মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

১৩ হাজার স্কুলে নিয়োগ স্থগিতে এমপিদের বাণিজ্য বন্ধ

প্রায় ১৩ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগ স্থগিত করা হয়েছে। হাইকোর্টের এক আদেশের পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সেটি স্থগিত করে। গত ১২ মে স্থগিত করা ওই আদেশের কপি এরই মধ্যে মাঠ পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশে বলা হয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি নিয়োগের জন্য জারি করা নীতিমালার ওপর রুল জারি করেছে Primary-school-building-3হাইকোর্ট। রুলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দপ্তরি নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। প্রায় ১৩ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগের ক্ষমতা পেয়েছিলেন সংসদ সদস্যরা। দেশের প্রায় ৩৭ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম প্রহরী নিয়োগের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ অর্থাৎ তৃতীয় ধাপে এসে নীতিমালা সংশোধন করে গত ২৬ জানুয়ারি সংসদ সদস্যদের এই ক্ষমতা দেয়া হয়। আগের দুই ধাপের নিয়োগে প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হলেও এবার তা বাদ দেয়া হয়েছে। একইভাবে আগের দুই ধাপে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হলে অভিযোগ করার সুযোগ রাখা হলেও এবার সেই সুযোগও রাখা হয়নি। আগামী জুনের মধ্যে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা। আগের দুই ধাপের নিয়োগের ক্ষেত্রে সারা দেশেই ব্যাপক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। আর নতুন নীতিমালার আলোকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দলীয়করণের অভিযোগও যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মূলত এই আশঙ্কাকে সামনে রেখেই দপ্তরি নিয়োগের নীতিমালার ওপর রিট করেন নাটোর সদর উপজেলার বাসিন্দা এ জেড মশিউর মোল্লা।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব জোতির্ময় বর্মণ বলেন, নীতিমালার ওপর রিট হয়েছে। হাইকোর্ট নিয়োগ স্থগিত রাখতে বলেছে। আমরা এখন জবাব দেব। কোনো প্রকার অনিয়মের জন্য কি হাইকোর্টে নীতিমালার ওপর রিট হয়েছে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এই নিয়োগে কোনো দুর্নীতি হয়েছে কিনা-এ প্রশ্নেরও জবাব দেননি।

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যকে ২ লাখ টাকা দিয়েছেন জনৈক টেনু মিয়া।  তার ছেলেকে নিয়োগ দিতে উপজেলার ৬ নম্বর মিরপুর ইউনিয়নের মেম্বার মো. কদ্দুছ মিয়ার মাধ্যমে এমপিকে তিনি এই টাকা দেন। টেনু মিয়ার বক্তব্য, ছেলের চাকরির জন্য জমি বিক্রি করে টাকা দিয়েছেন।

জানতে চাইলে স্থানীয় এমপি মো. আব্দুল মুনিম চৌধুরী বাবু বলেন, দপ্তরি নিয়োগের জন্য আমি কোনো টাকা নিইনি। হয়তো আমার নামে কেউ ‘হয়রানি’ করেছে। আর মেম্বার কদ্দুছ মিয়া বলেন, আমি টাকা নেব কেন? নিয়োগের জন্য আমাকে কেউ টাকা দেয়নি।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগের চিত্র শুধু এই একটিই নয়, প্রায় সারা দেশেই এমন চিত্র রয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলাওয়ারি ‘ঘুষের’ পরিমাণও কমবেশি আছে। টাকা না দিলে নিয়োগই হচ্ছে না। সব টাকাই নেয়া হচ্ছে স্থানীয় এমপিদের জন্য। কারণ তিনি যাকে সুপারিশ করবেন তাকেই নিয়োগ দিতে বাধ্য কমিটি। এরকম পরিস্থিতিতে নিয়োগ স্থগিত করেছে আদালত। এমন খবরে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। দেশের বিভিন্ন স্থানের ১২ জন এমপি এ প্রতিবেদককে বলেছেন, দপ্তরি নিয়োগ স্থগিত হয়ে গেছে। এখন কী হবে-জানতে চাইলে তাদের অনেকে বলেছেন, ‘প্রার্থীদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাখা হচ্ছে’।

