মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

বদলে যাচ্ছে বিএনপি

Flag_of_Bangladesh_Nationalist_Partyশিমুল রহমান : গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দলের প্রতিটি স্তরে নেতৃত্ব নির্বাচন করার চিন্তা-ভাবনা করছে বিএনপি। পাশাপাশি বিতর্কিত নেতাদের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে দল পুনর্গঠনের কাজ শুরু করা হচ্ছে। প্রায় ছয় বছর আগে তৃণমূল নেতাদের দেয়া মতামতের ভিত্তিতে এসব বিষয় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, দল পুনর্গঠনে এ মুহূর্তে তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে দীর্ঘ ছয় বছর আগের দল পুনর্গঠন সংক্রান্ত যুগ্ম মহাসচিবদের দেয়া অধিকাংশ সুপারিশ আমলে নেয়ার চিন্তা-ভাবন করছেন দলের হাইকমান্ড। অবশেষে দল পুনর্গঠনে তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে চরম ভরাডুবির পর তৃণমূল থেকে দলকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল বিএনপি। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের মতামতের ভিত্তিতে দলকে পুনর্গঠন করতে দলের তৎকালীন ছয় যুগ্ম মহাসচিবকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। দায়িত্ব পেয়ে ২০০৯ সালের ৩ ফেব্র“য়ারি থেকে মাসব্যাপী নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় ও মহানগর কার্যালয়ে উপজেলা, থানা ও পৌর কমিটির শীর্ষ নেতাদের মতামত গ্রহণ করা হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা তৃণমূলের এসব মতামত সুপারিশসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছে জমা দেন। বিগত সময়ে দল পুনর্গঠনে সেই সুপারিশগুলো আমলে নেয়া হয়নি। ওই সুপারিশের ভিত্তিতে দল পুনর্গঠন করা হলে দলের সাংগঠনিক ভিত এত দুর্বল হতো না বলে মনে করেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। দুই দফা আন্দোলনে ব্যর্থ হওয়ার পর আবারও দল গোছানোর দাবি জোরালে হয়ে উঠছে।
যুগ্ম মহাসচিবদের দেয়া ওই সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল দলের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা ও দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব স্বচ্ছ রাখা, পরিবারতন্ত্র বাতিল করে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে দলের নেতৃত্বে সৎ, যোগ্য, মেধাবী ও ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে, সেসব নেতার মূল নেতৃত্বে না রাখার সুপারিশে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। তবে দ্বন্দ্ব নিরসনে সব পর্যায়ে দলকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দল গঠনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। এছাড়া নেতৃত্ব বিকশিত করতে এক নেতার এক পদের বেশি না রাখতে বলা হয়েছিল ওই সুপারিশে। শুধু তাই নয়; জামায়াত সঙ্গ ছাড়তে এবং ওয়ান-ইলেভেনে যারা দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল তাদের দলীয় কোনো পদে না রাখতে তৃণমূলের সুপারিশ ছিল স্পষ্ট। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসব সুপারিশের সবগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় মনে করছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেতা নির্বাচনের অগ্রাধিকার দিয়েই দল পুনর্গঠনের কাজ শুরু করা হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ছয় বছর আগে দায়িত্ব পালন করা যুগ্ম মহাসচিব এবং বর্তমানে দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ওই সময়ে আমরা দলের যুগ্ম মহাসচিবরা দায়িত্ব পেয়ে এ কাজটি করেছিলাম। আমরা দুশ পৃষ্ঠার একটি সুপারিশমালা দলের হাইকমান্ডকে দিয়েছিলাম। এখনও তা বাস্তবায়ন হয়নি। হাইকমান্ড যদি ওই সুপারিশ আমলে নেয় তাহলে দল বেশ উপকৃত হবে বলে মনে করেন এই বিএনপি নেতা।
নোমান মনে করেন, দলের প্রয়োজনে যারা কাজ করেন তাদের মূল্যায়ন করা না হলে তারা আর দলের প্রয়োজনে ঝুঁকি নেবেন না। আন্দোলন-সংগ্রামে যারা নিষ্ক্রিয় ছিলেন, নিজে থেকেই নেতৃত্ব থেকে সরে গিয়ে সক্রিয় ও মেধাবীদের জায়গা করে দেয়া উচিত বলে মনে করেন বিএনপির এই নেতা।
দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাজাহান বলেন, ভবিষ্যতে দল পুনর্গঠনে ২০০৯ সালে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা যে সুপারিশমালা দলের হাইকমান্ডের কাছে জমা দিয়েছিলেন; সেগুলো এবার কাজে লাগবে। প্রয়োজনে এ রিপোর্টকে আরও তথ্যনির্ভর করা হবে বলে জানান তিনি।
