রাজধানীর আট শতাধিক মাদক স্পট নিয়ন্ত্রণ করছে দুর্ধর্ষ আড়াই সহস্রাধিক ফেরারি আসামি। পুলিশের খাতায় বছরের পর বছর ধরে পলাতক এ আসামিরা ‘ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইন ও মদের স্পট’ বানিয়ে মাদক বেচাকেনার আলাদা সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। একেকজনের বিরুদ্ধে মাদক বেচাকেনা, চোরাচালান, হত্যাসহ লুটপাট, ছিনতাই, চাঁদাবাজি সংক্রান্ত ১০-১২টি করে মামলা রয়েছে।
এসব মাদকসম্রাট, চিহ্নিত অস্ত্রবাজ ও পেশাদার অপরাধীদের নামসহ তাদের মাদক আখড়াগুলোর তালিকা পুলিশ, ডিবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে রয়েছে। প্রতি বছর সে তালিকা পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। মাঝেমধ্যে লোক-দেখানো অভিযান চলে প্রশাসনের। আটক হয় খদ্দের ও নিরপরাধ পথচারী। সোর্সদের মাধ্যমে পথচলা মানুষের পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়েও গ্রেফতার-হয়রানির অসংখ্য নজির রয়েছে। বেপারিদের সঙ্গে থানা, পুলিশ, প্রশাসনের দহরম-মহরম সম্পর্ক। মাদকের মাসহারা লেনদেনের গোপন সমঝোতার সম্পর্ক গভীর বন্ধুত্বে পৌঁছেছে।
পুলিশ সদর দফতরের এক তালিকায় দেখা যায়, ডিএমপির বিভাগ অনুযায়ী রমনায় ৭৪টি, লালবাগে ৯০টি, ওয়ারীতে ১১৫টি, মিরপুরে ১২৫টি, গুলশানে ১১২টি, উত্তরায় ৬৮টি, মতিঝিলে ১২২টি, তেজগাঁওয়ে শতাধিক মাদক স্পট রয়েছে। রাজধানীর সর্বত্রই মাদক ব্যবসায়ী আর নেশাখোরদের চলছে দাপুটে ছোটাছুটি। ছয় মাস আগেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রেকর্ডপত্রে ৫৪২টি মাদক স্পট ছিল, এখন সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০০-তে।
বনানী থানা এলাকায় মাদকের বেশ কয়েকটি ঘাঁটি গড়ে উঠেছে ইদানীং। সাততলা বস্তি এলাকায় জামরুল, কামরুল, সীমা, পিংকু, রুমা, রুবেল, জামাই নাজিমুদ্দিন ও সোহেল জমজমাট মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। মহাখালী বাসস্ট্যান্ড পয়েন্টে রিজু, মানিক, গেন্দা বাবু গড়ে তুলেছে পাইকারি মাদক সরবরাহের জমজমাট ব্যবসা। মাস্টার আলমগীর, জলিল, বেলতলার ফুল মিয়া, নূরুসহ সাত-আট জন। তাদের সবার বিরুদ্ধেই মাদক-সংক্রান্ত ২০-২২টি করে মামলা আছে। গ্রেফতার-হাজতবাসও করেছে কয়েক দফা। এর পরও তাদের মাদক ব্যবসা বন্ধ করা যায়নি। দক্ষিণ বাড্ডা বাজার-সংলগ্ন এলাকার জনৈক রহমত আলীর সিন্ডিকেট এখন বাড্ডা, গুলশান, বনানীতে ইয়াবা বাণিজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে। থানা পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে মাসহারা লেনদেন থাকায় রহমতের সিন্ডিকেট বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে। বাড্ডা থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার গলায় গলায় ভাব। থানার পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে ‘বাবা রহমত’ বলেই সম্বোধন করেন। রহমত সিন্ডিকেটের অন্তত ৩০ জন সদস্যের ইয়াবা কেনাবেচা ও সরবরাহের কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বাড্ডাকে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের খোলাবাজারে পরিণত করা হয়েছে। সেখানে মাদকবিরোধী টুঁ শব্দটি করার জো নেই। বাড্ডার মোল্লাপাড়ায় বাজারগলিতে ফেনসিডিল ও ইয়াবার বড় স্পট। মাদক আস্তানাটি পরিচালনা করে মোজাম্মেল, ফজলু, ফর্মা শহিদ, ফর্মা টিপু। এরা সবাই জয়নাল বাহিনীর সদস্য। কবরস্থান রোডের পাঁচতলা এলাকার বড়টেকে গড়ে তোলা মাদক স্পটটি পরিচালনা করে জয়নালের সহযোগী সাইফুল, কামরান এবং পাশের অন্য মাদক স্পটটি চালায় বাঁধন, পল্লব, ভাগ্নে ফরিদ ও জয়। বাড্ডার আনন্দনগর এলাকার মসজিদ-সংলগ্ন গলিতে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে জয়নাল বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড জামাই বাছেদ, আলী, নূরনবী, রাসেল, রমজান, বেল্লা, রফিক, চাঁড়াইলা রিপন ও ফর্মা শহিদ। আফতাবনগরে ইস্ট ওয়েস্ট ভার্সিটির অদূরে মাদক পরিচালনা করে জয়নালের ভাই বেল্লাল। ডালিম, সোহেল, ফরিদ আফতাবনগরে ট্রাক ঢুকলেও চাঁদা আদায় করে থাকে। থানা-সংলগ্ন পশ্চিম পাশে জয়নালের অফিসে আছে টর্চার সেল। সেখানেই মাদকের মজুদ থাকে নির্বিঘ্নে। থানা ভবনের এত কাছে মাদকের আস্তানা গড়ে তোলার নজির কোথাও দেখা যায় না। প্রতি রাতেই সেখানে বসে জমজমাট জুয়ার আসর।
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় মাদক : রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ছত্রচ্ছায়ায় ও নেতৃত্বে মাদক বাণিজ্যসহ সীমান্তের চোরাচালান অব্যাহত থাকায় সর্বত্রই আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসনকে। রমনা ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় টুটুল ও মিঠু ইয়াবা ও ফেনসিডিলের ব্যবসা করে কেন্দ্রীয় এক ছাত্রলীগ নেতার সহযোগিতায়। সেগুনবাগিচায় ফরিদপুর ম্যানসনের ওপরে রিপন নামে কথিত ছাত্রলীগ নেতার মাদকের আসর চলছে। গুলশানে সি-সেল বারের ওপর মিনিবার চলছে রফিক নামের এক কথিত ছাত্রলীগ নেতার মাধ্যমে। গুলশানের ৪৩ নম্বর রোডসহ কয়েকটি এলাকায় অনুমোদনহীন বার চলছে এক মন্ত্রীর ছেলের নামে। কক্সবাজারের এমপি বদির আত্মীয় বলে পরিচিত কাঁঠালবাগানের বাসিন্দা সবুজের কাছে আসে ইয়াবার বড় বড় চালান। পল্লবীর গডফাদার বাচ্চু পুরো এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে।
মাদকসম্রাজ্ঞীরা চালান ৭০ স্পট : সাম্প্রতিক সময়ে মাদক ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে নারীরা। রাজধানীর শতাধিক মাদক স্পট চালাচ্ছেন মাদকসম্রাজ্ঞীরা। তাদের নিয়ন্ত্রণে অন্তত ৫০০ মহিলা পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছেন। লালবাগের আলোচিত মাদকসম্রাজ্ঞী মনোয়ারা আর ইসলামবাগের ছাফি। এ ছাড়া মুন্নি, টগর, তামান্না ও ময়ূরীর মাদক নেটওয়ার্কও ব্যাপক তৎপর রয়েছে। রাজধানীর প্রধান প্রধান মাদক স্পটগুলোর মধ্যে আনন্দবাজার বস্তি অন্যতম। এখানে রয়েছে মাদকসম্রাজ্ঞী হিসেবে চিহ্নিত বানুর মাদক স্পট। এর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে নিমতলী বস্তির সাবিনা ও পারুলের। পাইন্যা সর্দারের বস্তির রেণু; গণকটুলির মনোয়ারা ও নাছিমা; শ্যামপুরের ফজিলা, রানী বেগম ও পারুলী; শাহীনবাগের পারভীন; তেজকুনিপাড়ার সনি, হীরা ও রাজেদা; হাজারীবাগের স্বপ্না; কলাবাগানের ফারহানা ইসলাম তুলি; চানখাঁরপুলের পারুল; বাড্ডার সুমি; রামপুরার সীমা; শাহজাহানপুরের মুক্তা বিশেষভাবে ড্রাগ কুইন হিসেবে চিহ্নিত।
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি.কম/Newsworldbd.com



Leave a Reply