এর আগে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগে রংপুরের বদরগঞ্জ ও খাগড়াছড়ির যুগ্ম জেলা জজ আদালতে বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার তিনটি ও নাচোলের দুটি বিদ্যালয়ে নিয়োগ নিয়েও মামলা হয়েছে। রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় এই পদে চাকরিপ্রার্থীদের ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা করে গুনতে হয়েছে বলে একাধিক সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরেও এ নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের ৩৬ হাজার ৯৮৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন করে দপ্তরি কাম প্রহরী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১২-১৩ অর্থবছরে। প্রথম বছর নিয়োগ দেওয়া হয় ১২ হাজার। এরপর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে নিয়োগ দেয়া হয় আরো ১২ হাজার। এ বছর নিয়োগ দেয়ার কথা ১২ হাজার ৯৮৮ জন।

আগের দুই বছরের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বাছাই ও নিয়োগ কমিটি ছিল তিন সদস্যের। সভাপতি ছিলেন বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির (এসএমসি) সভাপতি। সদস্য ছিলেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ওই নিয়োগ প্রক্রিয়া ছিল স্থানীয়ভাবে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়কেন্দ্রিক। চলতি বছরের নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর আগেই সংশোধন করা হয়েছে এই নিয়োগ নীতিমালা। নতুন নীতিমালায় বাছাই ও নিয়োগ কমিটিতে আরো তিনজন সদস্য যুক্ত করে ছয় সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) সভাপতি করে এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের দুজন প্রতিনিধিকে সদস্য রাখা হয়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিনিধির পরিবর্তে এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যান নিজেরাও সরাসরি কমিটিতে উপস্থিত থাকতে পারবেন। বিগত দুই বছরের কমিটিকে বৈধ আবেদনকারীদের মধ্য থেকে ২০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করে শারীরিকভাবে যোগ্য তিনজনের একটি প্যানেল প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি বরাবর পাঠাতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সংশোধিত নীতিমালায় বাছাই ও নিয়োগ কমিটিকে তিনজনের একটি তালিকা তৈরি করে দিতে বলা হয়েছে। এর মধ্য থেকে সংসদ সদস্য যাকে নিয়োগের সুপারিশ করবেন তাকেই নিয়োগ দিতে পারবেন।

আগের নীতিমালায় নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্ত করার এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জেলা শিক্ষা কমিটিকে তা নিষ্পত্তি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সংশোধিত নীতিমালায় এ রকম অভিযোগ দায়েরের সুযোগ বাতিল করা হয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুসারে নিয়োগ প্রক্রিয়া হবে উপজেলাকেন্দ্রিক।

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগে এই নিয়োগের ক্ষেত্রে এমপি সাহেবদের কর্তৃত্ব পরোক্ষ ছিল, এখন সরাসরি হলো। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের প্রতিনিধি যুক্ত হওয়ার ফলে ব্যাপকহারে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও নিয়োগ বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হলো। আর এ কারণেই নীতিমালার ওপর রিট হয়েছে এবং দপ্তরি পদে লোক নিয়োগ স্থগিত হয়ে আছে।

দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগ প্রার্থীর বয়সসীমা সর্বনিম্ন ১৮ বছর এবং সর্বোচ্চ ৩০ বছর। মুক্তিযোদ্ধাদের পোষ্যদের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৩২ বছর পর্যন্ত শিথিলযোগ্য। প্রার্থীর সর্বনিম্ন শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস। এ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সাইকেল চালনায় পারদর্শী, সুঠাম দেহের অধিকারী পুরুষ প্রার্থীদের নির্বাচন করতে হবে। তাদের বেতনভাতা হবে সর্বোচ্চ ৭ হাজার টাকা।

(আজকের পত্রিকার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক অভিজিৎ ভট্টাচার্যের বিশেষ প্রতিবেদন)

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *