বিশেষ প্রতিনিধি: ব্যক্তিগত সফরে ঢাকা আসাকে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ‘রথ দেখা ও কলা বেচা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশ তার শ্বশুড়বাড়ি হলেও আসলে এটাও তো বিদেশ। তাই বাংলাদেশ সফর নিয়ে এক কথায় বলা যায় রথ দেখা ও কলা বেচা দুটোই হয়ে যাবে।”
প্রণব এবার বাংলাদেশে এসেছেন মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে। রোববার বিকেলে ঢাকা এলেও সোমবার সকাল থেকে তার সফরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এদিন সকালে ঢাকার ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাদুঘরে তার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে দিন শুরু করেন। দুপুরে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক ও মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। এরপর বিকেল তিনটার দিকে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাংলা একাডেমিতে। সেখানে ঢাকায় আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনের বক্তব্য রাখেন তিনি।
বাংলাদেশের চমকপ্রদ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী বলেছেন, বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান। বৈঠকের শুরুতেই দুই নেতা নিজেদের মধ্যে কুশল বিনিময় করেন, বলেন প্রেস সচিব। প্রণব মুখার্জী তাঁর অবসর সময় কাটানোর বৃত্তান্ত তুলে ধরে বলেন, বই পড়েই এখন তাঁর সময় কাটছে। তিনি বলেন, ‘আমি জীবনের দীর্ঘ সময় রাজনীতি করেছি। ভারতের সংসদে এবং রাষ্ট্রপতির পদের মত সাংবিধানিক পদে ছিলাম। অবসর গ্রহণের পরে আমার অফুরন্ত সময় পড়ার জন্য।’ তিনি ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশে তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের কথাও স্মরণ করেন।
মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এবার পাচ্ছেন সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি, যাবেন মাস্টারদা সূর্য সেনের জন্মভূমি চট্টগ্রামের রাউজানেও। বুধবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হবে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উন্নয়নে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ভোটের বছরে তার এই সফরকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন রাজনীতির বিশ্লেষকরা। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৩ সালের মার্চে বাংলাদেশ সফরে এসে স্ত্রীকে নিয়ে নড়াইলে শ্বশুরালয়ে ঘুরে গিয়েছিলেন প্রণব। সে সময় বঙ্গভবনে এক অনুষ্ঠানে তার হাতে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ তুলে দেন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতা প্রণব ছিলেন রাজ্যসভার সদস্য। ভারতের অনেক রাজনীতিকের মত তিনিও মুক্তিকামী বাঙালির পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।
রোববার রাতে ঢাকার ভারতীয় হাই কমিশনে তার জন্য যে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, সেখানে বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সবাই উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকরাও। অনুষ্ঠানে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতির বক্তব্য ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু তার মধ্যেই তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্ট করে দেন। প্রণব বলেন, ২০১২ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর তার প্রথম বিদেশ সফর ছিল এই বাংলাদেশে; অবশ্য যদি তার প্রয়াত স্ত্রী শুভ্রা মুখোপাধ্যায়ের জন্মভূমিকে ‘বিদেশ বলতে হয়’। এখনও যে বাংলাদেশের সঙ্গে তার সেই সম্পর্ক অটুট, সে কথা তিনি বুঝিয়ে দেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত মন্ত্রিসভার সদস্যদের সবাইকেই ব্যক্তিগতভাবে ‘চেনার’ কথা জানিয়ে। সংক্ষিপ্ত আলোচনার সঙ্গে অনুষ্ঠানে ছিল গানের আয়োজন। পরে উপস্থিত মন্ত্রিসভার সদস্য এবং অন্যদের সঙ্গে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতির ছবিও তোলা হয়।
পাঁচ দিনের এই সফর শেষে বৃহস্পতিবার সকালে তার ভারতে ফেরার কথা রয়েছে।
এদিকে ঢাকায় আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাস রচনায় লেখক-কবি-সাহিত্যিকদের অবদানের কথা বললেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। সোমবার বিকালে বাংলা একাডেমিতে সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপ্রধান। বিকাল ৩টায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন প্রণব। মঞ্চে আসীন হয়ে তিনি কৃতাঞ্জলিপুটে গ্রহণ করেন অভ্যাগতদের সংবর্ধনা।
প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেন, “যুগ যুগ ধরে মানব সভ্যতার ইতিহাস এ কথা বলে গেছে যে হিটলার, মুসোলিনিরা নয়, সভ্যতার ইতিহাস নির্মাণ করে গেছেন প্রফেট, ক্রাইস্ট, বুদ্ধা। দিগ্বিজয়ী বীরেরা নয়, সভ্যতার ইতিহাসের দিক নির্মাণ করেছেন লেখক-কবি-সাহিত্যিক তথা শিল্পীরা। পরীক্ষা পাসের জন্য দিগ্বিজয়ী বীরদের নিয়ে পড়াশোনা করা যায়, পাসের পর তা বেমালুম ভুলে যাই। কিন্তু শিল্পীর ছবি, কবির কবিতা বা প্রিয় উপন্যাস কখনো ভোলা যায় না কি? যে গান, সানাই বা সরোদের সুর আমাদের প্রিয়, তা কখনও ভুলতে পারি আমরা?”
নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজনে এই সাহিত্য সম্মেলনে আমন্ত্রণ পাওয়ার কথাও জানান সম্মেলনের সাবেক সভাপতি প্রণব। তিনি বলেন, “আমি তো পাঠক, একজন দর্শক। আমি স্রষ্টা নই, সৃষ্টিকর্ম তো আমার নেই। এই আন্তর্জাতিক সাহিত্যের মহামেলায় আমার কাজটা কী হবে? বীরভূমের গ্রামের ভাষায় রাজমিস্ত্রীদের সিমেন্ট, বালু, মসলা ইত্যাদি এনে দেওয়া লোকদের বলা হয় যোগাই। এই সম্মেলনে আমার কাজটা এখানে অনেকটা যোগাইয়ের মতো।”
১৯৬৯ থেকে ২০১২, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আমি খুব বেশি পড়ার সুযোগ পাইনি। ২৫ বছর মন্ত্রী ছিলাম। সরকারি কাজ, সংসদীয় কাজের ঠেলায় পড়ার সময় পাইনি। ৩৩০ কক্ষের রাষ্ট্রপতি ভবনে এসে ভাবলাম- এখানে কী করব? প্রধানমন্ত্রী ফাইল পাঠাবেন, আইন প্রণয়ন করবেন সাংসদরা, আমি তাদের পরামর্শ দেব। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা সেখানে কম। বছরে একদিন সাংসদদের ডেকে বক্তৃতা দেব, সেখানে দাড়ি-কমা সবটাই মন্ত্রিসভার তৈরি। রাষ্ট্রপতিকে বলতে হবে, মাই গভর্নমেন্ট। তিনি বলেন, “কিন্তু যেটা হল, রাষ্ট্রপতি ভবনে আধুনিক ভারতবর্ষের প্রচুর কাগজপত্র, অনেক দুষ্প্রাপ্য গোপনীয় রেকর্ড, পড়বার জন্য প্রচুর উপাদান পেয়ে গেলাম। এসব পড়তে গেলে তো এক প্রেসিডেন্সিয়াল টার্মে হবে না, তিনটা টার্ম লাগবে। তার আগেই ঈশ্বরের সমন এসে যাবে। আমি ভাবলাম, যতটা পারা যায়, আমি পড়ব।”
৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে শহিদদের স্মৃতি স্মরণে তিনি বলেন, “হাজারো বছরের বাঙালি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা ও সাহিত্যকে তারা লুট হয়ে যেতে দেননি। আগ্রাসকদের হাতে ধ্বংস হয়ে যেতে দেননি। সংস্কৃতিকে তারা রক্ষা করেছেন। মাতৃভাষার অধিকারকে প্রতিষ্ঠায় বুকের রক্ত ঢেলেছে বাঙালি, তারপর অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে বাংলাকে আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে বাঙালিরা। এ দেশে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন হবে না তো কোথায় হবে?”



Leave a Reply