
নোয়াখালীর সেনবাগে রাজনৈতিক সহিংসতা, হামলা ও প্রাণনাশের হুমকির মুখে পড়ে একের পর এক জায়গা বদল, আত্মগোপন এবং শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার দাবি করেছেন নোয়াখালী জেলা শাখা, সেনবাগ উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও সেনবাগ উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক ত্রাণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন। তার অভিযোগ, দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে চলা ভয়-ভীতি, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় আজ তিনি পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
মোশারফ হোসেন জানান, গত ৫ আগস্ট ২০২৪ বিকেল ৫টার দিকে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে তিনি নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে বোনের বাসায় আত্মগোপনে চলে যান। তার দাবি, তাকে না পেয়ে বিএনপি-জামায়াত ও জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীরা দোকানের তালা ভেঙে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। একই দিনে গ্রামের বাড়িতেও হামলা চালিয়ে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয় এবং তার স্ত্রী-সন্তানদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
পরদিন নিরাপত্তার আশঙ্কায় তার স্ত্রী দুই সন্তানকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় নেন। সে সময় তার স্ত্রী গর্ভবতী ছিলেন। কিন্তু আতঙ্ক যেন পিছু ছাড়ছিল না। ১২ আগস্ট হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। খবর পেয়ে ঝুঁকি নিয়েই স্ত্রীকে দেখতে রওনা দেন মোশারফ হোসেন। কিন্তু পথেই হামলার শিকার হন তিনি।
মোশারফ হোসেনের ভাষ্য, “আমাকে চিনে ফেলার পর তারা নির্মমভাবে মারধর করে। আমার বাম হাত ভেঙে যায়, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুরুতর আঘাত পাই। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, হয়তো আর বাঁচব না।”
পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও হামলাকারীদের ভয়ে সেখানে চিকিৎসা দিতে অনীহা দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে পরিচিতদের সহায়তায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তার হাতে অস্ত্রোপচার করা হয়। টানা নয় দিন চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছাড়েন তিনি।
এরপরও থামেনি আতঙ্ক। আগ্রাবাদে বোনের বাসায় অবস্থান নেওয়ার পর সেখানেও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলে ২৯ আগস্ট তিনি ঢাকার টঙ্গীতে আরেক বোনের বাসায় চলে যান। এদিকে ৫ আগস্টের পর তার নাম কথিত ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে দাবি করেন তিনি। একপর্যায়ে নিজের জীবন বাঁচাতে দেশ ছাড়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন বলে জানান মোশারফ হোসেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেশ ছাড়ার পর তার অনুপস্থিতির সুযোগে নোয়াখালীর গ্রামের বাড়িতে একাধিকবার হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। দুর্বৃত্তরা বাড়িতে ঢুকে মূল্যবান জিনিসপত্র, আসবাবপত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র নিয়ে যায় বলে দাবি করেন তিনি।
আবেগঘন কণ্ঠে মোশারফ হোসেন বলেন, “দূরদেশে বসে নিজের ঘরবাড়ি ভাঙচুরের খবর শুনেছি। পরিবারকে আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়েছে। একজন স্বামী, বাবা এবং মানুষ হিসেবে এর চেয়ে অসহায় অনুভূতি আর হতে পারে না।”
তিনি জানান, এসব ঘটনায় স্থানীয় থানায় একাধিকবার অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর কোনো সহায়তা পাননি। তার দাবি, সে সময় বিভিন্ন থানায় হামলা ও প্রশাসনিক অস্থিরতার কারণে পুলিশও আতঙ্কিত ছিল এবং দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
বর্তমানে পরিবার নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন বলে জানান মোশারফ হোসেন। দেশে ফিরে স্বাভাবিক জীবনযাপন এখনো তার কাছে অনিশ্চিত। তিনি প্রশাসনের কাছে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের শনাক্ত করে বিচার নিশ্চিত করা এবং নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।



Leave a Reply