বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

ফ্রান্সে কাল্পনিক ঘটনা জানিয়ে আশ্রয় চাইছেন বাংলাদেশিরা

ফারুক নওয়াজ খান, প্যারিস থেকে॥
হাঁটি হাঁটি পা পা করে ফ্রান্সের বাংলাদেশী কমিউনিটি আজ প্রায় পঞ্চাশ হাজারের উপরে বলে অনেকেই মনে করেন। এর অধিকাংশই এখনও এখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি লাভের জন্য ছুটছেন। কিন্ত প্রধানত ভাষাগত জটিলতা ও জানার আগ্রহের অভাবের কারণে অনেকেই এখানকার আইন কানুন সম্পর্কে অজ্ঞ।

আপনারা কি জানেন ফ্রান্সে কতো শতাংশ বাংলাদেশীর রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন মঞ্জুর করা হয়? একই সঙ্গে আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশের কতো শতাংশ আবেদন মঞ্জুর হয়। আমরা চায়ের আড্ডায় প্রতিদিন নানা বিষয়ে আলোচনা করলে ও এসব বিষয় নিয়ে কোন আলোচনা তো হয়ই না বরং এড়িয়ে যাই। কিন্ত বিষয়গুলো আমাদের জানা দরকার বলে আমরা মনে করি।

download (6)বাস্তবিক অর্থে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের জন্য আমরা প্রাথমিক আবেদন করি অফরা নামক দপ্তরে। সেখানে আমাদের আবেদন পর্যালোচনা করে সরাসরি নিজের অবস্থানের আনুপুর্বিক বর্ণনা দেয়ার জন্য একজন প্রটেকশন অফিসারকে নিযুক্ত করা হয়। এক সময় সে প্রটেকশন অফিসারের সামনে আমরা আমাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরি। প্রথমত ভাষাগত সমস্যা এবং অযাচিত ভয়ের কারনে আমরা সবাই নার্ভাস হয়ে যাই। যেখানে সে কর্মকর্তা একজন আশ্রয়প্রার্থীকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য নিয়োজিত সেখানে উনি আমাদের ভীতির কারনে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। এ কারনেই নিজের সমস্যাগুলো বাস্তবভাবে উপস্থাপন করা জরুরী।

আমরা যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম সেটা হলো বাংলাদেশী রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদন শতকরা তিন শতাংশ মঞ্জুর করা হয়। সম্প্রতি এ বিষয় নিয়ে বিশিষ্ট ইমিগ্রেশন ও রাজনৈতিক আশ্রয় বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবি ইরল ডেমির জানিয়েছেন এই ভয়ানক তথ্যটি। ভেবে দেখার বিষয় ৯৭ শতাংশ আবেদনই না মঞ্জুর করা হয়। অফরা এবং পরবর্তীতে জাতীয় আদালতে আপীল করে মাত্র তিন শতাংশ বাংলাদেশী রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ তথা উদ্বাস্তু মর্যাদা লাভ করেন। অপরদিকে আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশের শতকরা ৩০ শতাংশের উপর আবেদন মঞ্জুর করা হয়।
এরপর অনেকে দ্বিতীয়বার আবেদন করেন রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য। সে ক্ষেত্রে আবেদন মঞ্জুরের সংখ্যা উদ্বেগজনক। মাত্র এক শতাংশের আবেদন মঞ্জুর করা হয় এখানে। অবিশ্বাস্য হলেও এ পরিসংখ্যানটি বস্তুনিষ্ঠ বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক আশ্রয় নামঞ্জুর হওয়ায় অনেক বাংলাদেশী ভাইবোনের জীবন আজ ছন্দহীন হয়ে পড়ছে। অনেকে নিজেকে সমাজ ও পরিবারের বোঝা মনে করে হীনমন্যতায় ভুগছে। আবার অনেকে তাদের দূর্বলতার সুযোগে নানা ধরনের অমানবিক কাজ করিয়ে নিচ্ছে। গাধার মতো কাজ করিয়ে পারিশ্রমিক দেয়ার সময় বঞ্চিত করছে।

অধিকাংশ বাংলাদেশীই অনেক বড় একটি গল্প লিখে জমা দেন। উনার ভাষায় যেটাকে হলিউডি সিনেমার মতো কাল্পনিক বলে মনে করা হয়। ফ্রান্সের রাজনৈতিক আশ্রয় যে দপ্তর থেকে দেয়া হয় সেখানের সবাই এ বিষয়টি খুব ভালভাবে জানেন। এ কারনেই অহেতুক কাহিনী বড়ো করে কোন লাভ নেই। প্রাসঙ্গিক কিছু সমস্যা খুব সাধারনভাবে উপস্থাপন করাটাই যৌক্তিক বলে তিনি মনে করেন।

আবেদনের পর একজন রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী উনার আবেদন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ডকুমেন্ট তৈরী করে থাকেন। এখানেও রয়েছে নানা ধরনের সমস্যা। আমাদের অনেকেই জানেননা কোন মামলা হলে সে সংক্রান্ত কোন কোন ডকুমেন্ট জমা করলে কোন সন্দেহের উদ্রেক করবে না। ফলে শুধুমাত্র ডকুমেন্টের জন্যই তার আবেদন নামঞ্জুর করার প্রক্রিয়া সহজ হয় সিদ্ধান্তকারীদের জন্য।

মামলা সংক্রান্ত কাগজ বা আদালতের কোন কোন দলিলগুলো সাধরনের জন্য সংগ্রহ করা বৈধ বলে গন্য হয় আমাদের অনেকেই তা জানি না। সকলের অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, আদালতের কাগজ সাধারনত দু ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমটি হলো ডকুমেন্ট পাবলিক। এটি সর্ব সাধারনের জন্য উন্মুক্ত। অর্থাৎ কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা বিচারাধীন ব্যক্তি সহ অন্য যে কেউ এ মামলা সংক্রান্ত কাগজপত্র আবেদন করলেই নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে সংগ্রহ করতে পারেন।

ডকুমেন্ট পাবলিক হলো, কোন মামলার রায়, সাজা পরোয়ানা এবং জামিন সংক্রান্ত কাগজপত্র বা তথ্য প্রমান। এসব কাগজ আদালত থেকে অনায়াসেই সংগ্রহ করা যায়। সুতরাং এ ধরনের কাগজ জমা করলে বিচারকের মনে কোন ধরনের সন্দেহের উদ্রেক করেনা। এসব কাগজ অনুবাদ অবশ্যই অনুমোদিত দপ্তর থেকে করানো বাধ্যতামুলক।

অপর কাগজগুলি হলো ডকুমেন্ট কনফিডেন্সিয়াল বা গোপনীয় ডকুমেন্ট। এসব কাগজ শুধুমাত্র আদালত এবং পুলিশের কাছে থাকে। কোনভাবেই এসব ডকুমেন্ট সংগ্রহ করা যায় না। কারন এ সব ডকুমেন্ট বিচার সংশ্লিষ্ট। গোপনীয় ডকুমেন্ট বলতে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট বা গ্রেফতারী পরোয়ানা, প্রাথমিক তথ্য বিবরনী, অভিযোগপত্র বা চার্জশীট বোঝানো হয়।

এসব কাগজ কখনো অভিযুক্ত ব্যক্তি সংগ্রহ করতে পারেন না। কারন হিসেবে বলা যায় এসব কাগজ আদালত এবং পুলিশের কাছে থাকে। সুতরাং এসব কাগজ জমা দেয়ার মাধ্যমে নিজের আবেদনকে প্রশ্নের সম্মুখীন করা হয়। বিচারকের কাছে তখন একটি বিষয় পরিস্কার হয়ে যায়। যে ব্যক্তি গোপনীয় ডবুমেন্ট উত্তোলন করতে পারেন তার ক্ষমতা অনেক, অথবা তিনি জাল কাগজ জমা করেছেন। এ কারনেই একজন আবেদনকারী প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাকেন।

আশা করবো এ তথ্যগুলো পাঠকদের কাজে লাগবে। আপনাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া আশা করছি। এরপর আমরা রিএ্যাগজামিন বা দ্বিতীয় বার আশ্রয়ের আবেদন নিয়ে লিখবো। আপনাদের ইতিবাচক প্রতিকৃয়া আমাদের আরও উৎসাহিত করবে।

নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *