রাঙামাটি সংবাদদাতা: বাংলাদেশে চট্টগ্রাম বিভাগের সংরক্ষিত পাহাড়ি এলাকা রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নে সেনাবাহিনীর সদস্যদের দ্বারা দুই কিশোরী সহোদরাকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে।
রাঙামাটির বিলাইছড়িতে ধর্ষণের ঘটনাটি ‘আর্মির পোশাক পরা’ লোকজন ঘটিয়েছে বলে ঘটনার শিকারদের উদ্ধৃত করে অভিযোগ করেছেন চাকমা রানি ইয়েন ইয়েন। যদিও সেনাবাহিনী এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে ঘটনার তদন্ত হচ্ছে এবং আটক হয়েছে আনসারের এক সদস্যকে। নির্যাতনের শিকার দু’বোনকে ২৩ জানুয়ারি রাঙামাটি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বিলাইছড়িতে ২১ জানুয়ারি রাতে দুই মারমা সহোদরা ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। এদের একজন ১৮ বছরের তরুণী, যিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর তার ১৪ বছরের কিশোরী বোন হয়েছেন যৌন নির্যাতনের শিকার। সেনাবাহিনীর সার্চিং অপারেশন চলাকালে এই ঘটনা ঘটে বলে তাদের ও পরিবারের অভিযোগ। এই মুহূর্তে তারা দু’জন রাঙামাটি সদর হাসাপাতালে আছেন। হাসপাতাল ছাড়তে চাইলেও তাদের সেখানে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
হাসপাতালে তাদের দেখতে যাওয়া মানবাধিকার কমিশনের সদস্য বঞ্চিতা চাকমা জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘‘তাদের একজন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। অথচ এখনো কোনো মামলা হয়নি। তারা ভয়ের মধ্যে আছেন। জেলা প্রশাসক একটা প্রতিবেদন দেবেন। ওই প্রতিবেদনের পরে আমরা পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেব।’’ তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘দুই বোনের মধ্যে একজন বাংলায় কথা বলতে পারে না, চাকমাও পারে না। ছোট বোন কিছুটা বাংলা বলতে পারে। সে জানিয়েছে যে, আর্মিরা ছিল ওখানে। আর্মি করেছে বলে জানিয়েছে সে।’’ মেয়েটি পোশাকের কোনো বর্ণনা দিয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘ওরা আর্মির পোশাকের কথা বলেছে।’’
ফারুয়া ইউনিয়নের ওড়াছড়ি গ্রামে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার মারমা পরিবারের দুই বোনকে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ইতোমধ্যে ডা. হেনা বড়ুয়ার নেতৃত্বে একটি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। শনিবার আরও চেকআপের পর রিপোর্ট পাওয়ার সাপেক্ষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মেডিক্যাল টিমের প্রধান ডা. হেনা বড়ুয়া শনিবার ওই মেয়ে দুটিকে আবারও চেকআপ করবেন। তারপর তাদের ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। এখনও তারা চিকিৎসাধীন এবং তাদেরকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।’
রাঙামাটির ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. নিহার রঞ্জন নন্দী বলেন, ‘ছয় সদস্যের একটি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিমের আরও কিছু কাজ বাকি আছে।
এদিকে, শুক্রবার সকালে চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় ও তার স্ত্রী রানী ইয়েন ইয়েন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য বাঞ্ছিতা চাকমা হাসপাতালে যান। তারা নির্যাতিত দুই বোনকে উন্নত চিকিৎসার লক্ষ্যে তাদের জিম্মায় দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেন। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইনি অভিভাবক ছাড়া দুই বোনকে কারও জিম্মায় দিতে অস্বীকার করে।
ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় বলেন, ‘মেয়ে দুটি মারমা ভাষায় বলছিল, তারা হাসপাতালে থাকতে চায় না। তাদের উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। আমরা তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ভালো কোথাও নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। আর তারাও আমদের সঙ্গে যেতে চাচ্ছে। কিন্তু আইনি জটিলতার কথা বলে তাদের যেতে দেওয়া হচ্ছে না। ওদের মানসিক অবস্থা খুব খারাপ।’
এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে শুক্রবার দুই মারমা কিশোরীর শারীরিক অবস্থা জানতে হাসপাতালে আসেন রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক (উপ-সচিব) ড. প্রকাশ কান্তি চৌধুরী, রাঙামাটির পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান ও ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. নিহার রঞ্জন নন্দী।
রাঙামাটির পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান বলেন, ‘মারমা কিশোরীদের নেওয়ার জন্য কোনও আইনি অভিভাবক আসেননি। চিকিৎসা শেষে যদি ডাক্তার ছেড়ে দেন, তখন নিয়ে যাবেন। এতে আমাদের কিছু বলার নাই। আর আমরা সবাই ওদের দেখতে এসেছিলাম।’
এদিকে রাঙামাটি সার্কেল প্রধান রাজা দেবাশীষ রায় রাঙামাটি সদর হাসপাতালে ওই দুই বোনকে দেখতে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর একটি ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘‘তাঁদের ভাষ্য অনুসারে, যা আমি অনুবাদের মাধ্যমে জানলাম, তাদের একজন ধর্ষিত হয়েছেন দু’জন সেনাসদস্য দ্বারা (প্রাপ্ত বয়স্ক বড় বোন, যিনি কেবল মারমা ভাষায় কথা বলেন এবং অপরজন যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন, একই ব্যক্তিদের দ্বারা)।’’
দেবাশীষ রায়ের সঙ্গে হাসপাতালে যান তাঁর স্ত্রী ও চাকমা রানি ইয়েন ইয়েন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সদস্য বঞ্চিতা চাকমা। চাকমা রানি ইয়েন ইয়েন আলাদা আরেকটি ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘‘তারা বলেছে, আর্মিদের পোশাক পরা লোকরা টর্চ লাইট নিভিয়েছে, কথা বলতে দেয় নাই।’’
রানি ইয়েন ইয়েনের দাবি, ‘‘অনেক বাধা পেরিয়ে তাদের রাঙামাটি সদর হাসপাতালে যেতে হয়৷ তারা সেখানে যাতে না যেতে পারেন, সেজন্য নানা ধরনের অজুহাত দেখানো হয়৷ এমনকি তাদের সঙ্গে মারমা ভাষায় কথা বলতেও বাধা দেয়া হয়৷ হাসপাতালে ওই দুই বোনকে সব সময় ঘিরে আছে সাদা পোশাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।’’
রাজা দেবাশীষ রায় ডয়চে ভেলেকে টেলিফোনে বলেন, ‘‘তাঁরা বলেছেন, ‘সেটা সেনা না খাকি কাপড় তা আমরা জানি না।’ তবে তাদের ভাষায় তারা যে শব্দটা বলেছে বাংলায় অনুবাদ করলে সেনা দাঁড়ায়। আসলে সেটা সেনা, না বিজিবি, না পুলিশ, না আনসার, সেটা তো আমরা বলতে পারব না।’’ তিনি আরো বলেন, ‘‘ওই দুই বোন এখন হাসপাতালে আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় আছেন। কোনো মামলা হয়নি। আমরা মানবাধিকার কমিশনকে অনুরোধ করেছি তাঁদের যেন আইনজীবী দেয়া হয়৷ মারমা ভাষা জানেন এমন আইনজীবীও আছেন।’’
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের পরিচালক কর্ণেল রাশেদুল হাসান অবশ্য এই ব্যাপারে বলেন, ‘‘সেনা সদস্যরা সেখানে সার্চ করছিল। কিন্তু যেখানে সার্চ করছিল, মেয়েরা সেই বাড়ির না। ওটা তার আশেপাশের একটা বাড়ি, যে বাড়িতে একজন আনসার সদস্য ঢুকেছিল। আনসার সদস্য যখন ওখানে ঢোকে, তখন মেয়েগুলো চিৎকার করে ওঠে। চিৎকার করার পর পরই আমাদের আর্মির পেট্রোলে যারা ওখানে ছিল, তারা ছুটে যায় এবং আনসার সদস্যকে আটক করে। তাকে আটক করে আনসার কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং সেই আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’’
রাঙামাটির শিলছড়ি ১০ আনসার ব্যাটেলিয়নের কমান্ডিং অফিসার আফজাল হোসেন বলেন, ‘‘সেবাহিনীর সার্চিং অভিযানে আনসার সদস্যরাও তাদের সহায়তায় যোগ দিয়েছিল। ওই বাড়িতে অন্য কেউ আছে কিনা তা দেখতে সার্চ চলছিল। আনসারের সুবেদার গিয়াস উদ্দিন তা দেখতে ঘরের মধ্যে লাইট মারে। সেখানেই মেয়ে দু’জন ছিল। ছিল তাদের ছোট ভাইও। তারা অস্ত্রবাহী লোকজন দেখে চিৎকার ও কান্নকাটি শুরু করে৷ আনসার সদস্য ঘরের ভিতরে ঢুকেছিলেন আর একজন সেনাসদস্য বাইরে গেটে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সার্চ করা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য তাঁদের ছিল না। আমরা আনসার সদস্যকে ক্লোজড করেছি।’’
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘‘ভুক্তভোগীদের চিকিৎসার জন্য একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। কর্তব্যরত নার্সের সাথে কথা বলে যেটা জেনেছি, দুই বোনের মধ্যে একজনের অবস্থা খারাপ। তবে প্রকৃত ঘটনা কী ঘটেছে তা জানতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হবে।’’



Leave a Reply