সমীরকুমার ঘোষ ॥
মাই ষষ্ঠী প্রথটা বহুকাল ধরেই বাংলায় চলে আসছে৷ আশুতোষ ভট্টাচার্য ‘বাংলার লোকসংস্কৃতি’ গ্রম্হে লিখছেন, বছরে অন্তত একবার জামাতাকে (জামাই) আনুষ্ঠানিকভাবে সম্বর্ধনা জানানো হয়, অনুষ্ঠানটি জামাই ষষ্ঠী নামে পরিচিত৷ যতদিন পর্যন্ত শাশুড়ী বেঁচে থাকেন, জামাতা বছরের এই দিনটিতে তাঁর কাছ থেকে নূতন বস্ত্র এবং পরিতোষ সহকারে খাদ্য ও সম্বর্ধনা লাভ করে৷ শাশুড়ীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে জামাতার এই সম্বর্ধনা একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়৷ তথাপি জামাতা পরিবারের চাইতে বয়স্ক অন্যান্য লোকদের কাছ থেকে স্নেহ এবং কনিষ্ঠদের কাছ থেকে সম্মান ভালোবাসা পেয়ে থাকে…৷ জ্যৈষ্ঠ মাসে অনুষ্ঠিত অরণ্য ষষ্ঠী বা জামাই ষষ্ঠী নামে এক লৌকিক দেবীর পূজো উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে নানা উপহার দেওয়া হয়৷ তার সঙ্গে জামাতাকে নিয়ে কতকগুলো আচারও পালন করা হয়৷ জামাতা ও কন্যার কল্যাণার্থে জামাই ষষ্ঠী দেবীর আনুষ্ঠানিকভাবে পুজো করা হয়৷’
আশুবাবু যা-ই বলুন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত নিয়ম-কানুনই বদলে যাচ্ছে৷ এখন আর যতদিন শাশুড়ি ঠাকরুন জীবিত, ততদিন জামাইকে আপ্যায়ন করে গাণ্ডেপিণ্ডে গেলানো, সেই সঙ্গে আমটা, লিচুটা, নতুন জামাকাপড় দেওয়ার চল আর নেই৷ যা আক্রা-গণ্ডার বাজার তাতে মধ্যবিত্ত পরিবারে আর এসব মানা সম্ভবও নয়৷ বলা ভাল জামাইদের কপাল পুড়েছে৷ বিয়ের প্রথম দু-এক বছর জামাই নতুন থাকতে থাকতেই যা আদর-আপ্যায়ন৷ তার পরই জামাই পুরনো হয়ে পড়ে৷ শাশুড়ি বা শ্বশুর মশাইয়ের ষষ্ঠীপালনের উৎসাহও মিইয়ে যায়৷
মেয়েরা শিবের মতো বর চেয়ে শিবরাত্রির দিন ঘটি ঘটি জল ঢালে, বেল অর্ঘ্য দেয়৷ কিন্তু জামাই হিসাবে শিব উপেক্ষা-অনাদরের আইকন৷ গিরিরাজ তো পাত্তাই দিতেন না৷ মা মেনকা মেয়ের মুখ চেয়ে দূর ছাই না করলেও জামাইকে নিয়ে আদিখ্যেতা দেখাতেন না৷ পাড়াপড়শীও তো ‘মায় গো মায়, এই কি তোমার মেয়ের জামাই’ বলে হা-হুতাশ করত৷ লোকে বলে গাঁজা টানলে নাকি খিদেয় শরীর চনমন করে৷ শিব শ্বশুরবাড়ি গিয়ে কী খেতেন কে জানে!
কলকাতার বনেদিবাড়িগুলোতেও জামাইদের সেই সোনাঝরা দিন আর নেই৷ জমিদারির বোলবোলাও গিয়েছে, সঙ্গে গিয়েছে আচার-অনুষ্ঠানের জাঁকও৷ একসময়ে শোভাবাজারের ঠাকুরদালানে পরিবারের বিভিন্ন ডালপালার সম্পর্কের জামাইরা কাছা-কোঁচা সামলে জড়ো হতেন৷ ১৯৫৩ সালেই চার প্রজন্ম একজোট হয়েছিল জামাই ষষ্ঠীর দিনে৷ তারও কয়েক দশক আগে ষষ্ঠীর দিনে চলত খাওয়ার প্রতিযোগিতা৷ শ্বশুর-শাশুড়ির দেওয়া ভোজের সঙ্গে জামাইরা নিজে এঁটে উঠতে পারতেন না৷ তাই তাঁরা সঙ্গে করে ভোজপুরী বামুনদের নিয়ে আসতেন৷ এ যেন রানার নিয়ে ব্যাট করা৷ এই ভোজপুরী বামুনগুলো ছিল এক-একজন ঘটোৎকচ বা ভীম৷ আস্ত পাঁঠা খেয়ে ফেলাটা তাঁদের কাছে ছিল নস্যি৷ অনেকে বেশি খাওয়ার প্রতিযোগিতায় জিতে উপহারও পেত৷
জামাই ষষ্ঠীতে জামাই-ঠকানোও ছিল আমোদের অংশ৷ বাঙালির মিষ্ঠান্ন ভাণ্ডারে মহার্ঘ সংযোজন জলভরা তালসাঁস সন্দেশের সৃষ্টি এই জামাই ষষ্ঠী উপলক্ষেই৷ তেলিনিপাড়ার জমিদারগিন্নির অনুরোধে চন্দননগরের বিখ্যাত ময়রা সূর্য মোদক বিস্তর বুদ্ধি খাটিয়ে এটি তৈরি করেন৷ জামাই কামড় দিতেই ভেতরে থাকা সুগন্ধী গোলাপজল বেরিয়ে গোটা জামায় ভর্তি হয়ে যায়৷ সঙ্গে সঙ্গে ক্লাইমেক্সের জন্য প্রতীক্ষিত শালা-শালি এবং বাড়ির কাজের লোকেদের তুমুল উল্লাস৷ শাশুড়ির মুখে কাপড় চাপা দিয়ে ছদ্ম-ভর্ৎসনা৷ যেন ছয় মেরে সেঞ্চুরি৷ এছাড়াও শালা-শালিরা মিলে চুন দিয়ে দই, বা ব্লটিং পেপারের রাবড়ি, সুরকি বা কাগজ ভরা শিঙাড়া ইত্যাদি তৈরি করত জামাইবাবুকে ঠকানোর জন্য৷ শোভাবাজার রাজবাড়ির অলককৃষ্ণ দেব একবার শালা-শালিদের সুরকি-ভরা শিঙাড়া ও পেরাকি খাওয়ানোর চক্রান্ত ধরে ফেলে হাতসাফাই করে থালা পাল্টে তা শালিদেরই খাইয়ে দিয়েছিলেন৷
উত্তর কলকাতার বিখ্যাত মল্লিকবাড়ি, মানে স্যর রাজেন মল্লিকের বাড়িতে জামাই ঠকানো হত আলফান্সো আম দিয়ে৷ আলফান্সো আম কাটতেই নাকি পেটের ভিতর থেকে ফড়িং জাতীয় ছোট্ট এক ধরনের পোকা ফরফর করে বেরিয়ে উড়ে যেত৷ সামনে কাটা আম থেকে হঠাৎ পোকার আবির্ভাবে জামাতা বাবাজীবন যারপরনাই ঘাবড়ে যেতেন৷ আর তাই নিয়ে চলত হাসির হুল্লোড়৷ তবে এই মল্লিকরা হলেন সপ্তগ্রামের সোনার বেনে৷ ষষ্ঠীর দিন জামাইকে বাড়িতে ডেকে খাওয়ানোর চল ওঁদের নেই৷ ওই দিন পুজো দেওয়ার পর জামাইকে নানা সুখাদ্য পাঠিয়ে দেওয়া হত৷ জ্যৈষ্ঠ মাসেরই অন্য এক দিন জামাইকে নেমতন্ন করে খাওয়ানো হত৷ সেই দিন শাশুড়ি-মা সামনে বসে নিজে হাতে জামাইকে খাওয়ান৷
এখন শাশুড়িদের হাতে অত রান্নার সময় নেই, শরীরে জুতও নেই৷ শ্বশুরদের ট্যাঁকের জোর কমতির দিকে৷ নেই সেই খাইয়ে জামাইরাও৷ তাদের জল খেলেও জেলুসিল, জিনট্যাক খেতে হয়৷ যাঁরা নেহাত নাছোড় তাঁদের জন্য পিয়ারলেস ইন-এর আহেলির মতো বিভিন্ন হোটেল নানা ধরনের বাঙালি ভোজের প্যাকেজ নিয়ে তৈরি থাকে৷ গিয়ে বসলেই হল৷ ইদানীং হোম ডেলিভারিও খুব জনপ্রিয়৷ কালিয়া, কোর্মা, পাতুড়ি– যা চাই আলাদিনের দৈত্যের মতো এনে হাজির করে দেবে৷ পকেট থেকে একটু মোটা রকম খসবে এই যা৷ তা খসুক, জামাই বলে কথা৷ এই সব কারণেই হয়ত ‘জন জামাই ভাগনা, তিন নয় আপনা’ প্রবাদের সৃষ্টি৷
(কলকাতার লেখক)
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি.কম



Leave a Reply