সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক কিছুটা হলেও কমে যাওয়ার আশা করা বিদেশি কূটনীতিকরা নির্বাচনের নানাবিধ অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্তের পক্ষে জোরালো আহ্বান জানিয়েছে। তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমেই এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে এ দেশের সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান তাদের। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলোর তরফ থেকে গত কয়েকদিনে এই মনোভাবের কথা জানানো হয়েছে। ঢাকায় তাদের দূতাবাস ও আবাসিক কার্যালয় থেকে স্ব স্ব দেশ ও সংস্থায় পাঠানো তথ্য ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রভাবশালী দেশগুলো সদ্য সমাপ্ত এই নির্বাচনকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ বলেও মনে করছেন। তবে এখন উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্র, সংস্থা ও জোটগুলোর প্রত্যাশা, নির্বাচন নিয়ে যেসব অভিযোগ এসেছে তার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সেই মোতাবেক ব্যবস্থা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্য কিছুটা হলেও বাড়াতে পারে। এই ধরনের মত জানিয়ে ইতিমধ্যেই বক্তব্য ও বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। এছাড়াও ঢাকায় কর্মরত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকসহ
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও নির্বাচনে বিশ্বাসযোগ্য জালিয়াতির তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করে বক্তব্য দিয়েছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্রাসেলসসে থাকা সদরদপ্তর থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম প্রশ্নবিদ্ধ সিটি নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি ও সহিংসতার বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন পেয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তারা বলে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বানের পরও ভোট জালিয়াতি, ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার জোরালো অভিযোগ পাওয়া গেল। এর ফলে বিএনপি নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়। সিটি নির্বাচনে ভোটারদের সম্পূর্ণরূপে গণতান্ত্রিক মতামত প্রয়োগের সুযোগও দেওয়া হয়নি। যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলো শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিল। নির্বাচনের অনিয়ম এবং সংঘর্ষের ঘটনায় অবশ্যই সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। ইইউ আশা প্রকাশ করে, রাজনৈতিক দলগুলো সকল প্রকার সহিংসতা, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিহার করে একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য গঠনমূলক রাজনৈতিক আচরণ করবে।
ঢাকাস্থ আবাসিক প্রতিনিধির আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে ভোটগ্রহণের আগের দিন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছিল জাতিসংঘ। তবে ভোট গ্রহণের পরদিন নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংকালে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মহাসচিব বান কি মুনের মুখপাত্র বলেছেন, ভোট জালিয়াতির অভিযোগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচন বর্জনের বিষয়টি জাতিসংঘ মহাসচিব অবগত রয়েছেন। তিনি সব অভিযোগ তদন্ত করে দেখার জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে উৎসাহিত করেন। তিনি বিরোধী দলকে তাদের উদ্বেগ জানানোর জন্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ব্যবহারেও উৎসাহিত করেন। মুখপাত্র বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব সব পক্ষকে তাদের মতপার্থক্যগুলো শান্তিপূর্ণ উপায়ে ব্যক্ত করার আহ্বান জানান। মহাসচিব চলমান পরিস্থিতির একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে পেতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি তার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন।
এর আগে, ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ ও মার্কিন কূটনীতিকরা পৃথক বিবৃতিতে নির্বাচনে ‘কারচুপির ব্যাপক এবং বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ’ তদন্ত করার জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান। যদিও ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন বিএনপির নির্বাচন বর্জন করার সিদ্ধান্তে হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, সকল পক্ষ আইন মেনেই তাদের প্রতিক্রিয়া জানাবে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেন্স ব–ম বার্নিকাট সকল পক্ষকে সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। এছাড়া, সিটি নির্বাচন বিষয়ে এশিয়ান হিউম্যান রাইটস, টিআইবিসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলো বিবৃতি দিয়ে বলেছে, সিটি নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি ও সহিংসতা হয়েছে। প্রত্যেকেই নির্বাচনের অনিয়মগুলো সঠিকভাবে তদন্তের কথা বলেছেন।



Leave a Reply