বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন নিয়ে নতুন কঠোর বিধান হচ্ছে

সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন নিয়ে নতুন কঠোর বিধানসরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন নিয়ে নতুন বিধান করতে যাচ্ছে সরকার। এ সংক্রান্ত একটি বিধান শিগগিরই প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করবে অর্থ মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

সরকারি চাকরিজীবীর পেনশনের ৫০ শতাংশ পরিবারের জন্য সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ফলে অবসরে যাওয়ার সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের পেনশন অর্ধেকের বেশি সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবেন না।

আরও জানা গেছে, তিনটি প্রধান কারণ বিবেচনা করে পেনশন সংক্রান্ত বর্তমান বিধান সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এগুলো হচ্ছে- পেনশনভোগীর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করা, সরকারের ওপর আর্থিক চাপ হ্রাস ও পেনশনের অর্থ বিনিয়োগ করা।

বর্তমানে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বিক্রির বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারী সম্পূর্ণ পেনশন বিক্রি করে তার প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ এককালীন উত্তোলন করতে পারেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ সোমবার বলেন, পেনশনের প্রচলিত বিধান সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ বিষয়ে কাজ চলছে। খুব শিগগির এটি কার্যকর করা হবে। নতুন বিধান অনুযায়ী ৫০ শতাংশের বেশি পেনশন বিক্রি করতে পারবে না চাকরিজীবীরা। তিনি আরও বলেন, পেনশনভোগীর স্ত্রী ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মূলত এ পদ্ধতি চালু করা হবে।

সূত্র জানায়, নতুন বিধান কার্যকর হওয়ার পরও পুরনো পেনশনভোগীরা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত আগের পদ্ধতিতেই সুবিধা ভোগ করবেন। তবে পুরনোদের মধ্যে যারা শতভাগ পেনশন উত্তোলন করেননি, সেক্ষেত্রে বেঁধে দেয়া সময় শেষে তাদের পেনশন নতুন বিধানের সঙ্গে সমন্বয় হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পেনশনের ৫০ শতাংশের বেশি বিক্রির বিধান বন্ধ করা হলে পেনশনভোগীর পরিবারের সদস্যরা এর সুবিধা ভোগ করবেন। অনেকে অবসরে যাওয়ার সময়ই তার সম্পূর্ণ পেনশন সরকারের কাছে বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা পাচ্ছেন। ওই টাকা বিভিন্নভাবে খরচ করে শেষ করছেন। পরবর্তীকালে তাদের বেশির ভাগই আর্থিক দৈন্যদশায় পড়েন। তাদের অনেককেই মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। নতুন পেনশন ব্যবস্থা চালু হলে এ অবস্থা থেকে তারা পরিত্রাণ পাবেন। কারণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর পেনশনের ৫০ শতাংশ সরকারের কাছে থাকলে, তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিধান অনুযায়ী প্রতি মাসেই পেনশনের যাবতীয় সুবিধা ভোগ করবেন।

এছাড়া নতুন বিধান প্রণয়নের পেছনে আরও দুই কারণ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, পেনশনের অর্থ সরকারের কাছে থাকলে এটি এক ধরনের বিনিয়োগ। সরকার ও পেনশনভোগী উভয় এই টাকা বিনিয়োগ করে লাভবান হবেন। পাশাপাশি পেনশনের টাকা একসঙ্গে প্রদান করার কারণে সরকারের আর্থিক ব্যয়ের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। নতুন বিধান চালু হলে সরকারের এই আর্থিক চাপ হ্রাস পাবে।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ৫ শতাংশ সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত আছেন, যাদের জন্য পেনশন সুবিধা রয়েছে। আর বর্তমান অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা হচ্ছে ৪ লাখ ৫৫ হাজার জন। তাদের পেনশন অ্যান্ড গ্র্যাচুইটি খাতে চলতি অর্থবছরে (২০১৬-১৭) ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা। এর আগের বছর (২০১৫-১৬) এই ব্যয় হয়েছে ১১ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এটি ছিল ৭ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা।