এরই মধ্যে শনিবার রাতে আয়কর আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে খালেদা জিয়াও তার বক্তব্যের শুরুতে দলের পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিয়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, আমাদের দলের পুনর্গঠনে যেতে হবে। ইতিমধ্যে আমরা প্রক্রিয়াও শুরু করেছি। যারা ত্যাগী-পরীক্ষিত, যারা দলের বিপদের সময়ে কাজ করেছেন, তাদের কমিটিতে আনা হবে। তাদের মূল্যায়ন করা হবে।
যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাজাহান বলেন, আমাদের দলের প্রধান দল পুনর্গঠনের ব্যাপারে যে ঘোষণা দিয়েছেন তা সময় উপযোগী। একটি গণতান্ত্রিক দলের দৃষ্টিভঙ্গি এ ধরনের হওয়া উচিত বলে মনে করেন এই নেতা। তিনি বলেন, দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে সম্পূর্ণরূপে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে দল পুনর্গঠন করা হবে। বিশেষ বিশেষ নেতাদের পছন্দ-অপছন্দকে কোনো গুরুত্ব দেয়া হবে না।
জানা গেছে, ২০০৯ সালের কাউন্সিলেও তৃণমূলের ওই সুপারিশ আমলে নেয়া হয়নি। ওয়ান-ইলেভেনে যারা জীবনবাজি রেখে দলের হয়ে কাজ করেছেন তাদের অনেককেই সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।
দল পুনর্গঠন ও খালেদা জিয়ার ঘোষণা বিষয়ে দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) এর আগেও এমন ঘোষণা দিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এর আগে দল পুনর্গঠনের দায়িত্বে যারা ছিলেন, তারা ছিলেন বিএনপির মধ্যে বিরাজমান কোনো না কোনো বলয়ের নেতা। যার কারণেই দলের যোগ্য বহু নেতাকর্মী দল থেকে ঝরে পড়েছেন। দলের বিশাল কর্মী ও সমর্থক থাকলেও শুধু সাংগঠনিক ভিত দুর্বল হওয়ার কারণে পদে পদে বিএনপিকে রাজনীতির মাঠে হারতে হয়েছে। যদি ২০০৯ সালে তৃণমূলের মতামত গ্রহণ করা হতো তাহলে দলকে এ অবস্থায় পড়তে হতো না।
দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মনে করেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে বিএনপির বিষয়ে সরকারের মনোভাব বেশ কঠোর। এ অবস্থায় দল পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে যদি ত্যাগীদের মূল্যায়ন যথাযথভাবে না হয়; সেক্ষেত্রে দলে ত্যাগী ও যোগ্য নেতারা হতাশ হয়ে পড়বে। অনেকেই রাজনীতি ছেড়ে দিতে পারেন। যার প্রভাব পড়বে দলের সাংগঠনিক শক্তিতে। বর্তমান অবস্থা থেকে দল আরও দুর্বল হবে। আর এই সুযোগটাই ক্ষমতাসীন সরকার নিতে চাইবে।
তৃণমূল নেতাদের মতে, দল পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ নেতাদের দায়িত্ব দিয়ে যোগ্য ও ত্যাগীদের মূল্যায়ন করতে হবে। বিশেষ করে যাদের সঙ্গে তৃণমূলের সম্পর্ক রয়েছে তাদেরই দল পুনর্গঠনের দায়িত্ব দিতে হবে। দল পুনর্গঠনের পুরো প্রক্রিয়া দলের চেয়ারপারসনকে সরাসরি মনিটরিং করা উচিত বলে মনে করেন তারা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদারবক্স হলের সাবেক ভিপি অধ্যক্ষ বাহাউদ্দিন বাহার বলেন, আমাদের পরে আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। আমাদের সমসাময়িক অনেকেই দল ক্ষমতায় আসার পর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন। কিন্তু আমার মতো অনেকেই পদ-পদবি ছাড়া বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছি। ৯৬, ওয়ান-ইলেভেন এবং বর্তমান সরকারবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে অবদান রেখে যাচ্ছি। বিশেষ কোনো কেন্দ্রীয় নেতার বিরোধিতার কারণেই তাদের এ অবস্থা। আশা করি, দলের হাইকমান্ড এবার তাদের মূল্যায়ন করবে।
ঢাকায় ওয়ান-ইলেভেনে ভূমিকা রাখা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক তাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় ৯৬ সরকারবিরোধী আন্দোলন করেছি। ওয়ান-ইলেভেনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দলের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেছি। এখনও করছি, যা দলের হাইকমান্ড অবগত। আশা করি, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি দল পুনর্গঠন করা হয় আমাদের মূল্যায়ন অবশ্যই হবে। আমরাও চাই ২০০৯ সালের তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে দলের হাইকমান্ডকে দেয়া সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করা হোক।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসম হান্নান শাহ বলেন, ত্যাগী বা পরীক্ষিত- এটা দলের চেয়ারপারসন তিনি নিজে মূল্যায়ন করবেন। তবে ত্যাগী-পরীক্ষিত হলেই চলবে না, দলের নেতৃত্বে আসতে হলে তাকে উপযুক্তও হতে হবে। এ বিষয়টিও আমলে নিতে হবে দলের প্রধানকে। কারণ ত্যাগী হলেই একজন সাধারণ সৈনিক সেনাপতি পদে আসীন হতে পারেন না বলে মত দেন এ বিএনপি নেতা। যুগান্তর

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *