ঢাকায় তিনদিনের সফর শেষে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে চলে গেছেন চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী রাজনীতিক ও দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী লিউ ইয়ানদং। ধারণা করা হচ্ছিল প্রটোকলে না থাকলেও অন্তত চীনের তরফ থেকেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার সৌজন্য সাক্ষাৎ হতে পারে। কিন্তু জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে লিউ ইয়ানদং চলে গেছেন খালেদার সঙ্গে দেখা না করেই।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার সাক্ষাতের কোনো পূর্বনির্ধারিত সূচি ছিল না। কিন্তু বিএনপির তরফ থেকে চেষ্টা করা হয় মঙ্গলবার সকালে হলেও একটি সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার। তবে শেষ মুহূর্তেও তা সম্ভব হয়নি। বিএনপির চীনাপন্থি নেতাদের এই বিষয় নিয়ে তোপের মুখে পড়তে হয়েছে বলেও সূত্র জানায়।
চীনা উপ-প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা না হওয়ার ঘটনায় বিএনপির মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে; কারণ সামনের ৬ তারিখে ঢাকা আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এবার মোদির সঙ্গে খালেদার দেখা হওয়াটাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে কিনা- তা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছে।
চীন ও বিএনপির সম্পর্ক নিয়ে কূটনৈতিক বিষয়গুলো খোঁজখবর রাখেন এমন একটি সূত্র জানায়, লিউ ইয়ানদংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়ায় বিএনপির চীনাপন্থি একজন নেতাকে মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর গুলশান অফিসে তলব করা হয়। যদিও তিনি টেলিফোনে বিষয়টি দলের অন্য কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপকালে বলেন, আসলে চীন এভাবে আমাদের হতাশ করবে তা ভাবতে পারিনি। এখন দেখা যাক আগামী সেপ্টেম্বরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের ঢাকা সফরে ম্যাডামের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা যায় কিনা।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, চীন ও বিএনপির মধ্যে জিয়াউর রহমানের আমল থেকেই সুসম্পর্ক রয়েছে। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই চীনের সঙ্গে তিনি সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ পান। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া সরকার গঠনের পর চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্ক আবার গতি পায়। এদেশের বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্পেও চীন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অংশ নেয়। এভাবেই চীন ও বিএনপির মধ্যে সম্পর্ক বেশ জোরালো হয়। এছাড়া সাবেক সেনা প্রধান লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান চীনের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের বিষয়গুলো দেখাশোনা করতেন। পরে মঈন খানও এই দায়িত্ব পালন করেন।
চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী লিউ ইয়ানদংয়ের খালেদা জিয়ার সঙ্গে যেকোনোভাবেই হোক দেখা হবে- এমন বিশ্বাস ছিল বিএনপি নেতৃত্বের। চীনা উপ-প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফর ঘোষণার পর অবশ্য বিএনপির তরফ থেকে চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগও করা হয়েছিল। সেসময় ঢাকায় চীনের দূতাবাস থেকে বলা হয়, এখনো অনুষ্ঠানসূচি তৈরি হয়নি। বিএনপিও অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু বিধি বাম।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ঢাকায় ভিআইপি সফরের জন্য চীনা দূতাবাস ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিলে অনুষ্ঠানসূচি তৈরি করে। তবে চীনা দূতাবাস নিজেদের মতো করে কিছু অনুষ্ঠান রাখবেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, হয়তো সেই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে লিউ ইয়ানদংয়ের দেখা করানোর ব্যবস্থা করতে পারে চীনা দূতাবাস। যদিও খালেদা জিয়ার এখন সরকারি কোনো দায়িত্ব না থাকায় ‘প্রটোকল’ নেই। এ কারণে বাইরের কেউ খালেদার সঙ্গে দেখা করতে সহজেই পারেন না।
খালেদা জিয়া ২০১২ সালের ১৪ থেকে ১৯ অক্টোবর চীন সফর করেছিলেন। সেসময় চীনা ভাইস প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান ও উপ-প্রধানের সঙ্গে বৈঠক হয়। চীনের রাষ্ট্রপতির বিশেষ দূত চাই শি এ মাসের প্রথমে ঢাকা সফরকালে অবশ্য বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ধারণা করা হচ্ছিল চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে খালেদা জিয়ার দেখা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে বিএনপির বিশ্বস্ত সম্পর্ক আরো জোরদার হওয়ার আশ্বাস বহুবারই পেয়েছে বিএনপি। সেইসঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি চীনা সরকারের বার্তা হচ্ছে- একমুখী নয়, বহুমুখী সম্পর্কে বিশ্বাসী চীন। এ কারণে গতবছরের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর চীনের তরফ থেকে নির্বাচন মেনে নেওয়ার কথা বলা হলেও বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংলাপের কথা জোর দিয়ে বলেছিল চীন। তাই দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে লিউ ইয়ানদংয়ের সফরে খালেদার সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়ায় বিএনপি অত্যন্ত হতাশ।
বিশেষ প্রতিনিধি
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম



Leave a Reply