বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

ঐক্যবদ্ধ হতে বিএনপির ডিজিটাল উদ্যোগ

শনাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী : বিএনপিকে আরও শক্তিশালী করার ব্যাপারে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা তাদের সব কথা দলের প্রধানের কাছে তুলে ধরতে ডিজিটাল সুবিধা নিচ্ছেন। তারা মনে করছেন, তৃণমূল নেতাদের অনেক কথা আছে। ওই কথা সব সময় তারা দলের প্রধানের কাছে পাঠাতে পারেন না। আর সেটা না পাঠাতে পারার কারণে অনেক কাজও হয় না বলে মনে করছেন। এই জন্য বেশ কিছু নেতা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। সেই চেষ্টা সফল করতে সকলকে যোগাযোগ করার জন্য ও কর্মসূচি সফল করতে এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে পেজ খোলা।
https://www.facebook.com/events/796520577110510/
এই ঠিকানায় ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী লাইক দিচ্ছেন। কর্মসূচি শেয়ার করে অনেকেই প্রচারণা শুরু করেছেন।
বিএনপির তৃণমূল নেতাদের দাবি, তারা দলের প্রধানের সঙ্গে দেখা করার ও কথা বলার সুযোগ পান না। গুলশান কার্যালয়ে গেলে চেয়ারপারসনের স্টাফরা তাদেরকে দেখা করতে দেন না। কিন্তু তৃণমূল নেতারাই বেশি কাজ করছে। আমাদের অনেক কথা আছে। তাহলেও সব সময় তৃণমূলের সিনিয়র নেতারা আমরা যারা আছি, তারা কথা বলার সুযোগ পেলেও সবাই পায় না।
এছাড়াও বিএনপির ২০১৩ সালের ও ২০১৫ সালের আন্দোলন সফল করার জন্য তৃণমূল নেতাদের অবদানই বেশি। তাদের আন্দোলনের চূড়ান্ত ফল না পাওয়ার কারণে তৃণমূলের অনেকেরই ঢাকার নেতাদের উপর ক্ষোভ রয়েছে। তারা এত কষ্ট করার পরও ঢাকার ও সিনিয়র নেতাদের মাঠে না থাকার কারণে ও যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া ও সঠিক দিক নির্দেশনা না দিতে পারার কারণে তাদের ব্যর্থতার চিত্রই ধরা পড়ছে। ২০১৩ সালের আন্দোলন ব্যর্থ হয়। এরপর ২০১৫ সালেও আন্দোলনে চূড়ান্ত বিজয় আসেনি। এই অবস্থায় তৃণমূল নেতারা অনেকেই হতাশ। তারা তাদের কথা অন্য কারও কাছে বলতে পারেন না। সুযোগ সুবিধা পান না। তাই এবার ওই সব কথা বলার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবারে ওই সব নেতারা তাদের বক্তব্য লিখিত আকারে বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে তুলে ধরবেন।
তাদের দাবি বিএনপিতে শুদ্ধি অভিযান শুরু করতে হবে। বেগম খালেদা জিয়ার হাতে তাদের বক্তব্য ও প্রস্তাবনা তুলে দিতে গুলশান কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা করবেন দলের নেতাকর্মীরা। ২৫ মে বিকেল ৩টায় এ পদযাত্রা কর্মসূচি হবে।
ইতোমধ্যে ফেস বুক পেজে বিভিন্ন মতামত আসছে। সেখানে অনেকেই অনেক কথা লিখছেন। ছাত্রদলের এক কর্মী গোলাম মর্তুজা ফেসবুকে লিখেছেন, এটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি। তাই জিয়ার সৈনিকদের বলি, আমরা আর দূরে থাকব না। দালাল আর চাটুকাররা শোন, তোদের বলছি। তোদের দিন শেষ। আমরা এসে গেছি। কোথায় কী করতে হবে, কীভাবে দল পুনর্গঠন করতে হবে, দলের মধ্যে কীভাবে, কী শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে, সব আমরা পয়েন্ট আকারে লিখে নোট করে আনছি। ম্যাডামকে বলছি, আপাতত আর কোনো কর্মসূচি নয়। সবার আগে নিজেরা ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার-পরিছন্ন হয়ে নেই। তার পর সব হবে।
ছাত্রদল নেতা ইউসূফ ফেসবুকে লিখেছেন, আর কিছুদিন এভাবে চললে বিএনপিকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো আর কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। আন্দোলন পরের কথা, দল হয়ে পড়বে নেতৃত্বশূন্য। বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কর্নেল অলি আহমদ ও নীরু ভাইদের মতো পরীক্ষিত নেতারা অনেকেই বাধ্যতামূলক অবসরে। দুদু ভাই, রিপন ভাই, বেনজির আহমেদ টিটো, নয়ন ভাই, সাঈদ টিটু ও মুন্না ভাইদের মতো জনপ্রিয় নেতারা চরম অবহেলিত। শহীদ বাবলু, ইলিয়াস, সালাহউদ্দিন ও পিন্টু ভাইদের মতো অদম্য সাহসী নেতারা পরপারে। ডেভিড, মামুন, চমক, মেহেদী, নিউটন ও সাগীর ভাইদের মতো নেতারা অনেক আগেই বিএনপির ভুল রাজনীতির শিকার হয়ে জীবন দিতে বাধ্য হয়েছেন। দলের অদম্য সাহসী ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মাঠের বাইরে বসিয়ে রেখে যে অসম্ভব ক্ষতি হয়েছে, তারই খেসারত আজ বিএনপিকে দিতে হচ্ছে।
ফেস বুকের ঐক্যবদ্ধ হওয়া নেতা কর্মীরা মনে করছেন, বিএনপিকে আরও শক্তিশালী করার ব্যাপারে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের অনেক কথা আছে, যা তারা অন্য কারও কাছে বলতে পারেন না। সে বক্তব্যগুলো লিখিত আকারে আমরা নেত্রীর কাছে তুলে ধরব।
একজন লিখেছেন, বিএনপি দেশের সর্ববৃহৎ ও সর্বোচ্চ জনপ্রিয় দল। তাই ধ্বংস হওয়ার ভয় নেই। কিন্তু দলের ভেতরে লীগের বি টিম তৈরি ও স্বৈরাচারী সরকারের চক্রান্তে বিএনপিকে প্রতিবন্ধী সংগঠনে পরিণত করার কাজ অনেকটাই সফল। উপমহাদেশের এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের পথেই যাচ্ছে বিএনপি। বিএনপিকে রক্ষা করার সময় কম; কিন্তু সুযোগ এখনও আছে।
আবদুল্লাহ আল মামুন রনিক দলের হাইকমান্ডের কাছে লিখেছেন, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড আর জেলার কমিটি ভোটের মাধ্যমে করুন। বেঈমানদের দল থেকে বের করে দিন। কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। আর মাঠের খেলোয়াড়দের খেলা দেখে সকল নির্বাচনে আসল খেলোয়াড়দের মনোনয়ন দিন। ক্লিনহার্ট করে যাদের মেরেছেন তাদের পরিবারগুলোর খবর নিন। সকল আন্দোলন-সংগ্রামে আহত, নিহত, কারাভোগী নেতাকর্মীদের সঠিক মুল্যায়ন করুন। তাহলে এক বছরও লাগবে না বাকশাল দূর করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু দুঃখ এখানেই যে, বিএনপি এ সব কখনই করবে না। আর তাই আমাদের এ অবস্থা।
খালেদ চৌধুরী নামে একজন লিখেছেন, আমাদের দাবি একটাই দালালমুক্ত বিএনপি চাই। গুলশান অফিসের ভেতরে অনেকেই আছে যারা সরকারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। তাই সব কর্মচারি-কর্মকর্তাদের ছাঁটাই করা হোক। রাজপথে সক্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের দিয়ে কমিটি করা হোক। নীরু ভাইদের মতো নেতাদের দলে ফিরিয়ে এনে নতুন করে দলকে সংগঠিত করা হোক। ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দলের কমিটি ভেঙে রাজপথের সক্রিয় নেতাদের দিয়ে কমিটি করা হোক। যে সব জেলাতে আন্দোলনে নেতারা মাঠে নামেনি, তাদের বাদ দিয়ে নতুন কমিটি দেওয়া হোক। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের আন্দোলন জোরদার করার জন্য সিনিয়র নেতাদের প্রতি জিরো টলারেন্স নেওয়া হোক। যে সব নেতা মাঠে নামবে না তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হোক। দলে তরুণ নেতৃত্ব দেখতে চাই।
এক উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লিখেছেন, অনেক চেষ্টা করে একদিন মাননীয় নেত্রীর গুলশান কার্যালয়ের দোতলা পর্যন্ত উঠতে পেরেছিলাম। কিন্তু ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দোতলায় ম্যাডামের রুমে প্রবেশের মুখে আমার পরিচয় পেয়ে নেত্রীর এক বেতনভুক্ত কর্মচারী একরকম ধাক্কা দিয়েই আমাকে বের করে দিলেন। শার্টের বুকপকেট থেকে আমার জেলা সভাপতির পাঠানো চিঠিটি নেত্রীকে দেখানোর সুযোগ পর্যন্ত পেলাম না। অনেক আশা নিয়ে এসে ফিরে যেতে বাধ্য হলাম।
ছাত্রজীবন থেকে শহীদ জিয়ার রাজনীতি করি কিন্তু এরকম অমানবিক যন্ত্রণা কখনই পাইনি। লজ্জায় অপমানে চোখের কোণে জমতে থাকে নোনা অশ্রু। নীরবে শুধুই চোখের জল ফেলা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। অবুঝ মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাইনি। বার বার চোখের সামনে গুলশানের বড় বড় দালানগুলো ঝাপসা দেখাচ্ছিল। নিজেকে খুব ছোট মনে হয়েছিল সেদিন। মাসের পরে মাস কারাগারের মেঝেতে বিনিদ্র রজনী কেটেছে। পুলিশের অত্যাচারে দিনের পর দিন সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় পড়েছিলাম বিনা চিকিৎসায়। তবুও কখনই শহীদ জিয়ার রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হইনি। রাজনীতি আমার নেশা, শহীদ জিয়া আমার রক্তে, চাষাবাদ আমার পেশা। বাপের জমি বিক্রি করে মামলা চালাচ্ছি, হালের গরু বিক্রি করে জামিন হয়েছে, বাড়ি ফিরতে পারি না। আর আজ এ পেলাম পুরস্কার!!! বেগম জিয়ার অফিস চিড়িয়াখানা নাকি যে, প্রবেশ করতে টিকিট লাগবে? কই জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে তো টিকিট লাগেনি। মায়ের সঙ্গে সন্তানদের কেন এ ব্যবধান? কে তৈরি করেছে বিভেদের এ অসম দেয়াল?’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন নেতা বলেন, তৃণমূলের নেতাদের কথা সব সময় সরাসরি দলের প্রধানের কাছে আসে না। তবে তাদের কথা সেখানে যেসব নেতারা দায়িত্বে রয়েছেন সেটা ঠিকই পৌঁছে যায়। আর দলের কোন এলাকায় কোন নেতার পারফরমেন্স ভাল সেটাও দলের হাইকমান্ডের কাছে আছে। আর সেটা থাকায় তিনি জানেন কে কি করছেন। এখন দলের তৃণমূলের নেতারা যদি মনে করেন তারা যেটা বলতে চান সেটা তার দলের প্রধান জানেন না এটা ঠিক না। কারণ তিনি সবই জানেন। নিজস্ব সোর্সেই প্রতিটি জেলার খবর নেন হাইকমান্ড। লন্ডন থেকেও দলের সেকেন্ড ইন কমান্ডও খবর নেন। আর সেই সব খবর জানেন বলেই তারা দলকে পুনর্গঠনের জন্য কাজও শুরু করছে। আর এই জন্য দলের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হবে। সেখানে আলোচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত দিবেন দলের প্রধান। তিনি আরো মনে করেন, দলের যে সব নেতা কর্মীরা আন্দোলন সফল করার জন্য ভাল ভূমিকা রাখতে পারেননি তাদের ব্যাপারে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাদের তালিকাও করা হচ্ছে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির হাইকমান্ড ও সেকেন্ড ইন কমান্ড আগামী দিনের জন্য ডিজিটাল সুযোগ সুবিধা নিতে চাইছেন। ইতোমধ্যে তারেক রহমান ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিভিন্ন ভাবে দলের নেতা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তিনি নিজেও বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এই জন্য তিনি ফেসবুক, টুইটার সহ সব ধরনের সুবিধাই নিচ্ছেন। সেটা করে তিনি সফল যোগাযোগও করতে পারছেন। এখন সাবেক ছাত্রদলের যারা উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন ও তৃনমূল নেতারা যে উদ্যোগ নিয়েছেন সেটা তারা কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে যদি হাইকমান্ডের কাছে দিতে পারে তাহলে দুটি ইতিবাচক ফল আসতে পারে। এক হলো বিএনপির তৃণমূল নেতারা তাদের কথা তুলে ধরতে পারলে ও খালেদা জিয়া গুরুত্ব দিলে এর মাধ্যমে মাঝে মাঝেই তার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ হবে। আবার তারা মাঠের খবর সরাসরি দেওয়ার কারণে অন্য যেসব নেতারা কাজ করছেন না তাদের মধ্যে এক ধরনের ভয় তৈরি হবে। তাছাড়াও এটা হলে ও নেতাদের কথা গুলো দল গুরুত্ব দিলে তারা আগামী দিনে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
বিএনপি ওই সব নেতা কর্মীরা ২৫ মে খালেদা জিয়ার কাছে পৌঁছুতে পারবেন কিনা নাকি এর আগেই বাঁধার মুখে পড়বেন তা জানেন না। পুলিশ সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলশান এলাকায় কোন মিছিল সমাবেশ করতে দিবে না। সেই হিসাবে তারা সেখানে গেলে প্রবেশ করতেও পারবে না। কারণ কুটনীতিকদের নিরাপত্তা দেওয়া একটি বড় কাজ। সেখানে রাজনীতিকদের বাঁধা দেওয়া হবে।
এদিকে বিএনপি চেয়াপারসনের একজন উপদেষ্টা বলেন, তৃণমূল নেতারা ম্যাডামকে তাদের কথা তুলে ধরে ও নিজ নিজ এলাকার রাজনীতি তুলে ধরে পরামর্শ দিতেই পারেন। সেটা গ্রহণ করা না করা চেয়ারপারসনের ব্যাপার। তবে তৃণমূল নেতারা যদি সত্যিকারের চিত্র তুলে ধরতে পারে সেটা ভাল। কিন্তু সেখানে যদি তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থগুলোই প্রাধান্য পায় তাহলে হবে না। আমিত্ব শব্দটি রাজনীতিকদের বাদ দিতে হবে। এখন কি পেলাম আর পেলাম না এনিয়ে কোন নেতা আফসোস করলে হবে না। আসলে ব্যক্তিগত চাওয়া না পাওয়ার বিষয়ের উর্ধ্বে উঠেই কাজ করতে হবে।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *