মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের হৃদয় জয় করতে চান নরেন্দ্র মোদি

নিজ দেশই নয়, এশিয়ার নেতা হওয়ার পথে এগোচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রতিদ্বন্দ্বী চিনকে টপকে ভারতকে এশিয়ার নেতৃত্ব নেওয়ার পথে অত্যন্ত সতর্কভাবে তিনি পা ফেলছেন। এরই অংশ হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক উন্নয়নে অংশীদারত্বমূলক ব্যবস্থার যে পরিকল্পনা তার রয়েছে তাতে বাংলাদেশকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি। এর ফলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নয়নে রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলছেন তিনি। তার আসন্ন ঢাকা সফরে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ৬ জুন ৩৬ ঘণ্টার ঢাকা সফরে আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সফরকে সামনে রেখে এখন দুদেশের পররাষ্ট্র দপ্তরই জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতোমধ্যে তার নিরাপত্তার বিষয়ে ঢাকায় এসে কাজ শুরু করেছে ৬ সদস্যের একটি অগ্রবর্তী দলও।

Narendra_Modi২০১৪ সালের মাঝামাঝি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ভারতের সরকার গঠন করার পর আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজের অবস্থান জানান দিতে শুরু করেন কট্টরপন্থী রাজনীতিক নরেন্দ্র মোদি। ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ এ সেøাগান নিয়ে নরেন্দ্র মোদি উন্নয়নের নতুন তত্ত্ব হাজির করেন সবার সামনে। এরই অংশ হিসেবে তিনি এরই মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী চিনসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেন। এবার তার বাংলাদেশ সফরের পালা। এ সফরের আগেই তিনি স্থলসীমান্ত চুক্তি বিলটি পাস করেছেন। তিস্তা নদীর পানি চুক্তি বিষয়েও প্রণিধানযোগ্য আলোচনার আভাস দিয়েছেন ইতোমধ্যেই।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল অমীমাংসিত ইস্যুর সমাধানই নয়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের উন্নয়নও চান নরেন্দ্র মোদি। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিকটতম প্রতিবেশী বাংলাদেশেও সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করুক তা তিনি চান।

রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশের প্রশ্নবিদ্ধ গণতান্ত্রিক পরিবেশ সম্পর্কে নরেন্দ্র মোদি সম্যক ওয়াকিবহাল। তিনিও চান বাংলাদেশ এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসুক। এ জন্য ভেতরে ভেতরে তিনি কাজ শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে স্থলসীমান্ত চুক্তি বিল পাস এবং তিস্তা চুক্তি নিয়ে নরেন্দ্র মোদির ইতিবাচক মনোভাবকে তাই বিএনপির পক্ষ থেকেও স্বাগত জানানো হয়েছে।

ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত বছর সেপ্টেম্বরে নরেন্দ্র মোদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। এরপর গত জানুয়ারিতে বারাক ওবামা ভারত সফর করেন। দুই প্রভাবশালী প্রধানমন্ত্রীর এ সফরবিনিময়ে মূলত এশিয়ার নেতৃত্বে নরেন্দ্র মোদিকে অধিকতর সক্রিয় হওয়ার বার্তা দিয়েছেন বারাক ওবামা। সেইসঙ্গে এ অঞ্চলের শান্তি-স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে তার নিজ পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও উদ্যোগী হন নরেন্দ্র মোদি। এ অবস্থায় বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনেও তিনি প্রচ্ছন্ন ভূমিকা রাখতে পারেন বলে অনেকে মনে করছেন। তবে ঢাকা সফরে এসে তিনি কী বার্তা দেন- আপাতত সে পর্যন্তই অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও স্বনামধন্য কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল হোক সেটা নরেন্দ্র মোদি চান। সেইসঙ্গে তিনি দুদেশের সম্পর্কের অগ্রগতিও দেখতে চান। সে হিসেবে উনি পরামর্শও রাখতে পারেন। তবে সবার আগে আমাদের বাস্তব অবস্থার দিকে তাকাতে হবে।

ঢাকার রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, দীর্ঘ সংঘাতের পর বর্তমানে একটা স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। এই স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের ভূমিকা রয়েছে। চলতি বছরের শেষে কিংবা ২০১৬ সালের মাঝামাঝি একটি অংশগ্রহণমূলক নতুন জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের যে গুঞ্জন আকাশে ভাসছে তার পেছনে এ দুটি দেশই মূল ভূমিকা পালন করছে বলেও অনেকে মনে করেন। যদিও আপাতত এমন গুঞ্জনকে স্রেফ গুজব হিসেবেই দেখতে চাইছেন রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদি প্রতিবেশী দেশগুলোকে নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশকে রেখেছেন বিশেষস্থানে। ভৌগোলিক অবস্থান, বড় আকারের অর্থনীতি এবং উন্নয়নে গতিশীলতার কারণে বাংলাদেশের এই গুরুত্ব বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাই আঞ্চলিক যোগাযোগ বা কানেকটিভিটি বৃদ্ধির মাধ্যমে এ অঞ্চলের অগ্রযাত্রায় মোদির যে পরিকল্পনা তাতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা একটা বড় ফ্যাক্টর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আমেনা মোহসীন বলেন, নরেন্দ্র মোদি ‘পূর্বমূখী নীতি’ নিয়ে এগোচ্ছেন। বিশ্বায়নের যুগে তিনি চাইছেন সব দেশকে নিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন। যার কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব যুৎসই হবে বলেও মনে করেন। আর সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, আঞ্চলিক নেতৃত্বে নরেন্দ্র মোদি এখন বেশ ভাল অবস্থানে থাকলেও তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়কে কতটুকু গুরুত্ব দেবেন সেটি দেখার বিষয়। তবে তিনি যে সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যেতে চান সে বিষয়টি পরিষ্কার। সে হিসেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয়টি নিয়ে তার পরিকল্পনা থাকাটা অযৌক্তিক নয়।

এদিকে আগামী ৬ ও ৭ জুন ঢাকায় নরেন্দ্র মোদির সম্ভাব্য সফরকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে তৎপর হয়ে উঠেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর আগে শনিবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ভারত সফরে গিয়ে প্রস্তুতিমূলক গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করেন। আগামী শুক্রবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীরও দিল্লি সফর করার কথা রয়েছে।

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ঢাকা সফরে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক সই করতে চায় বাংলাদেশ। দিল্লির সঙ্গে ওই সব চুক্তির খসড়া আদান-প্রদান চলছে। বৃহত্তর পরিসরে বাংলাদেশের সঙ্গে কানেকটিভিটি বাড়ানোর তাগিদ রয়েছে ভারতের পক্ষ থেকে। ভারতের তরফে বাংলাদেশকে নতুন করে কোটি ডলারের ঋণ দেওয়ার একটি ঘোষণা আসতে পারে। এ নিয়ে আলোচনা চলছে। এটি ১০০ কোটি কিংবা তারও বেশি হতে পারে বলে জানা গেছে। তবে তার এ সফরে তিস্তা চুক্তি সইয়ের বিষয়ে যে গুঞ্জন শুরু হয়েছে কোনো পক্ষ থেকেই এর সত্যতা পাওয়া যায়নি। এমনকি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও সফরে তিস্তা চুক্তি সই কিংবা সিদ্ধান্তমূলক কিছু হওয়ার বিষয়টি অযৌক্তিক এবং অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন।

নিউজওয়ার্ল্ডবিডি.কম/

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *