বিশেষ প্রতিনিধি: বাংলাদেশের শাসক দল আওয়ামী লিগের এক সময়ের খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে ইতিহাসে স্থান রয়েছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের। এই দলের সঙ্গে আওয়ামী লিগের তথা দলটির এখনকার সভানেত্রী শেখ হাসিনার সখ্যতার কথা সবাই কমবেশি জানেন। এমন একটি প্রেক্ষাপটে রাহুল গান্ধি কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ার পর পক্ষকাল পেরিয়ে গেলেও আওয়ামী লিগ বা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখনও কোনো শুভেচ্ছা বার্তা বা অভিনন্দন বাণী জানাননি। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাজনীতি সচেতন মানুষের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি বা তাদের নেত্রী খালেদা জিয়াও শেখ হাসিনার মতোই চুপ করে আছেন।
রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের সভাপতি হলেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান কোনো রাজনৈতিক দলই তাঁকে আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন জানায়নি। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রাহুল গান্ধীকে শুভেচ্ছা না জানানোর ঘটনায় অবাক হয়েছেন অনেকেই গত ১৬ ডিসেম্বর উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৪৭ বছর বয়সী রাহুল গান্ধী।
রাহুল গান্ধির সভাপতি হবার পর তিনি অভিনন্দনে ভাসছেন। শুধু দেশে নয়, বিদেশ থেকেও তাঁর জন্য অভিনন্দন বার্তা এসেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন থেকে শুরু করে, পাকিস্তান পিপলস পর্টি পর্যন্ত অভিনন্দন জানিয়ে তাঁর নেতৃত্বের নবযাত্রার শুভকামনা করেছেন। শুধু বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল রাহুল গান্ধির অভিষেকে কোনো শুভেচ্ছা বা অভিনন্দন জানায়নি। অবশ্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধীকে টেলিফোনে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বলে ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে। তবে এটাকে স্রেফ ব্যক্তিগত বার্তা বলেই মনে করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতীয় কংগ্রেসের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। দুটি দলই গ্রামীণ এবং দরিদ্র মানুষের পক্ষে রাজনীতি করে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে ভারত যে সহযোগিতা করেছিল, তা কংগ্রেস সভাপতি শ্রীমতি ইন্দীরা গান্ধীর উদ্যোগেই। ৭৫ এর ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর ইন্দিরা গান্ধীর অভিভাবকত্বেই শেখ হাসিনা দিল্লিতে রাজনৈতিক আশ্রয় পান। ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেন শেখ হাসিনাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হলে, কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা এবং তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি তাঁকে এবং বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার উদ্যোগ নেন, সে কথা প্রণব বাবু তার বইয়েই লিখেছেন।
ভারতের সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনে মোদির জয়জয়কারের পর সর্বশেষ গুজরাট এবং হিমাচলেও নরেন্দ্র মোদি তাঁর ক্যারিশমা অব্যাহত রেখেছেন। যদিও ভারতের প্রগতিবাদীরা নরেন্দ্র মোদিকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে মনে করেন। প্রগতিশীল এবং মুক্ত চিন্তার জনগণের মধ্যে মোদিবিরোধী ক্ষোভ ক্রমশ পুঞ্জিভূত হচ্ছে। তারপরও বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রধান সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলেছে। বিজেপির সঙ্গে আওয়ামী লিগ সম্পর্ক আরও বাড়াচ্ছে, যা দল দুইটির শীর্ষ নেতাদের কথাতেও স্পষ্ট। দুই দলের নেতাদের সফর বিনিময়ও হচ্ছে। তাই কংগ্রেস এখন আওয়ামী লিগের কাছে ব্রাত্য।
গত ২০১৪ এর ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় সংসদের বিরোধীদের ছাড়া ভোটারবিহীন এক তরফা নির্বাচনে সমর্থন দেয় ভারতের তখনকার কংগ্রেস সরকার। ওই নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার ব্যাপারে সোনিয়া গান্ধি ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এরপর ২০১৪ এর এপ্রিলে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপির বিপুল বিজয়ের পর বাংলাদেশের বিরোধী দল বিএনপি আশা করেছিল এবার ভারত আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেবে। কিন্তু বিএনপিকে হতাশ করে নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনার সঙ্গে সুসম্পর্ক আরও গভীর করেন। তিনি প্রথম সফর হিসেবে বাংলাদেশে এসে শেখ হাসিনার সঙ্গে বন্ধন দৃঢ় করার ঘোষণা দেন।
ঢাকার রাজনৈতিক মহলে বিশেষত মুক্তিযুদ্ধকে যারা ধারণ করেন সেই অংশের অনেকেই মনে করছেন, বিজেপির সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কের কারণেই কী রাহুলকে এড়িয়ে গেল আওয়ামী লিগ? কারণ ভারতের রাজনীতির খোঁজ খবর যাঁরা রাখেন তাঁরা জানেন, নরেন্দ্র মোদি এবং রাহুল গান্ধীর একটা ব্যক্তিগত দ্বৈরথ রয়েছে। রাহুল কংগ্রেসের সভাপতি হলে মোদি তাঁকে ‘আওরঙ্গজেব’ বলে খোঁচা মারেন। রাহুলকে অভিনন্দন জানালে পাছে মোদি বিরক্ত হন এজন্যই কী চুপ আওয়ামী লীগ আর বিএনপি? হয়তো আগামী নির্বাচনে দুদলেরই মোদির আশীর্বাদ দরকার। মনে রাখা দরকার, গত বছর অক্টোবরে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে শেখ হাসিনা সভাপতি পুননির্বাচিত হলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধী তাঁকে অভিনন্দন জানান।
(ছবিটা পুরনো, শেখ হাসিনার ভারত সফরে নয়াদিল্লিতে তোলা)



Leave a Reply