জানতে চাইলে অষ্টম জাতীয় পে-কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, পে-কমিশনের রিপোর্টে চাকরিজীবীদের পেনশনের ১০০ শতাংশ বিক্রির বিধান বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়। কারণ পেনশনের ৫০ শতাংশ রাখা হলে এটি বিনিয়োগ হিসাবে গণ্য হবে। এতে সুবিধা বেশি পাবেন পেনশনভোগীরা। তিনি আরও বলেন, পেনশনে হার আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে চাকরিজীবীরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। অনেকে পেনশনের টাকা তুলেই বাড়ি-ঘর নির্মাণসহ নানা খাতে দ্রুত ব্যয় করেন। তাদের বেশির ভাগই জীবনের শেষ সময়ে এসে অর্থকষ্টে ভোগেন। নতুন বিধান চালু হলে কোনো চাকরিজীবী মৃত্যুবরণ করলেও তার স্ত্রী ও সন্তানরা একই সুবিধা ভোগ করবেন।

জানা গেছে, বর্তমান বেতন স্কেল অনুযায়ী, চাকরিকাল ৫ থেকে ৯ বছর হলে আনুতোষিকের হার প্রতি এক টাকার বিপরীতে ২৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি পুরনো বেতন কাঠামোতে ছিল না। তবে চাকরিকাল ১০ বছরের বেশি এবং ১৫ বছরের কম হলে আনুতোষিক হার প্রতি এক টাকার বিপরীতে ২৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া চাকরির বয়স ১৫ বছরের বেশি কিন্তু ২০ বছরের কম হলে আনুতোষিক হার প্রতি এক টাকার বিপরীতে ২৪৫ টাকা এবং চাকরির বয়স ২০ বছরের বেশি হলে আনুতোষিক হার প্রতি এক টাকার বিপরীতে ২৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী তার সম্পূর্ণ পেনশন সমর্পণ (সরকারের কাছে বিক্রি) করলে সর্বশেষ ধাপের হিসাব অনুসারে প্রতি এক টাকার বিপরীতে ২৩০ টাকা আনুতোষিক সুবিধা পাচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

বিদ্যমান অষ্টম বেতন স্কেল অনুযায়ী পেনশনের হার ৮০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯০ শতাংশ এবং অবসরভোগীদের সর্বনিু পেনশনের হার তিন হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া চাকরির বয়স পাঁচ বছর পূর্ণ হলেই একজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী অথবা তার পরিবার পেনশন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। একজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর চাকরির প্রথম ৫ বছর পূর্ণ হলে পেনশন পাবেন ২১ শতাংশ হারে। ৬ বছর পূর্ণ হলে ২৪ শতাংশ, ৭ বছর হলে ২৭ শতাংশ, ৮ বছরে ৩০ শতাংশ, ৯ বছরে ৩৩ শতাংশ এবং ১০ বছরে ৩৬ শতাংশ হারে পেনশন পাবেন।

এছাড়া চাকারি বয়স ১১ বছর পূর্ণ হলে ৩৯ শতাংশ, ১২ বছরে ৪৩ শতাংশ, ১৩ বছরে ৪৭ শতাংশ, ১৪ বছরে ৫১ শতাংশ, ১৫ বছরে ৫৪ শতাংশ, ১৬ বছরে ৫৭ শতাংশ, ১৭ বছরে ৬৩ শতাংশ, ১৮ বছরে ৬৫ শতাংশ, ১৯ বছরে ৬৯ শতাংশ এবং ২০ বছর পূর্ণ হলে ৭২ শতাংশ হারে পেনশন পাবেন সংশ্লিষ্ট চাকরিজীবী।

আর একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর চাকরির বয়স ২১ বছর পূর্ণ হলে ৭৫ শতাংশ, ২২ বছরে ৭৯ শতাংশ, ২৩ বছরে ৮৩ শতাংশ, ২৪ বছরে ৮৭ শতাংশ এবং ২৫ বছর পূর্ণ হলে ৯০ শতাংশ হারে পেনশন পাবেন।

এছাড়া কোনো সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর চাকরির বয়স ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই স্বাস্থ্যগত কারণে অক্ষম বা মৃত্যু হলেও প্রতি বছর বা তার অংশবিশেষের জন্য সংশ্লিষ্ট চাকরিজীবীর সর্বশেষ প্রাপ্য বেতনের তিনটি মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ সহায়তা হিসাবে পাবে তার পরিবার।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *