মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

ইন্টারনেট কেন সংবাদপত্রকে মারতে পারেনি?

সংবাদপত্র বা ছাপা পত্রিকা হারিয়ে যাওয়া কোনো প্রেমের গল্প নয়। আর প্রশ্নও এটা নয় যে, ইন্টারনেট কবে সংবাদপত্রকে মেরে ফেলবে? বরং প্রশ্ন এটাই যে, ইন্টারনেট কেন সংবাদপত্রকে মারতে পারেনি? বুদ্ধিবৃত্তিক বিন্যাসের জায়গায় নতুন করে বিনিয়োগ বাড়িয়ে ছাপা পত্রিকা এজেন্ডা ঠিক করার ঐতিহাসিক ভূমিকা বজায় রাখতে পারে। নিউজ করপোরেশন অস্ট্রেলিয়ার সম্পাদকদের এক সম্মেলনে এ বক্তব্যই উঠে এসেছে।

সিডনিতে প্রতিষ্ঠানটির সম্পাদক ও নির্বাহীদের এক সম্মেলনে ইন্টারনেট ও ছাপা পত্রিকা নিয়ে বক্তব্য দেন নিউজ করপোরেশন অস্ট্রেলিয়ার গ্রুপ সম্পাদকীয় পরিচালক ক্যাম্পবেল রেইড। মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনা সহযোগে এই বক্তব্যে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের’ জন্য ফেসবুক ও গুগলকে ভর্ৎসনা করেন রেইড। তিনি বলেন, বিশ্বস্ততার প্রশ্নে স্থানীয়ভাবে মানুষজনের কাছে এখনো আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ছাপা সংবাদপত্রের। দ্য অস্ট্রেলিয়ান এ খবর জানিয়েছে।

ক্যাম্পবেল রেইড বলেন, ডিজিটাল পন্থা পাঠকদের সঙ্গে যোগাযোগ ও আদান-প্রদানের চমৎকার সব পথ খুলে দিয়েছে। স্পষ্টতই ফেসবুক ও গুগলের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, অবশ্য ওই ‘ইন্টারনেট প্রণয়িনীরা’ পর্নোগ্রাফি, সাইবার নিপীড়ন, সন্ত্রাসবাদের কর্মী সংগ্রহ থেকে শুরু করে শিশুকামের জন্যও তাদের চ্যানেলগুলোকে ব্যবহার করতে দিতে খুবই সিদ্ধহস্ত।

দ্য অস্ট্রেলিয়ানকে রেইড বলেন, ‘ফেসবুক কোনো মিডিয়া কোম্পানি নয় আর গুগল দাবি করে তাদের লক্ষ্য কারও ক্ষতি না করা। কিন্তু অন্যরা যখন তাদের চ্যানেল ব্যবহার করে খারাপ কিছু করে তখন তারা সেগুলোকে গুরুত্ব দেয় না এবং সেসবের যথাযথ দায়িত্বও তারা নেয় না।’

দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, দ্য অস্ট্রেলিয়ান, হেরাল্ড সান ও দ্য কুরিয়ার-মেইলসহ নিউজ করপোরেশনের অস্ট্রেলিয়ার সংবাদপত্র সম্পাদক ও নির্বাহীদের সামনে মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনা সহযোগে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন ক্যাম্পবেল রেইড। তিনি বলেন, সবাইকে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করতে হবে, কলামিস্টদের আরও সাহসী হতে হবে এবং সংবাদপত্রের বিশেষ ও নিজস্ব কনটেন্টগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।

সংবাদপত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক বিন্যাসের অর্থে নতুন করে বিনিয়োগের জন্য সম্পাদকদের পরামর্শ দেন এই সম্পাদকীয় পরিচালক। তার মতে এখনো সংবাদপত্রই সংবাদ প্রবাহের অবিরত ধারার মধ্যে একটা আলোচনার সুযোগ করে দেয়, সংবাদপত্রই এজেন্ডা ঠিক করে দেয়। তিনি বলেন, ‘আমরা যা করি তা নিয়ে আমাদের আরও বেশি আগ্রাসী ও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। এটা আমরা, যারা এজেন্ডা ঠিক করে।’

ডিজিটাল বিপ্লব ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে এমন অনুধাবন থেকে তাঁর বার্তা ছিল যে, পৃথিবী বদলে গেছে এবং এর মধ্যে ছাপা পত্রিকা টিকে গেছে। রেইড বলেন, ‘পৃথিবী বদলাচ্ছে না বরং বদলে গেছে। প্রশ্ন এটা নয় যে, ইন্টারনেট কবে সংবাদপত্রকে মেরে ফেলবে? বরং প্রশ্ন এটাই যে, ইন্টারনেট কেন সংবাদপত্রকে মারতে পারেনি? আমার মনে হয় দুনিয়া বুঝতে পারছে যে, একটা সমাজে সংবাদপত্র আসলে কী ভূমিকা পালন করে।’

নিজেকে ডিজিটাল বিপ্লবের এক বিমুগ্ধ ভক্ত হিসেবে উল্লেখ করে রেইড বলেন, সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা না থাকার জন্য সংবাদপত্র নিজেই বেশি দায়ী। ডিজিটাল বিপ্লবের এই যুগে সংবাদপত্রকে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে এবং নিজেদের পাল্টানোর চেষ্টা করতে হবে। এটা সত্যিই দারুণ যে, মানব ইতিহাসে যোগাযোগের এই অভূতপূর্ব বিপ্লবের কালে স্মার্টফোনের আগে জীবন কেমন ছিল সেটা আমরা মনে করতে পারি।

newspaper-pressছাপা পত্রিকা নিয়ে নিজের এই বক্তব্য ও উপস্থাপনাকে তিনি বলেন,‘সংবাদপত্র-একটা প্রেমের গল্প’। কেননা, ছাপা পত্রিকা নিয়ে সাধারণ আলোচনাগুলো হতাশায় ছেয়ে থাকা কথাবার্তায় ভরা থাকে। ইন্টারনেটের যুগে সংবাদপত্র নিয়ে এমন ভাবনাকে উনিশ শতকের পঞ্চাশ ও ষাট দশকে টেলিভিশনের আবির্ভাবের পর রেডিওর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ও হতাশার সঙ্গে তুলনা করেন রেইড।

সংবাদমাধ্যমের ব্যবসা সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে রেইড জানান, দুনিয়াজুড়েই এখনো ডিজিটাল সংস্করণের তুলনায় ছাপা সংস্করণ থেকেই বেশি আয় হয়। মিডিয়া বিশ্লেষক কেন ডকটরকে উদ্ধৃত করেন রেইড, যিনি বলেছেন,‘সংবাদকর্মীদের বেতন দেওয়ার জন্য যে অর্থ আসে তার ৭৫ ভাগ বা তারও বেশি এখনো মুদ্রিত সংস্করণ থেকেই আসে। আর এখনো বড়সড় স্থানীয় নিউজরুমের খরচ বহন করার মতো কোনো ডিজিটাল বিজনেস মডেল নেই আমাদের সামনে।’

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী ওয়ারেন বাফেটের উদাহরণ দিয়ে রেইড জানান, গত তিন বছরে ৩৪৪ মিলিয়ন ডলার দিয়ে ২৮টি স্থানীয় পত্রিকা কিনে নিয়েছেন বাফেট। বিশ্বের এই অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ীকেও উদ্ধৃত করেন তিনি। বাফেট বলেছেন,‘এখনো সংবাদপত্রই সেরা হিসেবে টিকে আছে, যেভাবেই হোক, স্থানীয় সংবাদ সরবরাহে তো বটেই।’

(নিউজ করপোরেশন অস্ট্রেলিয়া থেকে অনূদিত)
নিউজওয়ার্ল্ডবিড ডট কম

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *