মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

প্রবাসে বসে মা’কে মনে পড়ে

হক মো. ইমদাদুল, টোকিও (জাপান) থেকে:  যে দিন তুমি এসেছিলে ভবে, তুমি শুধু কেঁদেছিলে হেসেছিল সবে৷’ কেন কেঁদেছিলাম আদৌ কারণটা জানা হয়নি৷ যখন কেঁদেছিলাম কারণটা ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন একমাত্র মা৷ ওই কান্নার কোনো পূর্ব পর্যবেক্ষণও তিনি কখনোই করেননি৷ ভাবতে অবাক লাগে, যে বিষয়ে কোনো জ্ঞান নেই অথচ ঠিক সময়ে ঠিক কারণটি মা বুঝেছিলেন৷ তা কেমন করে হয়? দীর্ঘ সময় নিজের দেহের অন্তরালে তিল তিল করে বড় করলেন৷ এক সময় এই পৃথিবীর আলো দেখাতে গিয়ে তিনি তাঁর নিজের জীবনের সব কিছু উৎসর্গ করে দিলেন৷
তারপর শুরু হয় জীবন যুদ্ধের৷ মধ্যরাতে আমার কান্নায় ঘুম থেকে নির্দ্বিধায় মা উঠে পড়েন বিছানা ছেড়ে৷ হোক গরম, হোক শীত, মাঝরাতে আমার কান্না বন্ধ করতে গিয়ে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি৷ মা উঠেপড়ে লেগে গেলেন আমার সেবায়৷ মা তার বিনিময়ে কি পাবেন? নিশ্চয় এই হিসাব-নিকাশটি একবারও করেননি৷ প্রচণ্ড শীতের মাঝরাতে চরম ঠান্ডার মধ্য দিয়ে রাত কাটান একমাত্র মা৷ এই কারণটাও ছিল আমার, অসময়ে মূত্র নিষ্কাশন৷ কই মাতো একবারও রাগ করলেন না? কখনো বা কারও সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করে একবারও আমার বদনাম করলেন না?

মা নিজের কথা ভুলে গিয়ে এক মালিনীর মতো তিল তিল করে আমার সেবা করেই চলছেন৷ যেমন একটি তুলা ফুলের সামনে আশা নিয়ে বসে থাকে একটি কাক৷ ফুল ফুটতেই কাক কিছু একটা খেতে পাবে এই আশায়৷ বোকা কাকের মতো মাও নিজের সব কিছু উজাড় করে দিয়ে ছেলের সেবা করতে থাকেন যেন বড় হয়ে তাঁর ছেলে ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার হয়৷ আবার কোনো কোনো মা এমন এক আশা বুকের মাঝে পুষতে থাকেন, যেন আমার ছেলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যা সাগরের মতো হয়৷ মা যখন বৃদ্ধ হবেন, যখন অসুস্থতায় কাতর হয়ে ছেলের মুখখানি একনজর দেখার কথা ভাববেন, ঠিক তখনই যেন ছেলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যা সাগরের মতো দূর-দূরান্ত থেকে পাখি হয়ে মায়ের চোখের সামনে নিমেষের মাঝে হাজির হয়৷

মায়ের এই কল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রবাসে বসবাসরত আমরা ছেলেরা কতখানি উদগ্রীব? আমরা নিজের জীবনের আনন্দের জন্য নিজের স্বার্থটাই বড় করে দেখলাম, মাকে ছেড়ে দূর প্রবাসে জীবনযাপন করতে শুরু করলাম৷ আমরা ছেলেরা খানিকটা স্বার্থপর বললে হয়তো ভুল হবে না৷ আমরা মাস শেষে কিছু অর্থ পাঠাই, মায়ের সঙ্গে বার কয়েক ফোনে কথা বলি বা মায়ের জন্য সাহায্যকারীর ব্যবস্থা করি৷ এতে করে মায়েরা হয়তো খানিকটা বাহ্যিক সুবিধাদি ভোগ করেন৷ কিন্তু এতে কি মায়ের মনের চাহিদাটা পূরণ হয়? নিশ্চয় নয়৷

মায়ের বাহ্যিক চাহিদা পূরণ হলেও মনের চাহিদার অভাবটা থেকেই যায়৷ মা তখন হয়তো ভাবতে বসেন, এই দিনের জন্যই কী ছেলেকে লালন-পালন করেছিলাম? এর অর্থ এই নয়, মা ছেলের অমঙ্গলের জন্য কিছু বলছেন৷ মা ছেলের মুখখানা এক নজর দেখবেন, এই আকাঙ্খায় অস্থির হয়ে থাকেন৷ কারণ আমরা ছেলেরা মায়ের কাছে একটি আয়নার মতো৷ মা আমাদের দেখতেই অতীতের সকল কষ্ট ভুলে থাকতে পারেন৷ মা ছেলেদের সুস্থ মুখ দেখতেই মনে করেন নিজেই সুস্থ আছেন।

আমরা ছেলেরা মায়ের চোখের আড়াল হতেই মা তাঁর অতীতের সমস্ত কষ্টটা যেন চোখের পাতায় স্পষ্ট দেখতে পান৷ কাউকে কিছুই বলেন না, শুধুই ভাবতে থাকেন, যার জন্য এই জীবন উজাড় করে দিলাম, সে একটুও আমার কথা ভাবল না?

আমরা প্রবাসী ছেলেরা মায়ের মন কতখানি বুঝলাম? এক সময় মা হয়তো চিরতরে বিদায় নিয়ে যাবেন৷ তারপর আমরা ছেলেরা প্রবাস থেকে শুধুই ভাবতে থাকব, মা থাকতে মার জন্য কিছুই করতে পারলাম না৷ কথায় বলে দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দাও৷ প্রত্যেক ছেলের জীবনে মা একটি শক্ত দাঁতের মতো৷ মা জীবিত থাকতে সঠিক মর্যাদা দেওয়ার কথা একবারও ভাবিনি, অথচ হারানোর পর নিজেকে শুধু ধিক্কার দেই৷ দূর-দূরান্ত থেকে মা আমাদের সকল কষ্টটা বুঝতে পারেন৷ কিন্তু আমরা ছেলেরা মায়ের কষ্টটা কতখানি বুঝতে পেরেছিলাম? আমরা ছেলেরা আজীবন মায়েদের চোখের মণি। আর মা আমাদের মাথার তাজ৷ মায়ের কোনো বিকল্প নেই, মায়ের বিকল্প শুধুই মা৷ নিঃস্বার্থ ভালোবাসার শাশ্বত প্রতীক পৃথিবীতে সকলের মা৷ আমার অপরাধ নিও না মা, আমায় বদ দোয়া দিও না, মা তুমি যেখানেই থাকো ভালো থেকো৷

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *