মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

চাষের জমিতে বনায়ন: নতুন সম্ভাবনা

এগ্রোফরেস্ট্রি বা কৃষি বনায়নের ধারণা বাংলাদেশে নতুন হলেও অন্যান্য দেশে পুরনো। দেশের জমি কমছে, জনসংখ্যা বাড়ছে কিন্তু উৎপাদন বাড়ছে না। যেখানে ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন সেখানে আছে ৯ থেকে ১০ ভাগ। এ জন্য একই ভূমিতে ফসল, পশুপাখি ও মাছ পর্যায়ক্রমে বা একই সঙ্গে গাছ রোপণ করাই হচ্ছে কৃষি বনায়ন। মূল কথা হচ্ছে, এক ইঞ্চি জমি ও জলাশয় যাতে একদিনও পতিত না থাকে। এতে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়, পাশাপাশি পরিবেশও ভালো থাকে। মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণ উন্নত হওয়ার ফলে ফসল উৎপাদনে সার কম লাগে এবং ফসল উৎপাদনে ঝুঁকি কমে। ফসল, গাছ, পশুপাখি ও মাছের আন্তঃক্রিয়ায় পরস্পর উপকৃত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ফসল রক্ষা পায়।4_250623
দেশের সব অঞ্চলেই ধান, পাট, গম, শাকসবজি, ডাল, আখসহ প্রায় সব ফসলের জমিতে ও আইলে বহুবর্ষজীবী গাছ লাগানো যায়। এসব জমিতে কম ছায়াদানকারী, কম শিকড় বিস্তারকারী, মাটির গভীরে প্রবেশকারী শিকড় সম্পন্ন গাছ রোপণ করা হয়। যেমন- নিম, খেজুর, বাবলা, লিচু, বেল, বাঁশ ইত্যাদি। বসতবাড়ির আঙিনার ফাঁকা জায়গায়- নিম, বহেড়া, হরীতকী, তুলসী, আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, পেঁপে, বেল ইত্যাদি গাছ রোপণ করা যায়। দেশে পতিত ও প্রান্তিক জমি আছে প্রায় ১.৩ মিলিয়ন হেক্টর। এসব জমিতে প্রায় সব ধরনের গাছ রোপণ করা যায়। এসব গাছের ছায়ার নিচে আদা ও হলুদ চাষ করা যায়। পুকুর, নদী, নালা, খাল-বিল, হাওর, বাঁওড়সহ বিভিন্ন জলাশয়ের পাড় দিয়ে পেঁপে, লিচু-পেয়ারা, বেল, শাকসবজি চাষ করা যায়।
নাইরোবিতে (কেনিয়া) আন্তর্জাতিক কৃষি বনায়ন গবেষণা কাউন্সিল সারা বিশ্বে কৃষি বনায়ন করার জন্য সহযোগিতা করছে। বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান কৃষি বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এ জন্য বিভিন্ন দাতাসংস্থা আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা করছে। দেশে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা কৃষি বনায়ন কর্মসূচিতে ব্যয় হচ্ছে। ইতিমধ্যে ফরিদপুর, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ বেশ কিছু জেলায় কৃষি বনায়ন করা হচ্ছে।
যেহেতু কৃষির সঙ্গে সঙ্গে গাছের সমন্বয় সাধন করে একই জমিতে কৃষি বনায়ন করা হয়, তাই কিছু সমস্যাও আছে। যেমন- সঠিক পদ্ধতিতে গাছ ও ফসল চাষাবাদ না করলে স্থান, সূর্যরশ্মি, পানি ও পুষ্টি নিয়ে প্রতিযোগিতা হবে। এতে ফসল কম হবে। এ ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে গাছ ও ফসল নির্বাচন করতে হবে। গাছ ও ফসলের রোগবালাই পরস্পরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। গাছের বৃদ্ধিতে বিলম্ব হতে পারে। সেচের পরিমাণ বেশি লাগে। নিচু জমিতে বন্যার পানিতে গাছ মারা যেতে পারে। জমি চাষ ও ফসল পরিচর্যায় অসুবিধা হয়।
ফসল কাটার পরই বড় বড় গাছের চারা ৩০ থেকে ৪০ ফুট দূরে দূরে রোপণ করতে হবে। বর্ষাকালে চারা রোপণ করা সবচেয়ে ভালো। এক সারি ফলদগাছ এক সারি বনজগাছের মাঝে মাঠে ফসল বোপণ করা যায়। পাহাড়ের নিচ থেকে ওপরে একান্তভাবে ইপিল ইপিল-ভুট্টা, ইপিল ইপিল-ধান, ইপিল ইপিল-সয়াবিন চাষ করা যায়। সমতল ভূমিতে এক সারি ইপিল ইপিল এক সারি মাঠফসল পরের সারি বকাইন গাছ রোপণ করা যেতে পারে।
ফসলের চাষাবাদ স্বাভাবিক নিয়মে করতে হবে। গাছের চারা রোপণ একটু সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে যাতে ফসলের কোনো ক্ষতি না হয়। গাছ মাটির গভীরে রোপণ করতে হবে। প্রতি বছর জমির ফসল কাটার পর গাছের ডালপালা ছেঁটে দিতে হবে। এ ছাড়াও কোনো ডালপালা রোগাক্রান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে ছেঁটে দিতে হবে। সাধারণত ফলদ গাছে ফলধারণের পর এবং বনজ গাছ ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে ছাঁটাই করলে গাছের জন্য উপকার হয়। শিকড়ের বেশি বিস্তার হলে শিকড় ছাঁটাই করা যেতে পারে। যেসব ডালপালা ছায়া দেয় সেসব ডালপালা ছেঁটে দিলে গাছের কোনো ক্ষতি হবে না।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *