যন্ত নেই ওয়েবসাইটে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড-এ মাস্টারির জন্য ওসব নিষ্প্রয়োজন!
ফ্ল্যাশব্যাক : চার
সলিম ভাই (ড. সলিমউল্লাহ খান) প্রায়ই মশকরা করে বলতেন, একটা বই/আরটিক্যাল থেকে টুকলে সেটা চুরি; আর দুই বা তার বেশি বই থেকে টুকলে সেটা গবেষণা। অভিযুক্ত শিক্ষকদ্বয় ফুকোর ৮ পাতার আরটিক্যালটির মাত্র ৫ পাতা মেরেছেন! চাইলে আস্ত ফুকোকেই তো মারতে পারতেন! ভাগ্যিস তিন পাতা রেহাই দিয়েছেন! তাদের কষ্ট করে নিজেদের ১৭/১৯ পাতার আরটিক্যালের বাকি পেজগুলো তো ভরাট করতে হয়েছে। নিশ্চয়ই ওনাদের অন্য কাউকে মারতে হয়েছে! তাহলে, একডিং টু সলিম ভাই, তারা তো গবেষণাটাই করলেন! জার্নালের এডিটর হচ্ছেন ফ্যাকাল্টির ডীন। ডীন একটি একাডেমিক পদ। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ডীন পদটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানে রূপান্তরিত হয়েছে! একাডেমিক উন্নতির চাইতে ভোটার তুষ্টিই ডীন মোহদয়ের একমাত্র এজেন্ডা। লক্ষ্য, দুই বছর পর পর নির্বাচনে জিতে আসা। মাসে-দুই মাসে কোনো একটি ব্যাংকের পরীক্ষায় একটি খ্যাপের কাজের মাধ্যমে তিন হাজার টাকার একটা প্যাকেজ ধরিয়ে দিয়ে ভোটার ঠিক রাখার পলিসি বাস্তবায়ন করেছে ডীন অফিস।
জার্নাল একটা বের হয় বটে, কারণ জার্নাল বের না হলে ভোটারদের প্রমোশন হবে কি করে! একবার এক আরিটিক্যাল নিয়ে গেলাম ডীন মোহদয়ের কাছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, রিভিয়্যুার হিসেবে কাকে দিলে ভালো হয়? অামি বললাম, তাতো বলতে পারবো না, তবে ইনি ইনি এই এরিয়ায় কাজ করেন। এই বলে চলে এলাম। খানিক বাদে আমার কাছে ডীনের ফোন। বললেন, ওমুককে দিলাম। তারও খানিক বাদে ওমুক (রিভিয়্যুার) আমাকে ফোন দিয়ে বললেন, অাপনার লেখাটা পাইছি, সাত দিনের মধ্যে দিয়ে দেবো! এবার বোঝেন, এডিটর আর রিভিয়্যুারের রিসপন্সসিবিলিটি! ঐ একই জার্নালে আরেকবার আমার একটি আরটিক্যাল রিভিয়্যুারের কমেন্ট-সাজেশনসহ হুবহু ছেপে দিয়েছে। পরে ডীনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি পরবর্তী ইস্যূতে পুনরায় ঐ অাটিক্যাল ছেপে তার পাপমোচন করেছেন।
প্রস্তাব : পাঁচ
কথিত উন্নত দেশের উদাহরণে যাচ্ছি না, শুধু আহমেদ কামাল স্যারের কথাটা বলি। স্যার হাস্যচ্ছলে প্রায়ই বলতেন, আমি কোনো দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে কোথাও জব করবো না। কারণ, এর চাইতে আরামের চাকরি পৃথিবীর অার কোথাও নেই। শিক্ষকরা এখানে নিরন্কুশ স্বাধীনতা ভোগ করেন। নিরন্কুশ স্বাধীনতার কনসেপ্ট বিশ্বের কোথাও নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অতি-অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং বাৎসরিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। মূল্যায়ন হতে হবে কমপক্ষে দুই স্তরে : ১. শিক্ষার্থী ইভালুয়েশন; ২.বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মূল্যায়ন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি দল-নিরপেক্ষ ও স্বাধীন কমিটি গঠন করতে পারেন যার সদস্যবৃন্দ নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিবর্তিত হবে। প্রতিবছর একজন শিক্ষককে তাঁর আমলনামা (ডিগ্রী, পাবলিকেশন্স, কনফারেন্স পারটিসিপেশন, স্টুডেন্ট ইভালুয়েশন ইত্যাদি) পেশ করতে হবে। উক্ত আমলনামার ভিত্তিতে প্রমোশন মিলবে। আদারওয়াইজ, শুধু মেধা-যোগ্যাতা-দক্ষতায়ই নয় বরং প্রমোশনেও বনসাই হয়ে থাকতে হবে অকর্মণ্যদের! আর, লেকচারার থেকে অ্যাসিটেন্ট প্রফেসর হতে হলে অবশ্যই পিএইচডি ডিগ্রী থাকতে হবে। প্রস্তাবগুলো তাৎক্ষণিক, তবে তা নিয়ে সবিস্তর/সুচিন্তিত ভাবনা এবং উদ্যাগ নেয়া অত্যন্ত জরুরি।
লেখক: শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



Leave a Reply