বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মুখে নরেন্দ্র মোদির স্লোগান

ভারতে গিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন ‘সব কা সাথ সব কা বিকাশ’। নরেন্দ্র মোদির দেওয়া শ্লোগান এর আগে শোনা গেছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির কণ্ঠে, এবার তা শোনালেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। কথাটা তিনি বললেন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নিরিখে। অর্থাৎ কি না ভারত ও বাংলাদেশের নিয়তি একই সুতোয় গাঁথা, দুটো দেশ একে অন্যের সাথে থাকলে পরষ্পরের বিকাশ বা উন্নতিও যে অবধারিত।

আর এই দুটো দেশ একই সাথে যে থাকবে, সেই ইঙ্গিতই মিলেছে দিল্লিতে হয়ে যাওয়া ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী-সংলাপ বা ফ্রেন্ডশিপ ডায়ালগের ষষ্ঠ রাউন্ডে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন বাংলাদেশ সফরের প্রাক্কালে আয়োজিত দুদিনের এই সংলাপে দুদেশের মন্ত্রী-আমলা-কূটনীতিক বা বিশেষজ্ঞরা যেভাবে যোগ দিয়েছেন, এত বড় মাপের আয়োজন এর আগে এই সংলাপের কোনও রাউন্ডেই হয়নি।

Shahriar-Alam-Indiaভারতের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের ম্যাপে বাংলাদেশের অবস্থান যে ক্রমেই আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, সেটা তারই প্রমাণ। পাশাপাশি আরও একটা নিদর্শন মিলল– নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার প্রতিবেশী বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারের সম্পূর্ণ আস্থা অর্জন করতে পেরেছে এই এক বছরেই। এক দিকে আওয়ামী লীগ পরম্পরাগতভাবে কংগ্রেস তথা গান্ধী পরিবারের ঘনিষ্ঠ এবং অন্য দিকে বিজেপি তাদের রাজনৈতিক ফায়দার জন্য বাংলাদেশ-বিরোধী নানা ইস্যুকে ব্যবহার করেছে। এগুলো মিথ হোক বা রিয়েলিটি, ঘটনা হল সে সব দূরে সরিয়ে রেখেই দুই সরকার ক্রমেই কাছাকাছি এসেছে। বাংলাদেশে বিরোধী বিএনপির আশাকে চুরমার করে নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। আর দুসপ্তাহ আগে ভারতীয় পার্লামেন্টে স্থলসীমান্ত বিলের অনুমোদন সেটাকে সিমেন্টের শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

আর সে কারণেই দিল্লিতে শুক্রবার ২২ মে শাহরিয়ার আলমের গলায় শোনা গেল নরেন্দ্র মোদির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। ‘আমাদের দুই দেশেই এখন দুজন দারুণ সক্ষম নেতা– যারা দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার মানচিত্রকেই বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন’, বললেন তিনি। স্থলসীমান্ত বিল সর্বসম্মতিতে পাস করানোর জন্য ভারত সরকারকে অকুণ্ঠ ধন্যবাদ জানালেন। তবে সঙ্গত কারণেই পাশাপাশি জানিয়ে রাখলেন তিস্তা চুক্তি কবে হবে বা নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরেই সেটা হবে কি না, তা নিয়ে তিনি কোনও ‘স্পেকুলেট’ করতে চান না।

এবারের এই সংলাপের শিরোনাম করা হয় ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক : দ্বিপাক্ষিতা ও তাকে ছাড়িয়ে’ (বাইল্যাটারালিজম অ্যান্ড বিয়ন্ড)। দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে যৌথভাবে এর আয়োজন করছে দিল্লিভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন আর এদেশে বাংলাদেশপ্রেমীদের বেসরকারি সংগঠন ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ– ইন্ডিয়া চ্যাপ্টার। কিন্তু ভারত সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রী-আমলারাও যেভাবে এই সংলাপকে সফল করে তোলার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তা প্রায় নজিরবিহীন।

আসলে অতিথির তালিকায় চোখ বোলালেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। শুক্রবার উদ্বোধনী সন্ধ্যায় দিল্লির ওবেরয় হোটেলে এই সংলাপের সূচনা করলেন ভারতের রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভু। যিনি প্রধানমন্ত্রী মোদির ভীষণ আস্থাভাজন ও প্রিয়পাত্র বলে পরিচিত। ছিলেন আর একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী নাজমা হেপতুল্লাও। যিনি ভারতের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী। মি. প্রভু নিজেই সন্ধ্যায় অতিথিদের সম্মানে নৈশভোজ দিলেন। যেখানে ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বা দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীও।

সুরেশ প্রভু জানালেন বাংলাদেশের সঙ্গে রেল-সহযোগিতাকে তারা আরও প্রসারিত করতে চান। সে দেশের রেলমন্ত্রীকেও তিনি ভারতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। একদা ভারতের আন্তঃ নদী-সংযোগ প্রকল্পের ভারপ্রাপ্ত সুরেশ প্রভু আরও বললেন বন্যার প্রকোপ সামলাতে হয় দুটো দেশকেই, তাই দরকার অভিন্ন ‘জল ম্যানেজমেন্ট’। যাতে এই সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু কিছুতেই সেটা নিম্ন অববাহিকার দেশকে প্রাপ্য জল থেকে বঞ্চিত করে নয়। নাজমা হেপতুল্লা স্মৃতিচারণ করলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে কীভাবে তিনি মুম্বাইতে জনসভা আয়োজন করেছিলেন। ছোটবেলার শেখ হাসিনার সঙ্গেও ছিল তাঁর কত মধুর স্মৃতি!

এতেই শেষ নয়, শনিবার দিল্লির ইন্ডিয়া হ্যাবিট্যাট সেন্টারে এই সংলাপে যোগ দিয়ে ভাষণ দেন ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস জয়শঙ্কর এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালও। থাকবেন ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরণ রিজেজু-ও। সুরেশ প্রভু, জয়শঙ্কর, দোভাল বা রিজেজু– এরা প্রত্যেকে মোদির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলয়ের লোক এবং এদের সবাইকে তিনি নিজের হাতে পছন্দ করে তাদের পদে বসিয়েছেন।

দুদেশের মধ্যকার ফ্রেন্ডশিপ ডায়ালগের দ্বিতীয় দিনে থাকে তিনটি বিশেষ আলোচনাও। এগুলোর আলোচ্য বিষয় হল যথাক্রমে ডায়নামিক সিকিউরিটি ও আস্থা নির্মাণ (যার মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ রোধও থাকছে), কানেক্টিভিটি এবং এনার্জি অ্যান্ড ওয়াটার সিকিউরিটি। দুদেশের প্রথম সারির নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা এই আলোচকদের প্যানেলে থাকেন। বাংলাদেশের দিক থেকে যোগ দেন এমপি আবদুল ওয়াদুদ দারা, পঙ্কজ দেবনাথ, পরিবেশ ও পানি-বিশেষজ্ঞ আইন-উন নিশাত, অর্থনীতিবিদ কাজী খলিকুজ্জামান আহমেদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত মহম্মদ জমিরের মতো অসংখ্য প্রথম সারির নাম।

আসলে দুটো দেশের মধ্যে যখনই এমন কোনও সেমিনার হয়, সেই সব আলোচনার কোনও প্রতিফলন পাঁচতারা হোটেলের বাতানুকূল কনফারেন্স হলের বাইরে খুব একটা বেরোয় না। এমন অভিযোগই বেশি শোনা যায়। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের এবারের এই ফ্রেন্ডশিপ ডায়ালগ সব দিক থেকেই ব্যতিক্রমী , এমন ইঙ্গিত ছিল কিন্তু স্পষ্ট। বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে এই সংলাপের ব্যাপারে কখনওই উৎসাহের অভাব ছিল না। কিন্তু এবারে ভারতের সরকারি বা বেসরকারি মহল থেকেও এই সংলাপ নিয়ে যে ধরনের আগ্রহ দেখা যায় তা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক।

‘আসলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গত কয়েক বছরে যে গ্রাউন্ডব্রেকিং বা যুগান্তকারী সহযোগিতার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে– তারই একটা ঝলক দেখা যাবে এই সংলাপে’, খুবই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছিলেন দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক।

নিউজওয়ার্ল্ডবিডি.কম

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *