ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এতোদিন ধরে অমীমাংসিত থাকা দু’টির একটি স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন এখন সময়ের অপেক্ষা। অপর অমীমাংসিত বিষয় তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি খুব সহসাই হওয়ার সম্ভাবনা এতোদিন না থাকলেও গত কয়েকদিনে এ নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরে তিস্তা চুক্তি শেষ মুহূর্তে হয়েও যেতে পারে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দফতর চাইছে- তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তিটির ব্যাপারে ঐকমত্য ঢাকাতেই হয়ে যাক। ঢাকা সফরে একটি চমক হিসেবেই বাংলাদেশের মানুষের জন্য এটি হবে সবচেয়ে বড় উপহারও, এমনটিই ভাবছেন নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকের কর্মকর্তারা। তবে এজন্য ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিজেপিকে ভূমিকা রাখতে হবে। ধারণা করা হচ্ছে স্থল সীমান্ত চুক্তিতে যেমন এক রাতেই সমাধান আনা হয়, তেমনি তিস্তার পানি বণ্টনের হিস্যাতেও একটি নাটকীয় সমাধান করবে বিজেপি নেতৃত্ব। তবে এবারের সফরে চূড়ান্ত চুক্তি সই করা সম্ভব না হলেও হিস্যা নির্ধারণ করে একটি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে; যা নরেন্দ্র মোদির ফিরতি সফর হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলতি বছরই নয়াদিল্লি সফরে গিয়ে সই হবে।
মোদির সফরে তিস্তা নিয়ে চমক আসার বিষয়টি আরও শক্ত হয়েছে যৌথ নদী কমিশনের অবস্থানে। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের সদস্য মীর সাজ্জাদ হোসেন গতকাল সোমবার এই প্রতিবেদককে বলেন, তিস্তা চুক্তির জন্য যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক অপরিহার্য নয়। যেমন পদ্মা নদীর পানি চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লি সফরে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেব গৌড়ার সঙ্গে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। তখন প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রসচিব ও জেআরসির একজন সদস্যসহ অন্যরা। এবারও চূড়ান্ত থাকা খসড়া যেকোনও পর্যায়ে স্বাক্ষর হতে পারে। সাজ্জাদ হোসেন বলেন, জেআরসি বৈঠকের জন্য এর আগে বিভিন্ন ফোরামে আমরা ভারতের কাছে আহবান জানিয়েছি। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরে আলোচনায় তিস্তা নিয়ে আলোচনা হবে এটা নিশ্চিত বলেন তিনি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরে এ সফরেই চুক্তি হবে কি হবে না এ বিষয়ে এ নিয়ে দুই দেশের কেউই প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না কূটনৈতিক সূত্রগলো। যদিও নাটকীয় অগ্রগতির সম্ভাবনাও দেখছেন কেউ কেউ। কারণ তিস্তা চুক্তির খসড়া এমনই চূড়ান্ত অবস্থায় আছে যে এখন দুই প্রধানমন্ত্রী বা দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা দুই দেশের পানি সম্পদ মন্ত্রীদের যে কেউ যেকোনও দিন এটি স্বাক্ষর করতে পারবেন। পুরনো খসড়ায় পরিবর্তন ছাড়া স্বাক্ষরে যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) বৈঠকেরও কোন প্রয়োজন নেই। এখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সহ অন্য মুখ্যমন্ত্রীরা মোদির সফরসঙ্গী হলে একটি রাজনৈতিক সমাধান আসতেও পারে এমন ইঙ্গিত সংশ্লিষ্ট কূটনীতিক ও পানি বিশেষজ্ঞদের। অবশ্য শুধু তিস্তা চুক্তির পানি বণ্টন নয় অভিন্ন ৫৪ নদীর যৌথ পানি ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গও আছে আলোচনায়।
জানা যায়, সর্বশেষ দিল্লীতে বাংলাদেশ-ভারত ষষ্ঠ মৈত্রী বৈঠকে দুই দেশের আলোচকদের বক্তৃতায় তিস্তা চুক্তির স্বাক্ষরের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। তবে সেখানেও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব জয়শঙ্কর মোদির সফরে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর হবে কিনা তা নিয়ে স্পষ্ট করে বলতে অস্বীকার করেন। জয়শঙ্কর বলেন, তিস্তা ও ফেনী নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা চলছে। সেখানে উপস্থিত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, আমরা এই চুক্তির জন্য চাপাচাপি করছি না। কারণ বিষয়টি আলোচনাধীন।
ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের আগ্রহের স্থান থেকেই তিস্তা নিয়ে আলোচনাকে দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকের এজেন্ডা করা হয়েছে। সর্বশেষ চূড়ান্ত খসড়া অনুসারে, মূল নদীর প্রবাহের জন্য ২০ শতাংশ রেখে বাকি ৮০ শতাংশ দুই দেশের মধ্যে সমান ভাগ করা হবে। তবে এক্ষেত্রে সিকিমের জন্য পানির হার আলোচনায় আনা হয়নি।
এদিকে নয়াদিল্লির একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি তিস্তা নদী ছাড়াও ফেনী নদীর পানি বণ্টন চুক্তি সম্পন্ন করতে চান। এই সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ অভিন্ন নদীগুলোর সম্পর্কে একটি ‘গুচ্ছ সমঝোতাপত্র’ স্বাক্ষর করতে আগ্রহী। তিস্তা চুক্তি সম্পর্কে আশাব্যঞ্জক কোনো ঘোষণা ছাড়া প্রধানমন্ত্রীও নিশ্চিতভাবেই ঢাকা সফরে যাবেন না- এটা মনে করছে দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো। তিস্তার পানির ৭৫ শতাংশ পশ্চিমবঙ্গের জন্য চেয়ে আগে দাবি জানিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। এখন অবশ্য তিনি হিস্যার হিসাব নতুন করে না দিয়ে বলেছেন, যৌক্তিক পানি তার রাজ্যের চাই। এখন এই বিষয়ে আলোচনার জন্য মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে আগে থেকেই আলোচনা করে একটি সমাধানে পৌঁছাতে কাজ করছে বিজেপি সরকার।
বিশেষ প্রতিনিধি
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম



Leave a Reply