নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিধন্য অস্ত্রাগার এবং ইউরোপিয়ান ক্লাব ঘুরে দেখেছেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। চট্টগ্রাম সফরের দ্বিতীয় দিনে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইনে ব্রিটিশ আমলের পুলিশ অস্ত্রাগার পরিদর্শনে যান প্রণব। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায় এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। প্রণব অস্ত্রাগার ভবন ঘুরে দেখেন এবং সেখানে স্মারক বইতে স্বাক্ষর করেন। এই দুইটি স্থানে প্রণব মুখার্জি ভারতবাসীর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন। পাঁচদিনের ব্যক্তিগত সফরে গত রোববার ঢাকায় পৌঁছান ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব।
১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের সর্বাধিনায়ক মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে বিপ্লবীরা অস্ত্রাগার অধিকারের উদ্দেশ্যে আক্রমণ করেন। তখনকার ব্রিটিশ পুলিশের সেই অস্ত্রাগার দখলের পর চারদিন স্বাধীন ছিল চট্টগ্রাম। অস্ত্রগার পরিদর্শন শেষে বেলা সোয়া ১১টার দিকে নগরীর পাহাড়তলিতে ইউরোপিয়ান ক্লাবে আসেন প্রণব।ক্লাবের প্রবেশ পথে নতুন স্থাপিত ‘ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ’ শীর্ষক স্মৃতি ফলক পড়ে দেখেন প্রণব। ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর মাস্টারদার নির্দেশে প্রীতিলতার নেতৃত্বে তখনকার ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণ চালায় বিপ্লবীরা।
এই ক্লাবের প্রবেশপথে তখন লেখা থাকত ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ’। ক্লাব আক্রমণ শেষে নিজের বাহিনীকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে গুলিবিদ্ধ বীরকন্যা প্রীতিলতা পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন। প্রণব ক্লাবে ঢুকে কাঠের মেঝের নিচে ইংরেজদের অস্ত্র রাখার স্থান এবং ক্লাবের ভেতর লাগানো প্রীতিলতার ছবি সম্বলিত ব্যানার পড়ে দেখেন। এরপর তিনি অদূরে প্রীতিলতা প্রীতলতার ভাস্কর্যে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় ‘প্রীতলতা ট্রাস্টের’ নেতৃবৃন্দের হাতে ছয় লাখ ২৮ হাজার টাকার চেক তুলে দেন প্রণব।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাংসদ এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “এই ইউরোপিয়ান ক্লাব সংরক্ষণ করা হবে হেরিটেজ হিসেবে। যাতে করে যারাই আসেন তারা যেন ইতিহাস জানতে পারেন। এটাকে সাবেক ইউরোপিয়ান ক্লাব হিসেবে রাখা হবে, এখানে কোনো অফিস থাকবে না। পাশাপাশি চুয়েট পর্যন্ত যে রেললাইন হবে সেখানে নোয়াপাড়া স্টেশনটি মাস্টারদা সূর্যসেনের নামে হবে।”
মাস্টারদা ও প্রীতিলতার স্মৃতিধন্য এসব স্থান পরির্দশন শেষে ঢাকায় যাওয়ার জন্য বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হন প্রণব। এর আগে মঙ্গলবার বিকালে রাউজান কলেজের পাশে মাস্টারদা সূর্যসেন স্মৃতি ভবন এবং নোয়াপাড়ায় সূর্যসেনের পৈত্রিক ভিটায় যান ভারতের বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক। মঙ্গলবার সকালে তাকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানসূচক ডি লিট উপাধি দেওয়া হয়। রাতে রেডিসন ব্লু বে ভিউ হোটেলে ভারতীয় দূতাবাসের এক সংবর্ধনায় যোগ দেন তিনি।
বন্দরনগরীতে গিয়ে অভিভূত প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেছেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা চট্টগ্রামে না গেলে তার বাংলাদেশ সফর পূর্ণতা পেত না। তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম না দেখলে বাংলাদেশে আসাটা বোধ হয় সম্পূর্ণ হয় না। তার অন্যতম কারণ, এটি দেশের একটি প্রধান বন্দর। শুধু তাই নয়, যেমন অবিভক্ত ভারতবর্ষে স্বাধীনতা আন্দোলনে চট্টগ্রামের মানুষের একটা বিপুল ভূমিকা ছিল, ঠিক তেমনি বাংলাদেশকে স্বাধীন করার ক্ষেত্রেও চট্টগ্রামের ভূমিকা কোনো অংশেই কম নয়।”
প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেন, “ইচ্ছে ছিল চট্টগ্রামে একবার যাব। বয়স হয়ে যাচ্ছে। না গেলে হয়ত আর যাওয়া হবে না। আল্লাহর ইচ্ছায়, ঈশ্বরের করুণায় তা হল।”
বাঙালির ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেন, অবিভক্ত পাকিস্তানের স্রষ্টা কায়েদে আজম যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বললেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কিন্তু কায়েদে আজমের বিরুদ্ধেও আওয়াজ তুলে বলেছিলেন- ‘না’।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সাহসী ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাকিস্তানের কনস্টিটিউশন এসেম্বলির প্রথম অধিবেশনে এই দাবি উত্থাপিত হয়েছিল। তখনকার কংগ্রেস নেতা পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (কুমিল্লার) এটা প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন।



Leave a Reply