নিজস্ব প্রতিবেদক: মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্তি হওয়ার বয়স আরও ছয় মাস কমিয়ে দিল সরকার। এখন একাত্তরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত যাদের বয়স কমপক্ষে সাড়ে ১২ বছর ছিল, তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচনায় নেবে সরকার।
মুক্তিযোদ্ধা বিবেচনার বয়স পুনর্নির্ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বুধবার পরিপত্র জারি করেছে বলে মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, “পরিপত্র অনুযায়ী এখন থেকে মুক্তিযোদ্ধা বিবেচনার বয়স ৩০ নভেম্বর ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে কমপক্ষে ১২ বছর ৬ মাস হতে হবে।”
মুক্তিযুদ্ধকালীন ১৩ বছর বয়সের নিচের কেউ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবে না জানিয়ে এর আগে পরিপত্র জারি করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ওই আদেশে বলা হয়েছিল, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণায় সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যেসব ব্যক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হবেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার বয়স ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তারিখে ন্যূনতম ১৩ বছর হতে হবে।”
আগের পরিপত্রটি সংশোধন হওয়ার ফলে এখন সাড়ে বারো বছর বয়সেই মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যাবে।
মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কত- ঠিক হয়নি ৪৫ বছরেও
এদিকে স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও নিরূপণ হয়নি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেছে এই বীর সেনানীদের নামও। তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হালনাগাদ করছে। এছাড়া একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনী এবং রাজাকারদের হাতে নির্যাতিত নারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার নতুন সংজ্ঞা ঠিক করে সরকার।
মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে অন্তর্ভুক্তির জন্য নতুন করে ১ লাখ ২৩ হাজার আবেদন পাওয়া গেছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেলন হোসেন বলেছেন, “অনেক অভিযোগ পেয়েছি। যুদ্ধ না করেও ভুল তথ্য দিয়ে অনেকে সনদ নিয়েছেন। এই অপকর্মের চক্র গড়ে উঠেছিল, আমরা ভুয়া সনদগুলো বাতিল করছি। আগুন লাগলে আগে আগুন নেভাতে হবে, পরে খোঁজ নেওয়া হবে কে আগুন দিয়েছিল।” মুক্তিযোদ্ধা সনদধারী প্রায় ৫০ হাজার জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, উপজেলা পর্যায়ের কমিটি দিয়ে এগুলো যাচাই করা হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা চূড়ান্তে কোনো রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী দেখা হবে না জানিয়ে মোজাম্মেল বলেন, “কেউ জামায়াত করলে তো তাকে আমরা বাদ দিতে পারব না। আবার কেউ আওয়ামী লীগ করছে বলেই তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।”
সেনাবাহিনীর সংরক্ষিত দলিলের তথ্যানুযায়ী, স্বাধীনতার পর কয়েকজন সেক্টর কমান্ডার ও সাব-সেক্টর কমান্ডারদের প্রকাশিত বইয়ে নিয়মিত বাহিনীর ২৪ হাজার ৮০০ এবং অনিয়মিত বাহিনীর ১ লাখ ৭ হাজারসহ মোট ১ লাখ ৩১ হাজার ৮০০ জনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে গণ্য করা হয়।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ১৯৯৮ সালের আগ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের চার-পাঁচটি তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও তা চূড়ান্ত রূপ পায়নি।
মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরী বিভিন্ন সেক্টরের তথ্য নিয়ে একটি তালিকা ভলিউম আকারে প্রকাশ করেন, যাতে ৭০ হাজার ৮৯৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে তালিকাভুক্ত করা হয়। বাকি ৬০ হাজার ৯০৪ জন কোন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবেন তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
কর্মকর্তারা জানান, ১৯৯৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক মমিনউল্লাহ পাটোয়ারীর মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ প্রথমবারের মতো একটি তালিকা করে।
ওই তালিকাটি মুক্তিযোদ্ধা সংসদে ‘লাল বই’ নামে সংরক্ষিত রয়েছে। বর্তমানে এই তালিকায় ১ লাখ ৫৪ হাজার জনের নাম থাকলেও সবার নামে গেজেট প্রকাশিত হয়নি বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী। এই ‘লাল বই’য়ে আমিন আহমেদের তালিকার বেশিরভাগের নাম অন্তর্ভুক্ত হলেও কিছু নাম বাদ পড়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এর আগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিগত চারদলীয় জোট সরকার মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে দায়িত্ব না দিয়ে তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব সা’দত হুসাইনের নেতৃত্বে চারজন সচিব ও খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি জাতীয় কমিটি করে। এই কমিটির দায়িত্ব ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা তৈরি করে সরকারকে সুপারিশ করা, যাদের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। ওই জাতীয় কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ২০০২ সালের ৪ মার্চ সশস্ত্র বাহিনীর ৩৯ হাজার মুক্তিযোদ্ধার নামে ‘বিশেষ গেজেট’ এবং ১ লাখ ৫৯ হাজার মুক্তিযোদ্ধার নামে ‘গেজেট’ প্রকাশ করা হয়। ওই সময় বিএনপি সরকার নতুন করে আরও ৪৪ হাজার জনকে মুক্তিযোদ্ধার সনদ দিয়ে মোট ১ লাখ ৯৮ হাজার জনের নামে গেজেট প্রকাশ করে।
চারদলীয় জোট আমলে ৭২ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে তালিকায় সন্নিবেশিত করা হয় বলে জাতীয় সংসদে অভিযোগ তোলেন ২০০৯-২০১৪ সালের তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম। এরপর ২০০৯ সালের ১৩ মে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে বিএনপি সরকারের মতো তাজুল ইসলামও জেলা প্রশাসক ও ইউএনওদের নিয়ে কমিটি করে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব দেন। মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করে ডিসি-ইউএনওদের কাছে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দুই বছরেও ডিসি-ইউএনওদের নেতৃত্বের কমিটি তালিকা যাচাইয়ের কাজ শেষ করতে না পারায় মন্ত্রণালয় এবং এ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির হস্তক্ষেপে অভিযুক্ত ৬২ হাজার জনের তালিকা এবং নতুন করে আরও ১ লাখ ৪৫ হাজার জনের নাম অন্তর্ভুক্তির তালিকা যাচাই-বাছাইয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এরপর গত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০-২০১২ সালে আরও ১১ হাজার জনকে মুক্তিযোদ্ধার সনদ দিয়ে মোট দুই লাখ নয় হাজার জনের নাম তালিকাভুক্ত করে।
বর্তমান ক্ষমতায় আসার পর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আলোচনা শুরু হলে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের বৈঠকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর কয়েক সচিবের সঙ্গে কয়েকশ’ সরকারি কর্মকর্তাসহ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ ও গেজেট বাতিল করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, যা চলমান রয়েছে।
তবে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ মুক্তিযোদ্ধাদের যচাই-বাছাই ও সংখ্যা সংক্রান্ত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে এ সংক্রান্ত সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে, যাতে বলা হয়েছে, নতুন করে তালিকাভুক্ত করা বিএনপি সরকারের ৪৪ হাজারের বেশিরভাগ এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তালিকাভুক্ত করা ১১ হাজারের অর্ধেকই ভুয়া।



Leave a Reply