বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

গাছে বেঁধে নির্যাতন: স্বামী সেনা সদস্য শফিকুল গ্রেফতার

এস এম নাহিয়ান: গাছের সঙ্গে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় অমানবিক নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি ও গৃহবধূ ববিতার 460601স্বামী সৈনিক শফিকুলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সিলেট সেনানিবাস এলাকা থেকে সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় শফিকুলকে গ্রেফতার করা হয়। লোহাগড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লুৎফর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) উপ-পরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম সিলেট সেনানিবাস এলাকা থেকে সোমবার রাতে তাকে গ্রেফতার করেন। প্রসঙ্গত, জেলার লোহাগড়া উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের শালবরাত গ্রামে ববিতা নামে এক গৃহবধূকে তার স্বামী সেনা সদস্য শফিকুলসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন গাছের সঙ্গে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় অমানবিক নির্যাতন চালায়। ‘স্ত্রীকে গাছে বেঁধে সেনা সদস্যের মধ্যযুগীয় নির্যাতন’ শিরোনামে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে খবরটি প্রকাশিত হওয়ায় নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন। খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠন ভুক্তভোগী গৃহবধূ ববিতার খোঁজখবর নেওয়া শুরু করে। নড়াইলের পুলিশ সুপার (এসপি) সরদার রকিবুল ইসলাম ৭ মে দুপুরে ঘটনাস্থল শালবরাত গ্রামের শফিকুল ইসলামের বাড়ি পরিদর্শন করেন। নির্যাতিত ববিতা ১৬৪ ধারায় জেলার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুল ইসলামের কাছে ওই দিন বিকেলে জবানবন্দী দেন।

ওই ঘটনায় ১০ মে ববিতার স্বামীসহ আসামিদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। আইনজীবী মনজিল মোরশেদের এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের বেঞ্চ এ আদেশ দেন। এ ছাড়া দোষীদের গ্রেফতার করা হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে ১৮ মে নড়াইল জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও লোহাগড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন আদালত। একই সঙ্গে ববিতার চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়। হাসপাতালে ১০ দিন ধরে চিকিৎসা শেষে কিছুটা সুস্থ হয়ে ১০ মে বাড়ি ফেরেন ববিতা খানম। নড়াইল সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার মো. আসাদুজ্জামান মুন্সী বলেন, ববিতা সুস্থ হওয়ায় তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকের দেওয়া ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ সেবনের জন্য তাকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে অসুস্থ অনুভব করলে তাকে হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়ন পরিষদের শালবরাত গ্রামের ছালাম শেখের ছেলে সেনা সদস্য শফিকুল শেখের সঙ্গে পাশের এড়েন্দা গ্রামের ইসমাইল মোল্যার মেয়ে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্রী (প্রাইভেট) ববিতার (২১) প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। ওই সম্পর্কের জের ধরে ২০১৩ সালের ২১ নভেম্বর ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক গোপনে তাদের বিয়ে হয় (রেজিস্ট্রি ২২ নভেম্বর)। বিয়ের কিছুদিন পর ববিতার স্বামী সিলেট সেনানিবাসের ৩৮ বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত সদস্য শফিকুল শেখ ও শাশুড়ি তাকে ঘরে তুলে নেবে না বলে টালবাহানা শুরু করে। শফিকুলও ববিতার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে ববিতা একপর্যায়ে হতাশ হয়ে পড়েন। পরে তিনি বাধ্য হয়ে আদালতের শরণাপন্ন হন। এতে শফিকুল ও তার পরিবারের সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। নির্যাতিত ববিতার মা খাদিজা বেগম জানান, ২৯ এপ্রিল ববিতার স্বামী শফিকুল বাড়িতে আসে এবং ববিতাকে স্বামীর বাড়িতে যাওয়া জন্য খবর দেয়। সব সমস্যার মীমাংসা করা হবে বলেও জানানো হয়। ববিতা খুশি হয়ে রাতেই স্বামীর বাড়িতে যায়।

পরদিন (৩০ এপ্রিল) সকাল ৭টার দিকে ববিতার স্বামী শফিকুল, ভাসুর হাসান শেখ, শ্বশুর ছালাম শেখ, শাশুড়ি জিরিন আক্তার, চাচাশ্বশুর কালাম শেখ, প্রতিবেশী নান্নু শেখ এবং পাশের পদ্মবিলা গ্রামের আজিজুর রহমান আরজু মিলে ববিতাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে বেধড়ক লাঠিপেটা করে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাশবিক নির্যাতন চালানোর একপর্যায়ে ববিতা অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় তাকে বাজারে নিয়ে একটি দোকানে আটকে রাখা হয়। খবর পেয়ে লোহাগড়া থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। ৫ মে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ববিতার স্বামী শফিকুল শেখসহ সাতজনকে আসামি করে লোহাগড়া থানায় মামলা দায়ের করেন ববিতার মা খাদিজা বেগম। ৯ মে ববিতার চাচাশ্বশুর হিরু মিয়াকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর আগে শফিকুলের ভাই হাসানকে গ্রেফতার করা হয়।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *